এখনো ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইন (নিজ বাড়ির একটি ঘরে কারও সান্নিধ্য ছাড়া বাস) মানানো যাচ্ছে না বিদেশফেরতদের। সরকার দেশে ফেরা প্রবাসীদের তালিকা জেলায় জেলায় পাঠিয়ে দিলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও গত কয়েক দিনে হোম কোয়ারেন্টাইনের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ার পর দেশে ফেরা মোট ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮১ জনের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া গেছে মাত্র ৩০ হাজার ৬৫২ জনকে। অথচ হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা এই স্বল্পসংখ্যক প্রবাসীকেও সঠিকভাবে নিয়ম মানানো যাচ্ছে না। এসব প্রবাসী ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে মিশছেন। বিশেষ করে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময় এসব প্রবাসী কিছুতেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। গতকাল পর্যন্ত দেশে যে মোট ৩৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ২০ জনই (বাবা, স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন) আক্রান্ত হয়েছেন
হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রবাসী স্বজনের থেকে। এমনকি এসব প্রবাসীর মাধ্যমে স্থানীয় সংক্রমণের পাশাপাশি রোগটি এখন কমিউনিটিতেও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ রাজধানীতে একটি হাসপাতালে মারা যাওয়া এক বৃদ্ধকে কমিউনিটি থেকে সংক্রমণের আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও এই বৃদ্ধের নমুনার পরীক্ষার ফল এখনো হাতে এসে পৌঁছেনি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হাতে।
এসব প্রবাসীর থেকে রোগটি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও। গতকাল সোমবার অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা বলতে আমরা কিছুটা সময় নিচ্ছি। এ জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে নিউমোনিয়ার পরীক্ষাও করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে করোনা যেন কমিউনিটিতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য বিশেষজ্ঞরা এখন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলছেন, বিদেশফেরত বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখার সময় এসে গেছে। কারণ সরকার শুরু থেকেই হোম কোয়ারেন্টাইনের ওপর জোর দিলেও তা মানানো যাচ্ছে না প্রবাসীদের। সরকারের পক্ষ থেকে আইন প্রয়োগ করে দেশে ফেরা প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলেও তারা সেটাও মানছেন না। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইনের পরিবর্তে জোরপূর্বক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে যেসব দেশে আক্রান্ত বেশি, সেসব দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা না গেলে কমিউনিটিতে রোগটি ছড়িয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে করোনা নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে।
পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সরকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রোগটি যেন কমিউনিটিসহ আর ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সব অফিস-আদালত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের নেওয়া ১০ সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে গণপরিবহন চলাচল সীমিত রাখা, সব রকম সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোয় সামাজিক দূরত্ব ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থার জন্য বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে আজ থেকে নামছে সেনাবাহিনী।
এর আগে প্রবাসীদের নিজ নিজ এলাকায় ও বাড়িতে আটকাতে ঝুঁকিপূর্ণ মাদারীপুরের শিবচর ও গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এলাকাভেদে গুচ্ছ গুচ্ছ (বাড়ি, ফ্ল্যাট বা এলাকা) কোয়ারেন্টাইনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইইডিসিআর। চারটি দেশ বাদে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। সড়কপথও সংকুচিত হয়ে আসছে।
এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, হোম কোয়ারেন্টাইনে কাজ হবে না। অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন লাগবে। কারণ হোম অনেকে মানছেন না, অনেকে মানছেন। ফলে কোনো কাজ হচ্ছে না। সংক্রমণ বাড়ছে। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, জেলা ও উপজেলাকেন্দ্রিক কোয়ারেন্টাইন সেন্টার করতে হবে। তালিকা ধরে ধরে খুঁজে বের করে সেখানে রাখতে হবে।
