করোনা এগিয়েছে অনেকদূর কিন্তু আমরা অনেক পিছিয়ে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। বাংলাদেশে সংক্রামক ব্যাধি এইডস নিয়ে গবেষণায় রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা। বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক আশরাফুজ্জামান মণ্ডল

দেশ রূপান্তর :  করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিয়ে দেশে সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে।  

ডা. নজরুল ইসলাম : দেশে এসবের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই, এটা গোপন কোনো কথা নয়। আমাদের এই বিরাট জনসংখ্যায় এত কমসংখ্যক কিট যথেষ্ট নয়। সরকার আমদানির কথা বলছে, কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানি যে বাণিজ্যিক উৎপাদন করছে বা বিক্রি করছে তা আমি শুনিনি। কোনো দেশ বা ল্যাবরেটরি যদি কিট তৈরি করে থাকে তাহলে ফ্রেণ্ডশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ডোনেট করতে পারে। প্রথম কিটগুলো আমরা যেভাবে পেয়েছিলাম। এখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কিট উদ্ভাবনে সফল হওয়ার কথা বলেছে এবং সরকারও তার অনুমোদনও দিয়েছে। এটা হলে নিঃসন্দেহে দেশ খুবই উপকৃত হবে। দেশে আগে থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য কিট ছিল। তবে নভেল করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট নেই।    

দেশ রূপান্তর : চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও তো একই সংকটের কথা শুনছি আমরা।

ডা. নজরুল ইসলাম : এ বিষয়ে নিশ্চিত করে আমি কিছু জানি না। তবে আমার মনে হচ্ছে অপ্রতুল। কারণ এতগুলো পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট) চাইলেই তো আর আপনি বানাতে পারেন না।  সময় লাগবে। গোটা শরীর ঢেকে রোগীকে হ্যান্ডেল করতে হয়। সেই জিনিস কি সব হাসপাতালে দেওয়া হয়ে গেছে? এখন পর্যন্ত আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, প্রায় বেশিরভাগ হাসপাতালে আলাদা করে আইসোলেশন সেন্টার, বেড করা হয়নি। গত তিনমাস ধরে গোটা বিশ্বে করোনাভাইরাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরপরও আমরা এটি মোকাবিলায় যেভাবে পিছিয়ে আছি সেটা দুঃখজনক। করোনাভাইরাস অনেক এগিয়ে গেছে কিন্তু আমরা এত পিছিয়ে থাকলাম কেন? এটাই আমার বড় প্রশ্ন। বিশ্বে যারা একটু পিছিয়ে গেছে বা ঢিলেমি করেছে তাদের অবস্থা তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। ইতালি তার অল্প জনসংখ্যাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বিরাট জনগোষ্ঠীকে সেবা দেওয়া সহজ কথা নয়। তবে সতর্কতা আপনি কী নিচ্ছেন সেটা দেখবার বিষয়। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ‘ওয়াজ উইক, ইজ ইউক’ এবং অদূর ভবিষ্যতেও একই অবস্থা থাকবে বলে মনে হচ্ছে। গতবার ডেঙ্গু হলো। আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। এবারও ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে আমাদের কোনো সচেতনতা কি আছে? কিছু বললেই ওরা (সিটি করপোরেশন) একটা ‘ফুসফুস মেশিন’ নিয়ে বের হয়। দু-চার জায়গায় ধোঁয়া মেরে বিদায় হয়। অথচ টেলিভিশনের ক্যামেরায় দেখছি গিজগিজ করছে লার্ভা। আমরা এগুলো দেখতে চাচ্ছি না। সাকসেসফুল প্রোগ্রাম দেখতে চাচ্ছি। মশা মারার ক্ষেত্রে আমরা যেসব দুর্বলতা দেখি সেখানে করোনার মতো জটিল বিষয়ে কী হবে সহজেই অনুমেয়।     

দেশ রূপান্তর :  হাসপাতালগুলোতে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু রাজধানীসহ সারা দেশে হাসপাতালগুলোর এমন প্রস্তুতির খবর আমরা পাচ্ছি না। 

ডা. নজরুল ইসলাম : বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো আমাদের দেখানো হয়নি তবে আমি বিশ্বাস করছি যে সেগুলো প্রস্তুত। কিন্তু তারা যে বলছে জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলো প্রস্তুত আছে এটা আমি বিশ্বাস করি না। এর কারণ হচ্ছে হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করতে গেলে যেসব কাজ করা দরকার সেগুলো আপনি কী করে করবেন? বা করলেনটা কোথায়? আপনি কি ১০ হাজার পিপিই আমদানি করেছেন? শাহজালাল এয়ারপোর্টে কি সেগুলো ডেলিভারি হয়ে গেছে? কোনো জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে কি পিপিই আছে। এমনকি মেডিকেল কলেজগুলোতে কি পিপিই আছে? যে পিপিইগুলো আমরা দেখছি চীনে ও ইতালিতে; আমাদের সেসব কোথায়? ফলে যেগুলো মুখে বলা হচ্ছে সেটা ‘প্রাকটিক্যালি নট’,  নেই। বা সম্ভব করার মতো কোনো উদ্যোগও নেই। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে যেগুলো বলা হচ্ছে সেটা ওভার রিঅ্যাক্ট। এমনকি মানুষকে কোয়ারেন্টাইনেও রাখা যাচ্ছে না। অনেকে বিদেশ থেকে এসে শ্বশুরবাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা ব্যবস্থাপনার সীমালঙ্ঘন করেছে। রাজনৈতিক নেতারা যে সুরে কথা বলছেন তা অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। রাজনীতি একটা হাতির সমান। এত বড় একটা জিনিস সব জায়গায় ঢোকালে যা হয় তাই হয়েছে আর কি। 

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের চিকিৎসকরা বিশ্ব থেকে কী অভিজ্ঞতা নিয়েছেন? এ ধরনের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের বিষয়ে আপনার কোনো ধারণা আছে কি?

