করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৬ লাখ ২৪ হাজার বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের মাধ্যমে সারা দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় ফিরে আসা এসব যাত্রীর তদারকির মধ্যে রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। সংসদ সদস্যদের অবহিত করে জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) এ তালিকা ধরে সংশ্লিষ্টদের ধারাবাহিকভাবে তদারকির আওতায় রাখার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নির্দেশ দিয়েছেন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়ে তদারকির কাজ শুরু করে দিয়েছেন ইউএনওরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মকর্তাদের আমরা ১৪ দিন অফিস করতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। আজ (গতকাল বুধবার) সকালেই এ সংক্রান্ত নির্দেশনা ডিসিদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অন্য আরেক নির্দেশনায় যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকেও মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ডিসিদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেসব মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নামে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, শ^শুরবাড়ি বা অন্যান্য জায়গায় যাচ্ছেন তাদের সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। জনস্বাস্থ্য, জননিরাপত্তা ও জনকল্যাণের জন্য আমরা তাদের ছাড় দিতে পারি না। তাই আপনাদের জনসচেতনতা সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার অনুরোধ করা হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন। তারা প্রত্যেকেই স্ক্রিনিংকৃত যাত্রী। এসব যাত্রীর মধ্যে ৩ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ জন শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছেন। বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে এসেছেন ৩ লাখ ৬২১ জন। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে দেশে ফিরেছেন ৭ হাজার ৯৫৫ জন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশন দিয়ে যাত্রী প্রবেশ করেছেন ৭ হাজার ২৯ জন। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এসব বন্দর ব্যবহার করে দেশে ফিরেছেন ৮ হাজার ৬৬৮ জন। তবে ওই ২৪ ঘণ্টায় দুই রেলস্টেশন ব্যবহার করে কোনো বাংলাদেশি ফিরে আসেননি।
ওদিকে প্রশিক্ষণ, বৈঠক বা অন্যান্য সরকারি কাজ শেষে বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মকর্তারা অফিসে যাওয়া শুরু করলে জনপ্রশাসন থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংস্থাকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদেশফেরত কর্মকর্তারা যেন কোনোভাবেই ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে না থেকে কাজ শুরু করতে না পারেন। এদিকে সরকারের বিভিন্ন অফিসে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রুমে প্রবেশের আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা হচ্ছে। গতকাল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরে এ চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া সচিবালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে দর্শনার্থী প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। সচিবালয়ে যুগ্ম সচিব বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ পাঁচটি করে পাস ইস্যু করতে পারেন। গতকাল বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে পাস দেওয়ার অনুরোধ করলে তারা বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিদেশ থেকে যেসব স্টেশনে বাংলাদেশিরা আসছেন তাদের স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। সে সময় কোয়ারেন্টাইন কী, কীভাবে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে তা ব্রিফ করা হয়। কিন্তু কোয়ারেন্টাইনে থাকার এ নির্দেশনা আমলে নেন না বেশিরভাগ বিদেশফেরত যাত্রী। তাদের অনেকেই ঘোরাঘুরি করছেন। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে দাওয়াত খাচ্ছেন। অনেকেই যাচ্ছেন বাজার করতে বা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে। অনেকেই হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে স্ত্রী-ছেলেমেয়েসহ আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
গত ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ অমান্য করে বাইরে যাওয়ার অপরাধে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় সৌদিপ্রবাসী লাল মিয়াকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল আলম। গত ৬ মার্চ লাল মিয়া সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন। তাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছিল। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে তিনি বাড়ির বাইরে গিয়ে অবাধে চলাফেরা করেন। স্থানীয়রা খবর দিলে ইউএনও তাকে আটক করে জরিমানা আদায় করেন। পরে কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
গতকাল প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করার দায়ে কক্সবাজারে বিদেশফেরত দুই প্রবাসীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পরে ওই দুই যুবককে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে।
গত ৯ মার্চ কাতার থেকে বাংলাদেশে আসেন ৪০ বছরের এক ব্যক্তি। তার বাড়ি বগুড়ার সোনাতলায়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার পর কর্তৃপক্ষ তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকেননি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল-আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা আক্রান্ত কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশি কেউ এলে সেলফ (নিজ উদ্যোগে) কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। আমরা এসব বিষয় কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছি। কোনো ফ্লাইট বিমানবন্দরে অবতরণ করার পরপরই সংশ্লিষ্ট সবাই সতর্ক হয়ে যায়। যাত্রীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বের হতে দেওয়া হয়। তবে যেসব দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ রয়েছে তাদের হাজিক্যাম্প বা হোম কোয়ারেন্টাইন পাঠানো হয়। বিমানবন্দরের সার্বিক অবস্থা ভালো বলে জানান তিনি।
এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের এডিশনাল পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের ও অন্য সংস্থাগুলোকে পুলিশ নানাভাবে সহায়তা করছে। কোনো যাত্রী হোম কোয়ারেন্টাইন না জানলে তাদের এ বিষয়ে বোঝানো হচ্ছে। আর করোনাভাইরাসের ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি ও সৌদি আরবে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব প্রবাসী বাংলাদেশির পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। দেশে এই প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলো। করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত আট হাজারের বেশি। ইউরোপে পর্যটক ঢোকায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাস আতঙ্কে ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত আছে। সাধারণ বাজারেও প্রচন্ড অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনাভাইরাসের ব্যাপক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চাইলে জরুরিভিত্তিতে আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির বাড়ির বাইরে সাইনবোর্ড থাকবে : খুলনার জেলা প্রশাসক মো. হেলালউদ্দীন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে। না গেলে তাদের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হবে। আমরা জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করছি। জেলার টাস্কফোর্স কমিটি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছে তাদের সকাল-বিকাল তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি পর্যবেক্ষণ করবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ওই কমিটিতে রয়েছেন একজন চিকিৎসক ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা। এই কমিটি সকাল-বিকাল হোম কোয়ারেন্টাইনে যারা আছেন তাদের ভিজিট করবে। যেন সঠিকভাবে তারা কোয়ারেন্টাইনের বিধি মেনে চলেন। স্থানীয় জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে তারা বলবে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। বাড়ির বাইরে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে লেখা থাকবে বিদেশফেরত এই ব্যক্তিকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের বলা হবে তারা যেন এ বিষয়ে সতর্ক থাকে। কারণ সে মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করলে তাদের জন্য সেটা ঝুঁকিপূর্ণ।