মোস্তাফিজ আমিন, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
একসময় ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খামার করে সর্বস্বান্ত হওয়া কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পোলট্রি খামারিরা সোনালি মুরগির খামার গড়ে তুলেছিলেন। দেখতে দেশি জাতের মতো এ মুরগির বাজারদর ভালো হওয়ায় ব্যবসাও হচ্ছিল বেশ। খামারিরাও নবোদ্যমে গড়ে তুলেছিলেন সোনালি মুরগির খামার। ফলে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় দুই শতাধিক খামার গড়ে ওঠে। খামারিসহ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় বহু শ্রমিকের। আমিষ উৎপাদকদের এ কর্মযজ্ঞে এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতিও বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
কিন্তু প্রকৃতি বুঝি এবারও এসব খামারির অনুকূলে বেশিদিন থাকল না। বার্ড ফ্লু, রানীক্ষেত ও গাম্বুরি রোগে আক্রান্ত হয়ে দেড় শতাধিক খামারে মড়ক লেগে তাদের সেই সোনালি স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আর ওইসব বন্ধ হওয়া খামারের খামারিরা পুঁজি হারিয়ে, ঋণের চাপে বাড়িঘর ছেড়ে যাপন করছেন ফেরারি জীবন। বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে ব্লাঙ্কচেকে বাচ্চা, খাবার আর ওষুধ এনে খামারিদের বাকি দিয়ে পোলট্রি ডিলারদের কেউ এখন কারাগারে, কেউবা সহায়-সম্বল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যাদের স্থাবর সম্পদ নেই, তারা চেকের মামলায় কোর্টের বারান্দায় দিন কাটানোর দুশ্চিন্তায় আছেন।
ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের ছাগাইয়া গ্রামের সোনালি মুরগির খামারি সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি ঋণ-ধার করে পাঁচ হাজার মুরগি নিয়ে দুই শেডের খামার গড়ে তুলেছিলেন। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তার খামারটি রোগে আক্রান্ত হয়। তিনি তখন মরা মুরগি নিয়ে পরীক্ষার জন্য ছুটে যান উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে। কিন্তু গিয়ে দেখেন সেখানে ডাক্তার নেই। পরে বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে কয়েক হাজার টাকার ওষুধ কিনে খাওয়ালেও তার খামারের মুরগিগুলো আর সুস্থ হয়নি। মরে সব সাফ হয়ে যায়। ঋণদারদের চাপে তিনি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বাড়ির আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে। উপজেলা সদরে যেতে পারছেন না ডিলারের দোকানে তার বকেয়া থাকায়।
একই গ্রামের খামারি এবং ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন মিয়া, উপজেলার শিমুলকান্দি ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের সুলতান খন্দকার, একই গ্রামের হানিফ মিয়াসহ খামারিরাও একই ধরনের কথা বলেন। তারা জানান, এভাবে চলতে থাকলে খামারগুলো টিকিয়ে রাখা যাবে না।
অন্যদিকে খামারিদের এ চরম বিপর্যয়ের সময়ে ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরেনারি সার্জন বা প্রাণিসম্পদ চিকিৎসক পদটি খালি পড়ে আছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন লিটন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, খামারিরা লাখ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন। তিনি এখানকার পোলট্রি ডিলার ও খামারিদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
পোলট্রিশিল্পে ধস নেমেছে উল্লেখ করে ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম খান জানান, তাদের অভিযোগ চিকিৎসকের অভাবে সঠিক রোগ নির্ণয় করতে না পারায় সমাধান হচ্ছে না। বদলিজনিত কারণে গত বছর ১২ নভেম্বর থেকে ভৈরবে ভেটেরেনারি সার্জন নেই স্বীকার করে এ কর্মকর্তা আরও বলেন, বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও ভেটেরেনারি সার্জন পাওয়া যায়নি।