দেশে করোনা সামাজিকভাবে ছড়িয়ে (কমিউনিটি ট্রান্সমিশন) পড়েছে কি না, সেদিকে সতর্ক নজরদারি শুরু করেছে সরকার। এ জন্য করোনাসন্দেহজনকদের পাশাপাশি নিউমোনিয়া রোগীদের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গত ১৬ মার্চ যে দুই শিশু ও তাদের মা করোনায় আক্রান্ত হন, তাদের থেকে রোগটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন উদ্বেগ থেকেই নিউমোনিয়া পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কারণ ওই দুই শিশু যে স্কুলে পড়ত এবং অন্য যেসব বাচ্চার সঙ্গে খেলাধুলা করেছে, সেখান থেকে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো পরীক্ষায় সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কোনো লক্ষণ পায়নি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা প্রতিদিন যত নমুনা পরীক্ষা করছি, সেখানে নিউমোনিয়ার রোগীও রয়েছেন। এখন পর্যন্ত সামাজিকভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়েনি। অবশ্য এর আগে স্থানীয়ভাবে (লোকাল ট্রান্সমিশন) করোনা ছড়িয়ে পড়ার দুটি ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটি ঘটেছে ১৬ মার্চ। ওইদিন যে তিনজনের শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়, তারা ১৪ মার্চ ইতালি থেকে ফেরা (দুই আক্রান্তের মধ্যে একজন) তাদের স্বজনের থেকে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সেক্ষেত্রে ওই তিনজন এক ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকেই সংক্রমিত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে আইইডিসিআর। পরবর্তী সময়ে গতকাল স্থানীয়ভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। গতকাল যে দুজন পুরুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের একজন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তার ছেলের মাধ্যমে সংক্রমিত হন। ওই ছেলে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন।
এদিকে প্রতিদিনই করোনা সন্দেহে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ভিড় করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে করোনা সন্দেহে বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করতে না পারার অভিযোগ করেছেন। আইইডিসিআরের হটলাইনেও ফোন দিচ্ছেন। গতকালও ৪ হাজার ৬৪২ জন ফোন করে করোনা সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছেন। সেখানে আইইডিসিআরের চিকিৎসকরা মাত্র ২৫ জনকে করোনার প্রাথমিক সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, যে চারটি হাসপাতালকে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং যেসব হাসপাতালকে সন্দেজনকদের প্রাথমিক পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেসব হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) পোশাকের নিশ্চয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এ ধরনের পোশাকের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে করোনা সন্দেহ রোগীরা চিকিৎসা পাবেন না। চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে সঙ্গতকারণেই করোনা নমুনা পরীক্ষা ও পিপিইর বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। কাদের ও কোন পরিস্থিতিতে করোনার পরীক্ষা করা যাবে এবং পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কিট সরকারের কাছে রয়েছে কি না, তা নিয়ে নানা মহলে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। পাশাপাশি ঠিক কী পরিমাণ পিপিই সরকারের কাছে রয়েছে, তাও জানতে চান চিকিৎসকরা।
এই মুহূর্তে ঠিক কাদের পরীক্ষা করা উচিত জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর’বি) পরামর্শক ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তিন ক্যাটাগরির মানুষের পরীক্ষা করতে বলেছে ১. বিদেশফেরত ২. কেউ যদি ওই বিদেশফেরতদের সান্নিধ্যে যান এবং ১৪ দিনের মধ্যে তার উপসর্গ দেখা দেয় ৩. জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে কেউ যদি হাসপাতালে ভর্তি থাকেন ও নিশ্চিত নিউমোনিয়ার রোগী হন।
এই রোগতত্ত্ববিদ বলেন, এখনো দেশে নিউমোনিয়া রোগীদের পরীক্ষা ঠিকমতো হচ্ছে না। শুনেছি আইইডিসিআর এ পর্যন্ত নিউমোনিয়ার মাত্র ২০টি নমুনা পরীক্ষা করেছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের একটা বড় অংশ পরীক্ষার বাইরে থেকেই যাচ্ছে। করোনার উপসর্গ নিউমোনিয়ার মতো। তাই নিউমোনিয়ার পরীক্ষা করা গেলে বোঝা যাবে করোনা পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আইইডিসিআরের পক্ষে সব রোগীর পরীক্ষা করা সম্ভব বলে মত দেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরি বিএসএল-২ মাত্রার। তাদের সক্ষমতাও রয়েছে। তারাই পারবে সব পরীক্ষা করতে। কিটের ব্যাপারে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, কিটের সংকট থাকার কথা নয়। কারণ কিট এখন তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে কিট পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে নিউমোনিয়া পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল যে দুই ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের একজনকে নিউমোনিয়ার পরীক্ষা করে করোনার সংক্রমণ পাওয়া গেছে। ওই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তার ছেলের থেকে সংক্রমিত হয়েছেন। ওই ছেলে আবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে। ফলে নিউমোনিয়া