সরকারের সব অফিস-আদালতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত কাজে লাগাতে হবে উল্লেখ করে এই ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন দেশের নাগরিকরা যার যার এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সুতরাং সরকারের উচিত হবে এখন বিদেশফেরতদের খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা। সেখানে প্রত্যেকের পরপর দুবার পরীক্ষা করবে। সংক্রমণ না পেলে এরপর তাদের ছাড়বে। আর সংক্রমণ পেলে সেখান থেকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে। এ ছাড়া ব্যাপক আকারে করোনা ছড়িয়ে পড়া রোধ করা যাবে না। করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচরে হোম কোয়ারেন্টাইন না মানার সবচেয়ে করুণ ঘটনাটি ঘটেছে। দেশে যে ৩৩ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষ চিহ্নিত হয়েছেন, তার ৭ জনই একটি পরিবার থেকে এসেছেন। এরা মাদারীপুরের শিবচরের একজন ইতালিফেরত প্রবাসীর পরিবারের সদস্য এবং শ^শুরপক্ষের আত্মীয়স্বজন। কীভাবে বিদেশফেরতদের জন্য জারি করা স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশ লঙ্ঘন করে অসতর্ক চলাফেরা ও আচরণের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিটি এতগুলো মানুষকে সংক্রমিত করেছেন তার বিস্তারিত বিবরণ বিবিসিকে জানিয়েছেন সেখানকার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। শিবচরে এই সংক্রমণের শুরু হয় দুজন ইতালিফেরত প্রবাসীর মাধ্যমে। এরা মূলত দুজন বন্ধু। প্রথমেই তাদের দুজনকে কভিড-১৯ পজিটিভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে তাদের আত্মীয়স্বজনকে পরীক্ষা করে দেখা যায়, একজনের বাবা, স্ত্রী, দুই সন্তান, শাশুড়ি এবং শ্যালকের স্ত্রীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) প্রধান চিকিৎসক ডা. আজহারুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগেই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া উচিত ছিল। বিষয়টা সবার কাছে এত পরিষ্কার ছিল না। কিংবা সরকার বোঝাতে পারেনি। এখনো সময় আছে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। অন্ততপক্ষে রোগটি আর ছড়াতে পারবে না।
সে ক্ষেত্রে কাদের এ ধরনের কোয়ারেন্টাইনে নিতে হবেÑ জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যারা আক্রান্ত তাদের আইসোলেশনে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। বাকি যাদের মধ্যে করোনার সন্দেহ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক প্রবাসী এবং যারা আক্রান্তদের সান্নিধ্যে গেছেন, তাদের অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিতে হবে। কারণ এসব প্রবাসীকে হোম কোয়ারেন্টাইনে ঠিকমতো রাখা যায়নি। তারা নিজেরা আক্রান্ত হয়েছেন, বাড়ির লোকজনদের আক্রান্ত করেছেন। এখন সন্দেহ হচ্ছে, তাদের সান্নিধ্যে এসে রোগটি ইতিমধ্যেই কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে কি না। কারণ তারা যেভাবে ঘোরাঘুরি করছেন, তাতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল না। এ কারণেই রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত অন্য দেশ থেকে শিক্ষা নিলে পরিস্থিতি এমন হতো না। এখনো সময় আছে। প্রবাসীদের তো বটেই, আক্রান্ত ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে যারাই গেছেন, তাদেরই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিতে হবে।
‘সরকার জেলায় জেলায় পৃথক ভবন বা স্থাপনা করে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন সেন্টার করতে পারে। তবে যেখানেই করুক, অবশ্যই সেখানে যাদের নেওয়া হবে তাদের জন্য সব সুযোগ-সুবিধা রাখতে হবে। পরিবেশ ভালো হতে হবে। নিয়ে গেলাম, আর জোর করে রাখলাম, তাহলে হবে না। দেখাশোনাটা ভালোভাবে করতে হবে।’ মত দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার হোম ও প্রাতিষ্ঠানিকÑ দুই ধরনের কোয়ারেন্টাইন নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারকে হোম কোয়ারেন্টাইনে জোর দিতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গতকাল পর্যন্ত মোট কোয়ারেন্টাইনের সংখ্যা ২৩ হাজার ৬৮৪। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬২১ জনের কোয়ারেন্টাইন শেষ হওয়ায় বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১৯ হাজার ৬৩ জন। এর মধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনের সংখ্যা ২৩ হাজার ৫৪৮ জন ও প্রাতিষ্ঠানিক (হাসপাতাল ও অন্যান্য) কোয়ারেন্টাইনের সংখ্যা মাত্র ১৩৬। এমনকি গত ২৪ ঘণ্টায় যেখানে হোম কোয়ারেন্টাইনে গেছেন ৭ হাজার ১০৪ জন; সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৮ জনকে। অথচ গতকালও দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে দেশে ১ হাজার ৯ জন প্রবেশ করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোয়ারেন্টাইনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত রবিবার মাত্র ৮ জেলায় ২১ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে গাজীপুরে একজন, কিশোরগঞ্জে তিনজন, মাদারীপুরে তিনজন, ময়মনসিংহে একজন, কক্সবাজারে দুজন, বান্দরবানে আটজন, ফেনীতে দুজন ও সিলেট জেলায় একজনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে।
অবশ্য বিদেশফেরত সবাইকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখার পক্ষে নয় আইইডিসিআর। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম পছন্দ হোম কোয়ারেন্টাইন। সেখানে না মানলে পরে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। যাদের হোম দরকার, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আনার প্রয়োজন নেই।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, আমরা একাধিক রোগী রয়েছে বা তাদের সান্নিধ্যে গেছেন এমন লোকজন রয়েছেন, সেসব এলাকা, বাসা বা ফ্ল্যাটে গুচ্ছ গুচ্ছভাবে সামাজিক কোয়ারেন্টাইন করে রাখব। যে এলাকায় হয়েছে, সেখান থেকে আর যেন কেউ সংক্রমিত না হয়, সে জন্য ওই এলাকা কোয়ারেন্টাইন করে দেওয়া হবে, যাতে রোগকে আটকে দেওয়া যায়, নতুন সংক্রমণ যেন না হয়। এখন সামাজিক কোয়ারেন্টাইন করা হবে।