আতশবাজির আলোয় শুরু মুজিববর্ষের কর্মসূচি

চোখ ধাঁধানো আতশবাজির আলোকচ্ছটার মধ্য দিয়ে শুরু হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান। গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও হাতিরঝিলে কেন্দ্রীয়ভাবে আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো হয়। আর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে গুলিস্তানের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং রবীন্দ্র সরোবরে আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো হয়। এছাড়াও রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে আতশবাজি উৎসব হয়। পরে জাতীয় উদযাপন কমিটির উদ্যোগে রেকর্ডকৃত অনুষ্ঠানমালা বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে প্রচার করা হয়। সামাজিক সব যোগাযোগ মাধ্যমেও তা প্রচার করা হয়।

ব্যাপক প্রস্তুতি থাকলেও বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে মুজিব শতবর্ষের সব অনুষ্ঠান সীমিত পরিসরে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে আতশবাজি উৎসব বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম ইভেন্ট হিসেবে গুরুত্ব পায়। আর বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১০০টি ফানুস ওড়ানো হয় হাতিরঝিল থেকে। আতশবাজির পর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে লেজার শো গ্রাফিক্স ফেব্রিকেশন করা হয়। এ অনুষ্ঠানটি একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধনী দিনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। আর বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ হাসিনা তার অনুভূতি প্রকাশ করেন। পরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা শেখ রেহানার একটি কবিতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আবৃত্তিতে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

মুজিববর্ষের উদ্বোধনীতে শত শিশুর কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। দুই ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে আরও ছিলও পিক্সেল শো, কোরিওগ্রাফি, থিম সং ও যন্ত্র সংগীত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থার প্রধানদের বাণী প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ভিডিও বার্তায় বিশেষ বাণী দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীও ভিডিও বার্তায় বাণী দেন। এছাড়া মুজিববর্ষের থিম সংয়ে শত শিল্পীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানাও কণ্ঠ দেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করাই হোক মুজিববর্ষে সকলের অঙ্গীকার।’ জাতির পিতার নীতি ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ মাটির নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহসী ও ত্যাগী নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে বলেও আশা করেন তিনি।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। যার হাত ধরে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নেয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। মঙ্গলবার তার জন্মদিনে সূচনা হয় সেই বর্ষগণনার। করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারী রূপ নেওয়ায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আয়োজনের পরিসর সীমিত করে আনা হয়। টেলিভিশন ভাষণ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় মুজিবর্ষের বছরব্যাপী আয়োজনের। আবদুল হামিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার আদর্শ আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তার নীতি ও আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়–ক, গড়ে উঠুক সাহসী, ত্যাগী ও আদর্শবাদী নেতৃত্ব এ প্রত্যাশা করি।’ রাষ্ট্রপতি ভাষণে বলেন, ‘বাঙালির মুক্তি ও অধিকার আদায়ে পরিচালিত প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। এজন্য তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। সহ্য করতে হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। কিন্তু বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে তিনি কখনো শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করেননি।’

মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা জেগে রইব তোমার আদর্শ বুকে, জেগে থাকবে এদেশের মানুষ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম, তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে। তোমার দেওয়া পতাকা সমুন্নত থাকবে চিরদিন।’

ভাষণের শুরুতে বোন শেখ রেহানা ও নিজের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে মুজিববর্ষের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর শৈশব এবং সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের কথা তুলে ধরা হয়। শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুঃখী মানুষকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে নিজের জীবনের সব সুখ-আরাম বিসর্জন দিয়ে তিনি সংগ্রাম করেছেন আজীবন। বারবার কারারুদ্ধ হয়েছেন।’ ‘মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে ব্যথিত করত। অধিকারহারা দুঃখী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে তিনি দ্বিধা করেননি। এই বঙ্গভূমির বঙ্গ-সন্তানদের একান্ত আপনজন হয়ে উঠেছিলেনÑ তাই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘জাতির পিতাকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যার পর তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হলেও ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হয়নি।’ ‘ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে তোমাকে। তোমার দেহ রক্তাক্ত করেছে। তোমার নাম বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওরা পারেনি।’ ‘ঘাতকেরা বুঝতে পারেনি, তোমার রক্ত ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ছড়িয়ে গেছে সারা বাংলাদেশে। জন্ম দিয়েছে কোটি কোটি মুজিবের। তাই আজ জেগে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষ সত্যের অন্বেষণে।’

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমার কাছে আমাদের অঙ্গীকার, তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়বোই। আর সেদিন বেশি দূরে নয়।’ আওয়ামী লীগের দেশ পরিচালনায় বাংলাদেশের এখন বিশ্বে মর্যাদার আসনে উঠে আসার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাঁর ত্যাগ বৃথা যায়নি। আজকে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে মর্যাদার আসনে আসীন। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। গড়তে হবে জাতির পিতার ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।’

‘তুমি ঘুমাও পিতা শান্তিতে। তোমার বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’ তরুণদের জাতির পিতার আদর্শ ধারণ করে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। ‘ঠিক যেভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, সেভাবেই ভালোবাসতে হবে। তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।’

এদিকে মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানাও। তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের যা কিছু আছে, তাই দিয়ে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাব। সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়ব। সোনার বাংলাকে ভালোবাসব। পরশ্রীকাতরতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখব। ঘরে ঘরে মুজিবের আদর্শের দুর্গ তৈরি করে তার আলো ছড়িয়ে দেব। কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।’

মুজিববর্ষের এই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অনেক রাষ্ট্রনেতার থাকার কথা থাকলেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সেই আয়োজন সীমিত করার কথা ভাষণে উল্লেখ করে আসতে না পারা সেই রাষ্ট্রনেতাদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নমগেয়েল ওয়াংচুক, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারি, জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস এবং ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসুফ আল ওথাইমিনের ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয় অনুষ্ঠানে। এছাড়া ইউনেস্কো, ওআইসিসহ বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে ১৭ মার্চ থেকে এক বছর ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১০ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ক্ষণগণনার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।