সিরাজগঞ্জের তাড়াশে একটি কলেজের নির্মাণাধীন ফটকের ছাদ ধসে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১০ জন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে তালম ইউনিয়নের গুল্টা বাজারে শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজে এ ঘটনা ঘটে।
গুল্টা বাজারে সাপ্তাহিক হাটবার থাকায় কলেজটির ফটক ঘেঁষে দোকান সাজিয়ে বেচাকেনা করছিল দোকানিরা। এ সময় হঠাৎ করে হাটের ক্রেতা-বিক্রেতাদের ওপর কলেজের নির্মাণাধীন ফটক ধসে পড়ে। খবর পেয়ে তাড়াশ থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করে তাড়াশ, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান। এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা। নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় ফটকটি ধসে পড়ে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
ফটক ধসে নিহতরা হলেন তালম ইউনিয়নের গাবরগাড়ি গ্রামের আজাহার উদ্দিনের ছেলে তোজাম উদ্দিন (৫০), বস্তুল গ্রামের সুলতান হোসেনের ছেলে রাশেদুল হাসান (২৬), নাটোরের সিংড়ার নিশ্চিতপুর গ্রামের আয়নাল হক (৪০) এবং তাড়াশের নিচনপুর গ্রামের শাহাদত হোসেনের ছেলে আসিফ আলী (১৪)। আহতদের মধ্যে দুজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন তালম গ্রামের বাবু (১৬) ও শফি (৩৫)।
প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে গুল্টা হাট কমিটির সভাপতি গিয়াসউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুল্টা বাজারে সাপ্তাহিক হাটবার থাকায় কলেজের গেট ঘেঁষে দোকান সাজিয়ে বেচাকেনা করছিল দোকানিরা। এ সময় কয়েক দিন আগে নির্মিত কলেজের গেটটি হঠাৎ বিকট শব্দে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ওপর ভেঙে পড়ে। ১০ ইঞ্চি গ্রেটবিমের ওপর ৩ ফুট উঁচু করে ইটের ৫ ইঞ্চি গাঁথুনি দেওয়া হয়। এরপর ওই ইটের গাঁথুনির ওপর সিমেন্ট বালু ও টালি দিয়ে প্রায় ৪০ মণ ওজনের টপ তৈরি করা হয়। ভেঙে পড়ার পর হতাহতদের উদ্ধার করার জন্য ৪০-৫০ জন মিলে গেটটি সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও উপস্থিত জনতা মিলে সরিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গেটটি নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। খুবই নিম্নমানের জিনিসপত্র দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ফলে কোনো ঝড়-বৃষ্টি ছাড়াই মানুষের ঘরে ভেঙে পড়ে এ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।’ শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আবুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলেজের অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান আসাদ তিন মাস আগে একক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে এ গেটটি নির্মাণ করেন। ফলে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।’
তবে কলেজের অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান আসাদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিকভাবেই গেটটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু কেন গেটটি ভেঙে পড়ল তা খতিয়ে দেখা হবে।’ কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদ সদস্য ডা. গজেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, ‘বিষয়টি কীভাবে ঘটল, এর জন্য কে দায়ী তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তাড়াশ থানার ওসি মাহবুব আলমও ধসে পড়া ফটকটি নির্মাণে ত্রুটি থাকার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘নির্মাণ ত্রুটির কারণে গেটটি ভেঙে পড়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ফটক ধসে হতাহতের খবর পেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. আবদুল আজিজ, তাড়াশ উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। দুর্ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান বলেন, ‘ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা গেছেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও একজন মারা গেছেন বলে জানতে পেরেছি। কেন এ দুর্ঘটনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘এ ঘটনা তদন্তে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইফফাত জাহানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।’