দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে

করোনাভাইরাসের মহামারী মোকাবিলায় বিশ্বের সব দেশেই সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে স্বাস্থ্য খাত। ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধ করতে সব দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে স্বাস্থ্য দপ্তরের জারি করা নির্দেশনা মেনে চলতে নাগরিকদের বাধ্য করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ করার ওপর। কেননা, ছোঁয়াচে এই ভাইরাসটি স্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে সংক্রামিত হয়ে যায়। করোনাভাইরাসে সংক্রামিত হয়ে একজনের মৃত্যুর পর আমাদের দেশেও অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। জনসমাগম হয় এমন সব ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে বিরত থাকার জন্যও আহ্বান জানানো হয়েছে নাগরিকদের।  কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও যথাযথভাবে এইসব নিষেধাজ্ঞা মানছেন না। সম্প্রতি বিদেশফেরত এক নেতা নিয়মানুযায়ী ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে না থেকে সরাসরি হাজির হন প্রধানমন্ত্রীর এক অনুষ্ঠানে। কাছাকাছি সময়ে করোনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য ‘হাত ধোয়ার’ প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে জনসমাগম করতে দেখা গেছে একজন সিটি মেয়রকে। এইসব ঘটনা নিশ্চয়ই সমাজে নেতিবাচক বার্তা দেবে।

এসব ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনার মধ্যেই খবরের শিরোনাম হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন মো. শাহ আলম। জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হয়েও সরকারি নির্দেশনা না মেনে লোকসমাগম করে নিজের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে সরকারি বাসভবনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন সিভিল সার্জন। বিয়ের অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকসহ তিনশর বেশি অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল ও হবিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন ক্লিনিকের দন্তচিকিৎসকদের একটি দল, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও যেখানে যেকোনো ধরনের জনসমাগম নিরুৎসাহিত করে আসছেন সে অবস্থায় একজন জেলা সিভিল সার্জনের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, জেলার সব নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব যার কাঁধে তিনি কেন এতটা দায়িত্বহীন?

করোনা সংক্রমণের সময়ে সিভিল সার্জনের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের সমালোচনা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক বলেছেন, ‘জনসমাগম এড়িয়ে চলার জন্য সরকারের নির্দেশনা না মেনে এ আয়োজনের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। কেউই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন।’ প্রসঙ্গত, এর আগে ইংরেজি নববর্ষের শুরুতে থার্টিফার্স্ট নাইটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগের ফটকের সিঁড়িতে সাজানো মঞ্চে বর্ষবরণের কনসার্টে হাজির হয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. শাহ আলম। ওই অনুষ্ঠানে রাতভর আলোকসজ্জা, উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনা ও আতশবাজিতে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। সে সময় এ নিয়ে সমালোচনা হলে ডা. শাহ আলম বলেছিলেন, চিকিৎসকদেরও চিত্তবিনোদনের দরকার আছে।  এতে রোগীদের কোনো সমস্যা হয়নি।

করোনাভাইরাসের দ্রুত বিস্তাররোধ করার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাকে। এ কারণেই বিভিন্ন দেশের শহর-বন্দর-গ্রামগুলোতে লকডাউন, শাটডাউন করা হচ্ছে।  সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে বাকিদের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করতে সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে বা ঘরবন্দি অবস্থায় থাকতে বলা হচ্ছে।  বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের ঘরবন্দি করে রাখা বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার ব্যর্থতা। ইতিমধ্যে সংক্রামিতদের বেশিরভাগই বিদেশফেরত আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছে। বিশ্বের দেশে দেশে এখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা গড়ে তুলতে সবাইকে সব ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে বিচ্ছিন্ন থাকতে বলা হচ্ছে।  বলা হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাই এখন সামাজিক ঐক্যের চাবিকাঠি। কিন্তু পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে উপনির্বাচনের ভোট আয়োজন করে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিচ্ছে।  সিভিল সার্জন লোকসমাগম করে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন। এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ বন্ধ করা জরুরি। নইলে দেশের মানুষকে সচেতন করে তোলার প্রয়াসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রশাসনসহ দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতাদের অবশ্যই এই দুঃসময়ে মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য কাজ করতে হবে। সরকারসহ সবার সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।