এয়ারলাইনসগুলোর ক্ষতি ৫০০ কোটি টাকার বেশি

করোনাভাইরাসের কারণে আকাশপথে যোগাযোগ কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশভিত্তিক হাতেগোনা কয়েকটি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চলছে। বেশিরভাগ দেশের সঙ্গেই আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।  যেসব ফ্লাইট এখনো চলাচল করছে যেকোনো সময় সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাছাড়া ওইসব ফ্লাইটে চলছে যাত্রী সংকট। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একে একে। গত বৃহস্পতিবার ১০টি অভ্যন্তরীণ ও দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার বিমানের ব্যাংকক ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। আজ সিঙ্গাপুর ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বাকি দুই আন্তর্জাতিক রুটের (লন্ডনের হিথ্রো ও ম্যানচেস্টার) ফ্লাইটও। তা হলে বিমানের ১৬টি দেশের ১৯টি রুটেই ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের কারণে গত এক মাসের ব্যবধানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ দেশের সবকটি এয়ারলাইন্সের অন্তত ৫শ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর ক্ষতির পরিমাণই বেশি। আয় কমে যাওয়ায় স্টাফদের বেতন কীভাবে দেওয়া হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে এয়ারলাইন্সগুলো।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মুহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমান চলাচল সেক্টরটিতে করোনার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো একের পর এক ফ্লাইট বন্ধ করছে। কোথায় গিয়ে এর শেষ তা বোঝা যাচ্ছে না। এয়ারলাইন্সগুলো এক অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে রয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘করোনার প্রভাবে লোকসানের দিকেই যাচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলো। যেসব দেশে ফ্লাইট চলাচল করছে সেখানে যাত্রী নেই বললেই চলে। গড়ে ১০ জনও যাত্রী থাকছে না। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটেও একই অবস্থা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মোট ১৬টি দেশের ১৯টি রুটের মধ্যে চারটিতে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৮টি ফ্লাইট চলাচল করছিল। গতকাল শুক্রবার স্থগিত হয়ে গেছে ব্যাংক ফ্লাইটও। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর অবস্থাও একই। ইউএস বাংলার কিছু নিয়মিত ফ্লাইট চললেও যাত্রী নেই। রিজেন্ট ও নভোএয়ারেরও একই অবস্থা। সবকটি এয়ারলাইন্সের আয় অর্ধেকেরও বেশি কমে এসেছে। এইভাবে চলতে থাকলে স্টাফদের বেতনও দিতে পারবে না কেউ।’   বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোকাব্বির হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনাভাইরাসের কারণে বিমানের অনেক ফ্লাইট কমানো হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে কী হয় এখনো তা বলতে পারছি না। প্রায় প্রতিদিনই ফ্লাইট কমাতে হচ্ছে। এতে বিমানের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। যুক্তরাজ্য ছাড়া ইউরোপের সব ফ্লাইটই বাতিল করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটও বাতিল করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, যেভাবে ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে তাতে উদ্বেগ তো থাকবেই। যারা টিকিট কেটেছেন তারা চাইলে অর্থ ফেরত নিতে পারবেন। আবার টিকিট কাটা যাত্রীরা পরবর্তী সময়ে ওই টিকিট দিয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফ্লাইটগুলো চলাচল শুরু হবে বলে আশা করছি। 

ইউএস বাংলার জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আমাদের অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। যেসব ফ্লাইট চলছে সেখানেও যাত্রী কম। বেশিরভাগ সিটই ফাঁকা থাকছে। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও জুয়াংযুতে সপ্তাহে ৯৮টি ফ্লাইট চলত। আর এখন চলছে মাত্র ২২টি। তবে এখনো অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ হয়নি। কতদিন চালু থাকবে তা সময় বলে দেবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনার কারণে আমাদের আয় অনেক কমে গেছে। সামনের দিনগুলোতে কী অবস্থা হবে আল্লাহ জানেন। একই কথা বলেছেন নভোএয়ারলাইন্সের সিনিয়র ম্যানেজার  (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) এ কে এম মাহফুজুল আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দিনে দিনে ফ্লাইটগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তা অকল্পনীয়। একমাত্র আল্লাহ আমাদের রক্ষা করতে পারেন।

গত বুধবার চট্টগ্রাম কক্সবাজারসহ বিমানের অভ্যন্তরীণ ৯ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। পাশাপাশি কাঠমান্ডুর ফ্লাইটও বাতিল করা হয় বলে দেশ রূপান্তরকে জানান সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোকাব্বির হোসেন। তিনি জানান, ২১ মার্চের যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী, কক্সবাজারের একটি করে ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ১৯ মার্চের চট্টগ্রামের একটি ফ্লাইট, ১৯ ও ২০ মার্চের সিলেটের ফ্লাইট এবং ২২ মার্চের কাঠমান্ডুর ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মিলে বিমানের ১২টি রুটের ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত লন্ডনের হিথ্রো ও ম্যানচেস্টার এবং সিঙ্গাপুর ও ব্যাংকক রুটে ১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল করেছে। গতকাল শুক্রবার ব্যাংকক ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে। আজ ২১ মার্চ সিঙ্গাপুর রুটের ফ্লাইটও বাতিল হয়ে যাবে। 

চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমদিকে বড় বোয়িং দিয়ে যাত্রী আনা-নেওয়া করলেও এখন যাত্রী নেই বললেই চলে। বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। কোম্পানির অন্তত দুই হাজার কর্মী রয়েছে। আগামী মাসে বেতন দেওয়াই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সাত দিনই ঢাকা-গুয়াংজু ফ্লাইট চলত। বর্তমানে চারটি চললেও কোনো যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে লোকসানের মুখে রয়েছে এয়ারলাইন্সটি।

বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, সারা বিশ্বেই এখন করোনাভাইরাস আতঙ্ক। বিশ্বের প্রায় সব দেশই ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। বিমানের অবস্থা আরও খারাপ। ১৬টি দেশের ১৯টি রুটে বিমানের ফ্লাইট চলাচল করে। শনিবার থেকে শুধু লন্ডনের হিথ্রো ও ম্যানচেস্টার রুটে বিমানের ফ্লাট চলবে। এই রুটও যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একে একে বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় গত এক মাসে বিমানের অন্তত ২৫৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতির উত্তরণ না হলে আরও ক্ষতি হবে। আকাশপথে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইউএস বাংলা, নভোএয়ার, রিজেন্ট এয়ারলাইন্সেরও একই অবস্থা বিরাজ করছে। তারমধ্যে ইউএস বাংলার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে। আমার জানা মতে, এই সময়ে সবকটি এয়ারলাইন্সের অন্তত ৫শ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এইভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে স্টাফদের বেতনও দিতে পারবে না।

রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের সিইও ইমরান আসিফ জানান, করোনাভাইরাসের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে এয়ারলাইন্সগুলোতে। আমাদের অনেক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু আছে সেখানে যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। জানি না ক্ষতি আরও বাড়বে কি না। আল্লাহ যেন সবার মঙ্গল করেন সেই কামনা করছি।

নভোএয়ারের এক কর্মকর্তা বলেন, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কাতার, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের অর্থনীতিতে বিরাট প্রভাব পড়ছে। আমাদের যতগুলো বিষয়ে ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে সেগুলোতে চীনা কোম্পানি জড়িত। ব্যবসায়ের মূল একটি অংশ চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তাও বলেছেন, আর্থিক অবস্থা নাজুক। এইভাবে চলতে থাকলে বেতনভাতা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছি।