রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে ডিম বিক্রি করেন মাসুদ মিয়া। ছয় বছর থেকে এ আয় দিয়েই চলে তার সংসার। করোনাভাইরাসের কারণে শহরে জনসমাগম কমে গেছে। ফলে তার ডিম বিক্রির পরিমাণ কমে ৫ ভাগের ১ ভাগে দাঁড়িয়েছে।
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মাসুদ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে টেনশন তো আছে, কিন্তু আয় না থাকলে পেট চলবে কেমনে? সে চিন্তা এখন বেশি করতে হচ্ছে।’ একই কথা জানালেন হারুন নামে এক রিকশাচালক। থাকেন বেগুনবাড়ি বস্তিতে। চার সদস্যের সংসার চলে তার আয় থেকে। হারুন বলেন, ‘সারা দিন তো রিকশার প্যাডেল মারার ক্ষমতা আমার নাই। আগে ঘণ্টা হিসাব করে রিকশা চালায়া চলে যেতাম। মোটামুটি ৫০০-৭০০ টাকা আয় হলেই চলত। এহন ২০০ টাকা আয় করাও দায়। কারণ মানুষ কমে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে করোনার আগেই না খেয়ে মরতে হবে।’
দেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বা ৪ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। শতকরা হিসাবে ২০ দশমিক ৫। এর অর্ধেক বা ২ কোটি মানুষ অতিদরিদ্র। তাই বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মাসুদ ও হারুনের মতো অতিদরিদ্ররাই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হলে বা লকডাউনের মতো ঘটনা ঘটলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্ররা। ইতিমধ্যে তাদের আয় কমে গেছে। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মহাচিন্তায় পড়েছেন।
৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর বদলাতে থাকে রাজধানীর চিত্র। গত সপ্তাহ থেকে যানজটের শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকার চিত্র একেবারে বদলে গেছে। গতকাল ছিল রবিবার। সাপ্তাহিক কর্মদিবসের শুরুর দিনে সাধারণত রাজধানীর অধিকাংশ সড়কেই দুপুরের পর থেকে যানজট থাকে। কিন্তু গতকাল ফার্মগেট, মতিঝিল, গুলিস্তানের মতো ব্যস্ত এলাকাও ছিল বেশ ফাঁকা। অধিকাংশ ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়নি।
কারওয়ান বাজার এলাকায় ফুটপাতে গৃহস্থালির পণ্য বিক্রি করেন জমসেদ আলী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেচাবিক্রি নেই। তারপরও বসে আছি, পেট তো চালাতে হবে। বাজারে এখন মাস্কের চাহিদা আছে। সেটাই বিক্রি করছি। তাতেও সাড়া নেই। মানুষের সমাগমই কম, বিক্রি হবে কোথা থেকে?’
ঢাকার ফুটপাতে ঝালমুড়ি, চানাচুর, আমড়া, পেয়ারা, আনারস, পেঁপে, বাতাবিলেবু, কামরাঙা, গাজর, শসার মতো বিভিন্ন কাঁচা ফলমূল কেটে মসলা মাখিয়ে বিক্রির ওপর জীবকা নির্বাহ করেন অনেকে। করোনাভাইরাসের কারণে তাদের বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে। মিরপুরের পূরবীতে বিভিন্ন ফলের শরবত বিক্রেতা হোসাইন বলেন, ‘মানুষ করোনাভাইরাসের ডরে (ভয়ে) শরবত খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। দু-একজন নিম্নআয়ের মানুষ খাচ্ছে। তারপরও বসে আছি।’
ঢাকা শহরের মধ্যবিত্তের বাহন হিসেবে পরিচিত রিকশা। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার অলিগলিতে প্রায় তিন লাখ রিকশা চলাচল করে। এর মধ্যে নিবন্ধন আছে ৮৮ হাজার রিকশার। তাদের সবার আয় কমেছে।
বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় নিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা ১৩ হাজার। তবে প্রাইভেট নেমপ্লেট লাগিয়ে অনেক সিএনজি চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় চলাচল করে। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে পাঠাও-উবারের মতো রাইট শেয়ারিংয়ের যান। ফলে মোটরসাইকেল চালিয়ে যুবক ও মধ্যবয়সী অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। যাত্রী কমে যাওয়ায় তাদের বেশিরভাগই এখন যানবাহন নিয়ে বের হচ্ছেন না। রুবেল নামে এক উবারচালক বলেন, ‘গাড়ি নিয়ে বের হয়ে লাভ নেই। যাত্রী নেই। এখন চিন্তা করছি ঘর ভাড়া নিয়ে।’
