করোনাভাইরাসের মহামারী অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছড়াচ্ছে পুরো পৃথিবীতে। বাংলাদেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণে প্রথম রোগীর মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়েছে বুধবার। আর এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে করোনায় সংক্রামিতের সংখ্যা ১৪জন বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর। এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪ চিকিৎসক করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ রয়েছেন বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদেশ ফেরতদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির সংখ্যা এবং তারা যথাযথভাবে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ বা জনবিচ্ছিন্ন থাকছেন কি না সেটাও স্পষ্ট নয়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো ব্যক্তি বা সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী বিদেশফেরতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা তাও স্পষ্ট নয়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলছে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে যত বেশি সম্ভব জনবিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কোনো ত্বরিত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তাই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ কি প্রাণঘাতী করোনা মহামারীর পদাঘাত শুনতে পাচ্ছে না?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সব দেশের প্রতি আমাদের খুব সাধারণ একটি বার্তা, তা হলো পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। সব দেশেরই উচিত সন্দেহজনক সব রোগীকে পরীক্ষা করা। চোখ বন্ধ করে থাকলে দেশগুলো এই মহামারীর সঙ্গে লড়াই করতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা ছাড়া সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা যাবে না, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা যাবে না। একই সঙ্গে সংকট কাটাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের উৎপাদন বাড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। কিন্তু বাংলাদেশ ‘স্বাস্থ্য পরীক্ষা’ এবং ‘চিকিৎসা সরঞ্জাম’ দুই বিষয়েই যে এখনো অনেক অনেক পিছিয়ে রয়েছে তা সরকারি তথ্য-উপাত্তেই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। এখনো একমাত্র আইইডিসিআর ছাড়া আর কোথাও করোনা সংক্রমণ পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়নি। এখনো দেশে করোনা পরীক্ষায় সরকারের কাছে থাকা হাজার দুয়েক ‘স্বাস্থ্য কিট’-ই সম্বল। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাও খুবই জরুরি। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের চার চিকিৎসক হোম কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার পরও এ বিষয়ে কোনো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হলো কি না তা জানানো হয়নি। অথচ সংক্রমণ ঠেকানো এবং মহামারীতে মৃত্যু কমিয়ে আনতে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সর্বাত্মক প্রস্তুতি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে যে কত ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে সেটা আবারও উঠে এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ সতর্কতায়। সংস্থাটি বলছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অতি দ্রুত বাড়ছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে ৮টি দেশে কভিড-১৯ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। বাংলাদেশ থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটানে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৪৮৫ জনের মতো আক্রান্তের খবর জানিয়েছে সংস্থাটি। এখনই এ অঞ্চলের দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে এবং আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে এবং ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে সামান্য আক্রান্তদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত আইসোলেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। কিন্তু দেশে এখনো জনসমাগম বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, রাজধানীতে ‘হাত ধোয়ার প্রশিক্ষণ’ কিংবা মফস্বলে করোনা থেকে মুক্তির জন্য ‘দোয়া মাহফিলে’ হাজার হাজার মানুষের জমায়েতের খবর পাওয়া যাচ্ছে! যদিও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বুধবার বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে অন্যান্য দেশের মতো যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে ‘শাটডাউন’ করা হবে বা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘যোগাযোগ’ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাড়িতে থেকে অফিস করার খবর পাওয়া গেলেও কল-কারখানায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিকদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা কেউ বলছে না। বিপণিবিতান, গণপরিবহনসহ শহর-বন্দরে জনসমাগম বন্ধের পদক্ষেপ কী সেটা সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মেয়র বা সরকার কেউই বলছে না। ভুলে গেলে চলবে না, অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ইতিমধ্যে ১৬৪টি দেশে ছড়িয়ে গেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন এ ভাইরাসে। আর এরই মধ্যে মারা গেছেন ৭ হাজার ৫২৯ জন। সরকার, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প উদ্যোক্তা, কলকারখানার মালিক থেকে শুরু করে দেশের সব মানুষকেই এই বৈশ্বিক মহামারীর ভয়াবহতা নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সতর্ক হতে হবে। সব মানুষের সম্মিলিত ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ ছাড়া কোনোভাবেই এই মহামারী মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা ও সতর্কতার সঙ্গে এখনই সরকারের সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।