দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করছেন, এতে নিয়মিত বড় দর পতন হচ্ছে পুঁজিবাজারে। এতে স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক নেমে এসেছে সাত বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে তা কার্যকর হবে বলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ জানিয়েছে। ফলে লেনদেন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত চলবে। আগে লেনদেনের শেষ সময় ছিল দুপুর আড়াইটা। করোনাভাইরাস আতঙ্কে প্যানিক সেলের কারণে কয়েক দিনের মতো গতকাল বুধবারও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া ৯৩ দশমিক ৫ শতাংশ সিকিউরিটিজ দর হারিয়েছে। এতে এদিন ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ১৬৮ পয়েন্ট হারিয়েছে। ফলে গত চার কার্যদিবসের টানা পতনে ডিএসইর সূচকটি ৬২৭ পয়েন্ট বা প্রায় ১৫ শতাংশ কমল। গতকালের পতন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৬০৩ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা গত সাত বছরে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৩ সালের ৯ মে সূচকটি ৩৫৫৯ পয়েন্টে নেমেছিল।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন পুঁজিবাজারে পতন হলেও দেশের পুঁজিবাজার ২০১৮ সাল থেকেই টানা দরপতনে রয়েছে। তারল্য-সংকট, ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়া ও বিদেশিদের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘটনায় এমন দরপতন চলছিল। তবে করোনাভাইরাসের কারণে চলতি মাসের শুরু থেকেই বড় দরপতন হচ্ছে, যা গত চার কার্যদিবসে ধসে রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিনের বড় দরপতনে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তবে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্র্তৃপক্ষ মনে করে, লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হলে, তাতে আরও বেশি ভীতি ছড়াবে।
লেনদেনের সময় কমিয়ে আনা প্রসঙ্গে ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলত করোনার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ও বিনিয়োগকারীরা যাতে আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করে না দেন, সে জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের ধারণা স্টক এক্সচেঞ্জ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাতে তাদের টাকা আটকে যেতে পারে। এতে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দেন। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে লেনদেন বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে করোনাভাইরাসের কারণে বড় ধরনের দর পতন হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজার সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও জর্ডান তাদের পুঁজিবাজারে সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধের ঘোষণা বিরল ঘটনা হলেও কিছু নজির রয়েছে। ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুঁজিবাজার প্রায় এক সপ্তাহ বন্ধ রাখে। এ ছাড়া সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকে সার্কিট ব্রেকারের কারণেও সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধের ঘটনা ঘটছে। দেশেও ২০১০ সালের ভয়াবহ দরপতনের সময় সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ রাখা হয়েছিল। করোনার প্রভাবে এক মাস ধরেই বিশ্বের বেশির ভাগ পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হচ্ছে। গত এক মাসে বিশ্বসেরা পুঁজিবাজারগুলো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সূচক হারিয়েছে।
টানা চার কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের দাবির মুখে গতকাল লেনদেন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ বৈঠকে বসে। লেনদেন বন্ধ কিংবা সময় কমিয়ে আনার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সঙ্গে পরামর্শও করে ডিএসই কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, এ সময় এসইসি ডিএসইকে জানিয়েছে, লেনদেনের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জের। পরে দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসই পর্ষদ। তবে দৈনিক লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত লেনদেনের এই সময়সূচি অব্যাহত থাকবে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ডিএসই। একই সঙ্গে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সতর্কতার অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের মোবাইল ও অনলাইনে লেনদেন করার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে ডিএসই।
এ বিষয়ে ডিএসইর চেয়ারম্যান মো. ইউনুসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন বন্ধ করা হলে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন। এ জন্য বন্ধ না করে লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে। মূলত বিনিয়োগকারীদের কম উপস্থিতি ও কম সময় অবস্থান নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম জানান, লেনদেনের সময় কমিয়ে আনতে ডিএসই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা তা অনুসরণ করব। বৃহস্পতিবার থেকে সিএসইতেও লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হবে।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড পাবলিক পলিসি বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লেনদেন বন্ধ কিংবা সময় কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তটি ঠিক নয়। কারণ কেউ যদি লোকসান মেনে বাজার থেকে বের হতে চায়, তার সেই সুযোগ রাখা দরকার।’
দেশের পুঁজিবাজারে ক্রেতাসংকটের কারণে ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেও গতকাল এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। গত সোমবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে ব্যাংক মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বৈঠক শেষে এমন ঘোষণা দেন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম মজুমদার। সেদিন তিনি সাংবাদিকদের জানান, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বুধবার থেকেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ শুরু করবে। তবে গতকাল এবি ব্যাংক ও আইসিবি ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক উল্লেখ করার মতো শেয়ার ক্রয় করেনি।
ব্যাংক মালিকদের এমন ঘোষণায় উৎসাহিত হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই শেয়ার কিনতে থাকলে মাত্র পাঁচ মিনিটেই ডিএসইর প্রধান সূচক ১০৮ পয়েন্ট বেড়ে যায়। তবে এরপর থেকে বিদেশিদের বিক্রিচাপ শুরু হলে সূচকের নিম্নমুখী আচরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে বেশির ভাগ শেয়ার দর হারাতে শুরু করলে দুপুর পৌনে ১২টায় সূচক উল্টো আগের দিনের তুলনায় ৩৬ পয়েন্ট কমে যায়। আরও পতনের শঙ্কায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি শুরু করলে সূচক বড় পতনে এগিয়ে যায়। দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৯৩ দশমিক ৫ শতাংশ সিকিউরিটিজের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচকটি আগের দিনের তুলনায় ১৬৮ পয়েন্ট হারায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গতকাল শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ ব্রোকারেজ হাউজ থেকে বড় ধরনের বিক্রিচাপ আসতে দেখা গেছে, যার বড় অংশই এসেছে বিদেশিদের কাছ থেকে। গতকাল ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ ১২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ৩৭ কোটি ১০ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে। এতে নিট শেয়ার বিক্রি ছিল ২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার। লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ থেকে নিট ১০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া সিটি ব্রোকারেজ ৭ কোটি টাকা, এমটিবি সিকিউরিটিজ ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা, ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা ও গ্লোব সিকিউরিটিজ থেকে ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকার নিট শেয়ার বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে গতকাল এবি সিকিউরিটিজ থেকে ১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ও আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং থেকে ৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার নিট শেয়ার ক্রয় ছিল উল্লেখযোগ্য।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৫৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর কমেছে ৩৩৩টির। বিপরীতে দর বাড়ে ১৩টির ও অপরিবর্তিত ছিল ১০টির দর। গতকাল বড় দরপতনের মধ্যেও কেনাবেচার পরিমাণ বেড়েছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ৪২৯ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ২৫ কোটি টাকা বেশি।