করোনায় তৃতীয় মৃত্যু, নতুন রোগী ছয়, আক্রান্ত বেশি ঢাকায়

দেশে করোনাভাইরাসে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে রোগটিতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল তিনজন। পাশাপাশি নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ছয়জন। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ জনে। নতুন আক্রান্তদের একজন বাদে সবার অবস্থা স্থিতিশীল।

গতকাল সোমবার বিকেলে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত অনলাইন লাইভ ব্রিফিংয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এ তথ্য জানান। এখন থেকে এভাবেই ব্রিফ করা হবে।

আইইডিসিআর জানায়, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে একজন স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন। এ নিয়ে দেশে তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন নার্স ও একজন চিকিৎসক।

আইইডিসিআর পরিচালক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহভাজন হিসেবে আরও ৫৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে এ ছয়জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও তিনজন নারী। এদের মধ্যে একজনের বয়স ২০-৩০ বছরের মধ্যে, একজনের ৩০-৪০ বছরের মধ্যে, দুজনের বয়স ৪০-৫০ বছরের মধ্যে এবং একজন ষাটোর্ধ্ব ও একজন সত্তরোর্ধ্ব।আক্রান্ত ছয়জনের মধ্যে ভারত ও বাহরাইন থেকে এসেছেন দুজন। এ দুজনের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ছাড়াও অন্য সংক্রমণ ছিল বা দীর্ঘমেয়াদি অন্য রোগ ছিল। আইইডিসিআর জানায়, গতকাল পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৬২০ জনের। সব মিলিয়ে দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩। এই ৩৩ জনের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন পাঁচজন। তিনজন মারা গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৫ জন। এছাড়া করোনার সন্দেহজনক উপসর্গ থাকায় ৫১ জনকে হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৪৬ জন।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, মোট আক্রান্ত ৩৩ জনের মধ্যে ১৩ জনই বিদেশ থেকে এসেছেন। এর মধ্যে ইতালি থেকে ছয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুই, ইউরোপের অন্যান্য দেশে থেকে দুই, ভারত থেকে এক, বাহরাইন থেকে এক এবং কুয়েত থেকে একজন এসেছেন। বাকি ২০ জন বিদেশ থেকে আসা এই ১৩ জনের মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে সংক্রমিত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে ১১ জনের। এদের মধ্যে বেশিরভাগেরই অবস্থা স্থিতিশীল। একজনের কিডনির সমস্যা থাকায় তার ডায়ালাইসিস চলছে।

মোট আক্রান্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, এ পর্যন্ত রোগীদের মধ্যে পুরুষ দুই-তৃতীয়াংশ ও এক-তৃতীয়াংশ নারী। আক্রান্তদের মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী দুই, ১০-২০ বছরের মধ্যে এক, ২১-৩০ বছরের মধ্যে নয়, ৩১-৪০ বছরের মধ্যে নয়, ৪০-৫০ বছরের মধ্যে পাঁচ, ৫১-৬০ বছরের মধ্যে এক এবং ষাটোর্ধ্ব রয়েছেন ছয়জন। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকার, ১৫ জন। এছাড়া মাদারীপুরের ১০, নারায়ণগঞ্জের তিন, গাইবান্ধার দুই এবং কুমিল্লা, গাজীপুর ও চুয়াডাঙ্গার একজন করে আক্রান্ত হয়েছেন। ব্রিফিংয়ের শুরুতে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে নাগরিকদের করণীয় তুলে ধরেন ডা. ফ্লোরা।

বাংলাদেশে এ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এরপর দিন দিন এ ভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা বেড়েছে। সবশেষ সরকারি হিসাবে, দেশে এখন পর্যন্ত ৩৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন তিনজন।

কিট রয়েছে, প্রস্তুত হাসপাতাল ও আইসিইউ : সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর জানায়, করোনা সংক্রমণরোধে সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি করা রয়েছে। বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটিগুলো কোয়ারেন্টাইনে থাকা লোকজনকে পর্যবেক্ষণে রাখবে। জাতীয় কমিটির প্রধান হিসেবে আছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ক্যাবিনেট সেক্রেটারি। এছাড়া বিদেশি এজেন্সিগুলো এবং সব মিলে ৩১ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।

আইইডিসিআর পরিচালক জানান, নতুন করে ১০০ আইসিইউ বেড নিয়ে আসা হয়েছে। আরও ৩৫০টি আইসিইউ বেড আনা হচ্ছে। প্রতিটি জেলা শহর হাসপাতালগুলোতে ১০০ বেড করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকায় আগে থেকেই ছয়টি হাসপাতালে আইসিইউ বেড তৈরি ছিল। এর সঙ্গে নতুন করে গ্যাস্ট্রো লিভার হাসপাতাল ও শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটসহ সব মিলে দুই হাজার বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নতুন করে আরও যদি দরকার হয় তাহলে ইজেতমা ময়দান প্রস্তুত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দিয়াবাড়ীতে যে বিল্ডিংগুলো রয়েছে সেগুলো প্রস্তুত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পরিচালক আরও বলেন, হাসপাতালগুলোয় করোনা রোগী যদি বেশি হয়ে যায়, তাহলে সব দিক দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালকেন্দ্রিক প্রস্তুতি রয়েছে। এর পাশাপাশি পিপিই নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত রয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বলার চেষ্টা করছেন। আমাদের হাতে দুই লাখের মতো কিট রয়েছে। আমাদের প্রতিদিনই আসছে ডাক্তারদের গাউন পিপি। কিট নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অনেক বড় বড় দেশ আক্রান্ত হয়েছে, অনেকে মারা গেছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে আক্রান্তের সংখ্যা মৃতের সংখ্যা চেয়ে অনেক কম। আমাদের যে উদ্যোগগুলোর নেওয়ার সেগুলো যদি আমরা ঠিকমতো পালন করি তাহলে ইনশাআল্লাহ দেশে এটি খুব বেশি বড় প্রভাব ফেলতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে সবাইকে নিজ নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. ফ্লোরা বলেন, আমরা প্রথম থেকেই কক্সবাজারে যাতে কোনোভাবে জনসমাগম না হয় সেজন্য সেখানকার পর্যটন ব্যবস্থা বা ওইখানে যাতে কেউ ভ্রমণে না যান সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে আইইডিসিআরের ল্যাব প্রতিষ্ঠা রয়েছে। সেই ল্যাবটিও আমরা প্রস্তুত রেখেছি। কক্সবাজারে কোনোভাবে রোগী হয় সে ক্ষেত্রে আমরা সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারব।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কো-অর্ডিনেশন কমিটি : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আট সদস্যের কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. হাবিবুর রহমান খান এ কমিটির সভাপতি এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের (পার্সোনাল-১) অধিশাখার উপসচিব শামীমা নাসরিন সদস্য সচিব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নার্সিং ও মিডওয়াইফারি) মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. সাইদুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) মো. সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব (ওষুধ প্রশাসন) মো. ইসমাইল হোসেন, যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) বেগম শাহিনা খাতুন, যুগ্ম সচিব (পার্সোনাল) তপন কুমার বিশ্বাস।

গতকাল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব খন্দকার জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশ জারি হয়। এতে বলা হয়, কমিটি সারা দেশে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবে। কমিটি প্রয়োজন অনুসারে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।