ঢাকায় ফিরে বিড়ম্বনায় পাইলট ও ক্রেবিন ক্রুরা

‘করোনা নিয়ে এসেছেন বাসায় ঢোকা যাবে না’

লন্ডনের হিথ্রো ও ম্যানচেস্টারে ফ্লাইট শেষে ঢাকায় ফিরে বাসায় ঢুকতে গিয়ে মহাবিড়ম্বনায় পড়ছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাইলট ও কেবিন ক্রুরা। তাদের বাসায় ঢুকতে দারোয়ানরা বাধা দিচ্ছেন। বলছেন, বাড়ির মালিক বলেছেন ‘আপনারা বিদেশ থেকে করোনাভাইরাস নিয়ে এসেছেন। এজন্য বাসায় ঢোকা যাবে না।’ এ নিয়ে বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে বাগবিতন্ডাও হচ্ছে পাইলট ও কেবিন ক্রুদের।

ম্যানচেস্টার থেকে ফিরে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কয়েকজন কেবিন ক্রু ও পাইলট দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানান। তাদের একজন বলেন, ‘আতঙ্কের মধ্যেই ফ্লাইট চালাচ্ছি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে হচ্ছে। বিমান কর্র্তৃপক্ষকে বলেও কাজ হচ্ছে না। তারা শুধু আশ্বাস দিয়ে বলছে, করোনাযুদ্ধে সবাইকে জয়ী হতে হবে। বীরবেশে ফিরতে হবে।’ 

এদিকে করোনাভাইরাসের কারণে শেষ পর্যন্ত বিমানসহ সব এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল রাত ১২টা থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। তাছাড়া কেবিন ও পাইলটদের সুরক্ষার কথা চিন্তুা করে লন্ডনের হিথ্রো ও ম্যানচেস্টারের আটটি ফ্লাইট আজ বা আগামীকাল বন্ধ ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এই নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তিনি জানান, একে সব ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। খুবই ঝুঁকির মধ্যে লন্ডন রুটে ফ্লাইট চলছে। এই নিয়ে সবার মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। বিষয়টি মন্ত্রী, সচিব ও এমডি অবহিত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত শনিবার রাত থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে চারটি দেশ ও অঞ্চল বাদে সব দেশের ফ্লাইট। থাইল্যান্ড, চীন, যুক্তরাজ্য, হংকংয়ের সঙ্গে বিমান চলাচল আছে। অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এসব রুটে যাত্রী আসা-যাওয়া করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিগগিরই এসব রুটের ফ্লাইটও বন্ধ করার কথা চিন্তা রয়েছে। ইউএস বাংলা, নভোএয়ার ও রিজেন্ট এয়ারলাইনসের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের লন্ডনের হিথ্রো ও ম্যানচেস্টারে আটটি ফ্লাইট চলাচল করছে। তবে এসব ফ্লাইট চালাতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়ছেন বিমানের পাইলট ও কেবিন ক্রুরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কেবিন ক্রু ও এক পাইলট গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন শুক্র, শনি, রবি, সোম ও বুধবার হিথ্রো আর ম্যানচেস্টারে রবি, মঙ্গল ও বুধবার ফ্লাইট চলাচল করছে। তবে ফ্লাইটগুলোতে অন্য দিনের তুলনায় কেবিন ক্রু ও পাইলটের সংখ্যা কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ম্যানচেস্টার থেকে ঢাকায় এসে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে আমাদের। একটি অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলাম। ওইদিন রাত আনুমানিক ১২টার দিকে বাসার উদ্দেশে বিমানবন্দর ছেড়ে যাই। কিন্তু বাসার গেটের সামনে যাওয়া মাত্রই দারোয়ান গেট খুলতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারণ জানতে চাইলে দারোয়ান জানান, ‘আপনারা বিদেশ থেকে করোনাভাইরাস নিয়ে এসেছেন। বাড়ির মালিক ঢুকতে নিষেধ করেছেন। এই নিয়ে বাড়ির মালিকের সঙ্গে তর্কবিতর্ক পর্যন্ত করতে হয়েছে। বাড়িওয়ালাও নাছোড়বান্দা। পরিস্থিতি শান্ত না হলে আমরা বাসায় উঠতে পারব না বলে সাফ জানিয়ে দেন। আমাদের জন্য ফ্ল্যাটের অন্যদের এই রোগ ছড়িয়ে পড়–ক তা তিনি চান না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরে বাধ্য হয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় রাত কাটাতে হয়েছে। বাসা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানালে বাড়িওয়ালা বলেন, দিনের বেলায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসার পর বাসায় উঠতে পারবেন। বাধ্য হয়ে বিমানবন্দরে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাসায় যেতে হয়েছে। আমার মতো বাকিদেরও একই অবস্থা হয়েছিল।’ তিনি জানান, পুরো আতঙ্কের মধ্যে প্রায় ১১ ঘণ্টা বিমানটি চালাতে হয়। শুধু করোনার কথাই বেশি মনে পড়ে। আর মনে পড়ে পরিবারের কথা। সমস্যা ও আতঙ্কের বিষয়টি বিমান কর্র্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লন্ডন রুটে চলাচলরত পাইলট ও কেবিন ক্রুদের নানা সমস্যার বিষয়ে আমরা অবহিত হয়েছি। তাদের কথা চিন্তা করেই আজ-কালের মধ্যে এই রুটের ফ্লাইটগুলো বন্ধ করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘তিন  দেশ ও এক অঞ্চল বাদে সব আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে যেসব দেশে ফ্লাইট চলছে সেগুলোও বন্ধ করে দিতে হবে। দেশে করোনা বিস্তাররোধে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর এবং ভারত থেকে কোনো আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক উড়োজাহাজকে কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার অনুমতি দেওয়া হবে না। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ আছে।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোকাব্বির হোসেন জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিমানের ফ্লাইট নেই বললেই চলে। লন্ডনে কয়েকটি ফ্লাইট চলছে। এতে বিমানের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ সব ফ্লাইটও বাতিল করতে হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফ্লাইটগুলো চলাচল শুরু হবে বলে আশা করছি। 

বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউএস বাংলার জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনাভাইরাসের কারণে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। এখন আর কোনো ফ্লাইট নেই। সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোও বন্ধ করা হয়েছে। ঢাকা থেকে কলকাতা, চেন্নাই, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, গুয়াংজু, মাসকট, দোহা এবং চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা, চেন্নাই, দোহা ও মাসকট রুটে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট চলাচল করছিল।