পরীক্ষাটা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আইইডিসিআর কর্র্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে কিটের সংখ্যার কথা বলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো হাতে দুই হাজারের বেশি কিট তাদের কাছে রয়েছে। প্রতিদিনই কিছু কিছু কিট আসছে। কিছু পাইপলাইনেও রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসিসহ বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী কিট সরবরাহ করছে। তবে কিট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপচয় না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এখন দ্বিতীয় স্তরের পরীক্ষা চলছে। অর্থাৎ চাপ একটু বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের পাশাপাশি আইইডিসিআরের দেশব্যাপী ২৪টি শাখা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়লেও কিটের সমস্যা হবে না।
তবে পিপিইর কিছুটা সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের আরেক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, চীন ও কোরিয়া এ ধরনের কিট উৎপাদন করে। সেখানে এখন বন্ধ। তবে শিগগির সেখানে উৎপাদন হবে বলে দেশ দুটি জানিয়েছে। এ জন্য পিপিই ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সংকট কাটাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন নিয়ে স্থানীয়ভাবে পিপিই উৎপাদন করছে দেশ।
কিটের ব্যাপারে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিটের সংখ্যা বলব না। তবে কিটের সরবরাহ ভালো। আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। প্রতিদিনই কিট ব্যবহার হচ্ছে। আবার যোগও হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি ও ডোনার দেশগুলো কিট দিচ্ছে। এখন সবারই সংকট।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, রোগটি আরও বাড়লে ভবিষ্যতে কী পরিমাণ কিট লাগতে পারে, আমরা সে হিসাবও করে রেখেছি এবং সেভাবেই এগোচ্ছি। সংখ্যা বিষয় নয়। পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল কিন্তু করিনি, এমন ঘটনা ঘটেনি। তবে দেখি না করোনা হয়েছে কি না, এমন অনুমাননির্ভর পরীক্ষা আমরা করব না।
তবে পিপিইর কিছু সংকট রয়েছে বলে জানান আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ পিপিই তৈরি করে, সেসব দেশেও করোনা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন বন্ধ। ফলে পিপিই পাওয়াটা একটা চ্যালেঞ্জ। এটা সব দেশের জন্যই চ্যালেঞ্জ।
পিপিই এর সংকট কাটাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, যে কাপড় দিয়ে পিপিই তৈরি করা হয়, সে কাপড় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দেখিয়েছি। তারা অনুমোদন দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হচ্ছে। আগে বিদেশ থেকে আসত। এখন কম আসছে। তাই আমরা এর ব্যবহারের সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছি। অপচয় করা যাবে না। আমরা সব জায়গায় পাঠিয়েছি। না লাগলে ফেরত আনব।
আইইডিসিআরের পরিচালক আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) পরীক্ষার ব্যাপারে সে নির্দেশনা দিয়েছে, সেই তথ্যটা সঠিকভাবে আসেনি। বলেছে পরীক্ষা করতে। তবে সবার নয়, যাদের প্রয়োজন। করোনার সন্দেহ না থাকলে আমরা পরীক্ষা করব না।
তিনি আরও বলেন, আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না সামাজিকভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়বে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিউমোনিয়ার রোগীদের এবং করোনার উপসর্গ দেখা দিলেই পরীক্ষা করব। এখনো লোকাল ট্রান্সমিশনের মধ্যেই রোগটি রয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির সান্নিধ্যে গিয়েই আক্রান্ত হচ্ছেন। যখন রোগটির ছড়িয়ে পড়ার উৎস খুঁজে পাব না, তখন সন্দেহ দেখা দিলেই সবার পরীক্ষা করব। এখনো সোর্স খুঁজে পাচ্ছি। সুতরাং সবার পরীক্ষার দরকার নেই।
করোনার পরীক্ষা ও কিটের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হতে বারণ করেছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমানে আইইডিসিআরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কাজ করা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইইডিসিআরের যে ল্যাবরেটরি, সেখানে দিনে এক হাজার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। সুতরাং ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
এই রোগতত্ত্ববিদ বলেন, নিউমোনিয়ার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তবে যে নিউমোনিয়ার ভাইরাস অজানা, এমন রোগীদের নমুনা পরীক্ষা করছি। কিটের সংকট নেই। কৃত্রিম সংকটের কথা বলে উদ্বেগ ছড়ানো হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সরবরাহ করছে। চীন ইতিমধ্যেই কিট উৎপাদন শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে রাজধানীর হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে সর্দি-কাশি-জ্বর দেখা দেওয়া রোগীদের জন্য এখন আলাদা কর্নার করা উচিত। কারণ পরীক্ষার আগে করোনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। সুতরাং এ ধরনের রোগীদের সন্দেহের মধ্যে রাখতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে এসব রোগী থেকে রোগটি চিকিৎসক বা নার্সদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে। এ জন্য সরকার বেসরকারি হাসপাতালে এ ধরনের রোগীদের জন্য আলাদা বিভাগ খোলা হোক, তা চায় না।