কুড়িগ্রামের সাবেক সিনিয়র সহকারী কমিশনার (আরডিসি) নাজিম উদ্দিনের সম্পদের হিসাব চাওয়া হচ্ছে। বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এদিকে মধ্যরাতে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীন, জেলা প্রশাসনের তিন কর্মকর্তা আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে কেন সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রত্যাহারকৃত ডিসি সুলতানা পারভীনসহ চারজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছি। তাদের কেন সাময়িক বরখাস্ত করা হবে নাÑ জানতে চেয়ে তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। যাতে তারা আদালতে গিয়ে বলতে না পারে আমাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের জবাব পাওয়ার পর এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে নানা সন্দেহের সৃষ্টি করেছেন। মধ্যরাতে আদালত পরিচালনা করায় পুরো বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সাংবাদিক আরিফুলকে নির্যাতনের যে অভিযোগ উঠেছে তাতে প্রশাসনের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। তাছাড়া তার অর্জিত সম্পদও আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। বিষয়গুলো কমবেশি তদন্তেও প্রমাণ হয়েছে। মধ্যরাতে সাংবাদিক ধরে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা প্রদান সংক্রান্ত প্রকাশিত কিছু সংবাদের ওপর তদন্ত করার জন্য রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আবু তাহের মো. মাসুদ রানাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, আরডিসি নাজিম উদ্দিন বিভিন্ন সময় মাগুরার মোহাম্মদপুরে এবং কক্সবাজারের সদর উপজেলায় এসিল্যান্ড হিসেবে কাজ করেছেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজারে চাকরির সময় ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন। নির্যাতনের ওই ভিডিও সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এছাড়া যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার ভগবানপাড়ায় তিনি চারতলা বাড়ি নির্মাণ করছেন। বিভিন্ন স্থানেও তার বেনামে বিভিন্ন সম্পদ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, কিছু অভিযোগের সত্যতা তদন্ত কমিটি পেয়েছে। অবশিষ্ট অভিযোগগুলো বিভাগীয় মামলার সময় খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হবে। চাকরি পাওয়ার ছয়-সাত বছরের মধ্যে তিনি কী করে বিত্তবান হলেন তা দেখা হবে। সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় সব সরকারি কর্মচারীকে তার সম্পদের হিসাব দিতে হয়। ওই সময়ের সম্পদের সঙ্গে বর্তমান সম্পদ তুলনা করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যাবে।
গত ১৩ মার্চ মধ্যরাতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পরে মাদক মামলায় সাজা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। আরিফুলের পরিবারের দাবি, কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তিনি এসব করিয়েছেন। এ অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন রিন্টু বিকাশ চাকমা। অভিযোগ আছে, এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) নাজিম উদ্দিন, রাহাতুল ইসলামও সঙ্গে ছিলেন। আরিফুল ইসলামের আরও অভিযোগ, জেলা প্রশাসনের আরডিসি নাজিম উদ্দিন বাড়িতে ঢুকে তাকে পেটান। এনকাউন্টারে দেওয়ারও হুমকি দেন। ঘরে কোনো তল্লাশি চালানো না হলেও পরে ডিসি অফিসে নেওয়ার পর তারা দাবি করেন, আরিফুলের বাসায় আধা বোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আরিফুল ইসলামকে এক বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। অবশ্য পরের দিনই তাকে জামিন দেওয়া হয়। আরিফুলকে নির্যাতন এবং সাজা দেওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
সাংবাদিক নির্যাতনের এ ঘটনায় গত ১৬ মার্চ সুলতানা পারভীনসহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের আরডিসি নাজিম উদ্দিন এবং সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়। তাদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।