গত দশম সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে যানবাহনের একটি হিসাব তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, ঢাকা মহানগরীতে ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৩০৪টি যানবাহন চলাচল করছে। এর মধ্যে ২১ হাজার ৬১৬টি বাস, মিনিবাস ৯ হাজার ৯৪টি, প্রাইভেট কার ২ লাখ ৩০ হাজার ৩৩টি, মোটরসাইকেল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৭৪৬টি। এ ছাড়া অন্যান্য যানবাহন রয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫টি। দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটে ২৬৭টি বিআরটিসি বাস চলাচল করছে। করোনাভাইরাসের কারণে এসব বাসের যাত্রী কমেছে সবচেয়ে বেশি। অধিকসংখ্যক মানুষের সমাগম হয় বলে বাস এড়িয়ে চলছে অনেকে। রাজশাহীগামী দূরপাল্লার বাস আপাতত বন্ধ রয়েছে। এতে বাস পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ড্রাইভার, হেলপার ও গাড়ি মেরামতকারী মানুষের আয় অর্ধেকে নেমেছে। ঢাকার গাবতলী থেকে মতিঝিলগামী বাসের কয়েকজন হেলপারের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
করোনাভাইরাসের কারণে বড় প্রভাব পড়েছে পত্রিকা বিক্রিতে। অনেকে বাড়তি সতর্কতার কারণে পত্রিকা কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স সমিতির পরিচালক ইউসূফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে যেখানে একজন হকার ১০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতেন এখন তা কমে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাদের সামর্থ্য আছে তারা চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে মজুদ করেছেন। আমাদের তো টাকা নেই, দিন আনি দিন খাই। কিনব কেমনে? সরকারের উচিত ১ মাসের জন্য হলেও গরিবদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা।’
প্রভাব পড়েছে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সুপারশপেও। আতঙ্কে বা সতর্কতায় বাইরের খাবার মানুষ কম খাচ্ছেন। মিরপুর ১১ নম্বর বাজারের চা-বিক্রেতা হাফিজ বলেন, ‘চা বিক্রি তো কমেছেই। হোটেলেও বিক্রি কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে দোকান বন্ধ করে দিতে হবে।’
দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিম্নআয়ের মানুষ করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি কত দিন থাকে কেউ বলতে পারে না। সরকারের কাছে দরিদ্র মানুষের আলাদা কোনো ডেটাবেইজ নেই। এ জন্য এখন উচিত স্বল্পমূল্যে সরকারিভাবে পণ্য সরবরাহ করতে খোলাবাজারে (ওএমএস) কার্যক্রম বাড়ানো। যেসব অঞ্চলে নিম্নআয়ের মানুষ বেশি বসবাস করে সেখানে ওএমএস কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামী দুই মাস জরুরিভাবে এ কার্যক্রম চালু করা দরকার।’
এ পরিস্থিতিতে করণীয় জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবকিছুই সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। এই মুহূর্তে মানুষের জীবন কীভাবে বাঁচানো যাবে, সে চিন্তা করছে সরকার। নানারকম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে যেন কম মানুষ সংক্রমিত হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা বৈশ্বিক সমস্যা। তবে গরিব বা নিম্নআয়ের মানুষ বেশি কষ্ট পাবে—এটা সবার জানা। তবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকার অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।’