করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকার সব ধরনের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। মসজিদ, ধর্মীয় বিভিন্ন স্থাপনা যেমন মন্দির ও প্যাগোডা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। তবে জ্বর, সর্দি এবং ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা অনুসরণ করে ঘরে বসে নামাজ পড়তে বলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক ভিডিও কনফারেন্সে মাঠ প্রশাসনকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এদিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি অফিস বন্ধ হবে না। তবে অপ্রয়োজনীয় সভা-সেমিনার বন্ধ থাকবে। মন্ত্রিসভা ও একনেকের মতো অতি প্রয়োজনীয় বৈঠক চলবে। দেশের অভ্যন্তরে কোনো জায়গা পুরো লকডাউন (বিচ্ছিন্ন) না করে ধীরে ধীরে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন এবং সরকারের নির্দেশনাবলি তুলে ধরেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা সচিবালয় থেকে এই ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকবৃন্দ, বিভিন্ন রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক, পুলিশ সুপারবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তারা নিজ নিজ কার্যালয় থেকে এই ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন।
ভিডিও কনফারেন্সে ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি, মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস থেকে নিজেদের রক্ষায় আরও কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার প্রচারণাও জোরদারের নির্দেশ প্রদান করা হয়।
মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ঝিনাইদহ, সিলেট ও মাগুরা অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে নির্দেশ দেন। তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের নাম ও ঠিকানা সংগ্রহের পাশাপাশি পুলিশকে সন্দেহজনক করোনাভাইরাসে আক্রান্তকারী ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে আলাদা করারও নির্দেশ দেন।
স্থানীয় প্রশাসনকেও গত এক মাস বা ১৫ দিনের মধ্যে বিদেশ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে এবং তাদের বাড়িতে এবং অন্য কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন (পৃথকীকরণ) নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ৩ মাসে বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আসা ব্যক্তিদের একটি তালিকা সরকার বিভিন্ন জেলাগুলোতে পাঠিয়েছে। প্রয়োজনে তিন মাস আগে বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আসাদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করার জন্যও স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিচারের সম্মুখীন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশ থেকে আগতদের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যোগাযোগকারীদেরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে এবং করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম যেন না বাড়ে সেজন্য নজরদারি করতে বলা হয়েছে। কেননা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্থানীয় প্রশাসনকে দ-বিধির ২৬৯ ধারা অনুযায়ী হোম কোয়ারেন্টাইন বিধি ভঙ্গকারীদের শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, দ-বিধির ২৬৯ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ বেআইনিভাবে বা অবহেলা করে এমন কোনো কাজ করে যা সে জানে কিংবা বিশ্বাস করে যে, এর ফলে কোনো রোগের সংক্রমণ জীবনের জন্য বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাকে কারাদ-ে দ-িত করা হবে। এ দ-ের মেয়াদ ছয় মাস হাজতবাস বা জরিমানা কিংবা উভয়ই হতে পারে।
গণপরিবহনে চলাচল সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত হচ্ছে গণপরিবহন বন্ধ হবে না। যে সকল ব্যক্তির জ্বর, কাশি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা আছে তারদের গণপরিবহন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে যাদের এ ধরনের লক্ষণ দেখা দেবে তাদের পরিবহনের কাজ থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে গতকাল সকালে এনইসি সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, এনইসি সভায় করোনাভাইরাস বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাবধানে থেকে কাজকর্ম করবেন। অপ্রয়োজনীয় সভা-সেমিনার বন্ধ করতে বলা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে কোনো জায়গা লকডাউন বা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা হবে না। তবে ধীরে ধীরে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। করোনা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করা যাবে না। এছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয়কে প্রচার বাড়াতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর নির্দেশও দেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, করোনা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করা যাবে না। এ ছাড়া তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়কে প্রচার বাড়াতে নির্দেশ দেন। তারকা (সেলেব্রিটি), মসজিদের ইমামদের দিয়ে প্রচারের উদ্যোগ নিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর নির্দেশও দেন তিনি।
সরকারি অফিস বন্ধের সিদ্ধান্ত আছে কি নাএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এমন সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা কাজও করব, সুরক্ষাও দেবএ হলো আমাদের নীতি। করোনার কারণে আমাদের কাজ থেকে পিছপা হব না। করোনা মোকাবিলা করব সামনে থেকে, কাজও পুরোপুরি আমরা করব। কোনো কোনো মহল বলেছে, যেন এই মুহূর্তে মিটিং কমিয়ে দিই। হ্যাঁ, আমরা অপ্রয়োজনীয় মিটিং করব না। যেমন একনেক সভা, কেবিনেট সভা করতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী এগুলো বন্ধ করবেন না। আর যদি ছোটখাটো কোনো সভা থাকে, নিজ দায়িত্বে আমরা বন্ধ করতে পারি।’ লকডাউনের বিষয়ে তিনি বলেন, লকডাউন করে প্যানিক সৃষ্টি করার মতো পরিস্থিতি এ দেশে হয়নি। এ দেশে জনগণ সংখ্যায় বেশি। দেশের জনগণ লকডাউনে অভ্যস্ত নয়। অনেক সুশৃঙ্খল দেশ আছে সরকার যা অর্ডার দেয়, মেনে নেয় বিনা প্রশ্নে। সুতরাং সেসব দেশের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না। তবে লকডাউন নয়, পর্যায়ক্রমে কড়াকড়ি বা কঠোর ব্যবস্থার দিকে যাবে সরকার।
করোনার প্রভাবে সার্বিকভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উল্লেখ করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, অবশ্যই সার্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যেমন ধরুন, বাংলাদেশ বিমানের আয় কমে যাবে। রেল, বাস, স্কুলের আয় কমে যাচ্ছে। কোথায় না কমছে। এর প্রভাব আমাদের জাতীয় আয়ের ওপর পড়বে।
এরকম পরিস্থিতিতে কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশিরা ভাগ্যবান বলে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, বাজারে সাপ্লাই কমে আসবে। আপনি হয়তো এক বা দুই মাস পর তিনবেলা না খেলেও দুইবেলা খাবেন। আপনি ভাগ্যবান যে, একটা কৃষিপ্রধান দেশে বাস করছেন। কুমিল্লা-বগুড়া থেকে সবজি চলে আসবে। অনেক দেশ আছে, রাত পোহালেই বিমানে সবজি নিয়ে নামে। প্রতিদিন সকালে বিমানে সবজি, দুধ, মাখন, পাউরুটি নিয়ে নামে সুইজারল্যান্ডে। তাদের তো এগুলো নেই। তাদের তো পানি আসে বাইরে থেকে, এমন দেশও আছে।