ডা. নজরুল ইসলাম : অভিজ্ঞতা বলতে যেটা বোঝায় আক্রান্ত দেশে গিয়ে সরাসরি কাজ করে জ্ঞানলাভ করা। এরকম বাংলাদেশে কেউ নেই। তবে জ্ঞানলাভ করেছে। এটা আমরা সবাই করেছি। বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। ল্যাবরেটরি টু ল্যাবরেটরি। তারা চেষ্টা করছে। 

দেশ রূপান্তর : ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা করতে গিয়ে দেশে  বেশ কয়েকজন চিকিৎসক-নার্স মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় পেশাজীবীদের এই আত্মত্যাগের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই।  করোনার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসের চিকিৎসায় তাহলে স্বাস্থ্যকর্মীরা কতটা ঝুঁকি নেবেন?

ডা. নজরুল ইসলাম : একজন চিকিৎসক যদি আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজেই ইনফেকটেড হয়ে মারা যান আমরা তাকে কী স্বীকৃতি দেব? একটা বিরাট মিটিং করে হয়তো তাকে পুরস্কৃত করা হবে। এতে আসলে কী হবে? সবার আগে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার প্রস্তুতি।

দেশ রূপান্তর : করোনা আক্রান্ত কি না সেটা নিশ্চিত হতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সবাই পরীক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। কিন্তু দেশে এখনো পরীক্ষার সুবিধার বিস্তার ঘটছে না। এটা কীভাবে মোকাবিলা করবে সরকার?

ডা. নজরুল ইসলাম : করোনায় আক্রান্ত রোগীর কিছু উপসর্গ দেখে হয়তো আপনি ধারণা করতে পারবেন। কিন্তু নভেল করোনায় আক্রান্ত কি না সেটা জানতে হলে অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে। আমাদের অনেক সুস্থ লোকও আছেন যারা অযথা পরীক্ষা করাতে চান। তাদের দেখে আপনি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। তবে গত মঙ্গলবার যে দুজন ব্যক্তি আইইডিসিআরে পরীক্ষা করাতে এসেছিলেন তাদের মনে হয় কিছু উপসর্গ ছিল। কিন্তু তাদের বলা হলো সরাসরি এখানে এলে আমরা নেব না। আপনারা বাসা থেকে ফোন করলে আমরা টিম পাঠাব। কিন্তু অনেকে অভিযোগ করছে যে হটলাইনে ঢোকা যাচ্ছে না। ফলে জিনিসটা যে সঠিকভাবে কাজ করছে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : একমাত্র আইইডিসিআর-এর ওপর পরীক্ষার বিষয়টা ছেড়ে দিয়ে কি করোনা সামাল দেওয়া সম্ভব? 

ডা. নজরুল ইসলাম : আইইডিসিআর একটা ইনস্টিটিউট। পরিস্থিতি যদি খারাপের দিকে যায় তাহলে সারা দেশে একযোগে অনেক ঘটনা ঘটবে। তারা কতটা টিম পাঠাতে পারবে? এ বিষয়ে কোনো ধারণা আছে? একটা টিমের সঙ্গে অনেক ইকুইপমেন্ট দরকার। সেগুলোর যথেষ্ট সরবরাহ আছে? আইইডিসিআর ছাড়াও আরও দু-একটা ল্যাবরেটরিকে এখানে কাজে লাগানো যেত। আইসিডিডিআর’বি এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্মি মেডিকেল কলেজেও হতে পারে। সবাইকে নিয়ে একটা টেকনিক্যাল ট্রেনিং করা যেত। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় শহরগুলোতে যদি একটা করে টেস্টিং ল্যাবরেটরি করা যেত তাহলে আমরা প্রস্তুতিতে অনেকদুর এগিয়ে থাকতাম। কিন্তু কেন শুধু আইইডিসিআর একাই লড়ছে এটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। এখানে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে কি নাতাও আমার জানা নেই।

দেশ রূপান্তর : এখন শোনা যাচ্ছে কমিউনিটির মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। সংক্রমণ ঠেকাতে ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’-এর পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে ‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে’ বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন মনে করেন?

ডা. নজরুল ইসলাম : রোগটি তো সামাজিকভাবেই ছড়াচ্ছে। আমাদের সমাজের নিয়ম হচ্ছে আমরা সবাই স্বাধীন। কোনো জিনিসকে গুরুত্ব দিই না। ঢিলেধালা ভাব। যাদের নিয়ে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা সেই বিদেশ ফেরতরা শ্বশুরবাড়ি-আত্মীয়ের বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা চেয়েছিলাম সরকার নিজে কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করবে। কিছু স্কুল-কলেজ খালি করে জোর করে হলেও তাদের ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সরকার এটা করতে পারেনিমানে তাদের ব্যর্থতা আছে। হোম কোয়ারেন্টাইন অত্যন্ত সভ্য জনগোষ্ঠীর জন্য। বাংলাদেশের জন্য নয়। এটা আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল। কারণ আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সচেতনতা মেনে চলার মতো মানসিকতা নিয়ে চলি না। দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে যার যার জায়গা থেকে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কারও মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকলে চলবে না। সচেতনভাবে ভুল করে আক্রান্ত হওয়া এক জিনিস আর না জেনে ভুল করা অন্য জিনিস। আমরা জেনেশুনে ভুল করছি।