খাবার ফুরাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের

করোনাভাইরাস আতঙ্কে প্রায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক ও ফেরিওয়ালাসহ খেটে খাওয়া মানুষ কাজ পাচ্ছেন না। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের সবার। সাধারণ মানুষ বলছেন, হাতে যা সঞ্চয় ছিল ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাঁচার তাগিদে গ্রামে চলে যাচ্ছেন অনেকে। আর যাদের ঋণের চাপ রয়েছে তারা পড়েছেন আরও বিপাকে। আয়ের পথ বন্ধ হলেও কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন ঢাকার লাখ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষ।

ঢাকায় কত সংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষ বাস করে এ বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৪ সালের বস্তি শুমারি অনুযায়ী ঢাকায় ৬ লাখ বস্তিবাসী রয়েছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের অনেকে এই পরিসংখ্যানটি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের হিসাবে ঢাকায় শুধুমাত্র গার্মেন্টসকর্মী আছে ১০ লাখের ওপরে। রিকশাওয়ালা আছে প্রায় ৫ লাখের মতো। এর বাইরে দিনমজুর, সিএনজিচালক, গণপরিবহন শ্রমিক, চা দোকানদার, ফেরিওয়ালা ও হকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার দিন আনে দিন খায় এমন মানুষের সংখ্যা আরও ২০ লাখ। এই বিপুলসংখ্যাক জনগোষ্ঠীর আয়ের পথ থমকে গেছে।

হাজারীবাগের একটি বস্তির বাসিন্দা গৃহকর্মী খাদিজা বেগমের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে তিন দিন আগে বিভিন্ন বাসার গৃহকর্ত্রীরা যেতে নিষেধ করে দিয়েছেন। কাজে থাকলে খাবারের বেঁচে যাওয়া অংশ তিনি নিয়ে আসতেন। এতে পাঁচ জনের সংসারে খরচ ছিল সামান্য। এখন তা বেড়ে হয়েছে কয়েক গুণ। বিপরীতে আয় নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। হাতে যে টাকা আছে তা দিয়ে দুদিনের বেশি সংসার চলবে না তার। ঝাউচর এলাকার অটোরিকশা চালক মজনু মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার আতঙ্কে কাজ করুম না ঘরে থাকুম ঠিক করবার পারতাছি না। ক্যামন শহর ক্যামন হইয়া গেল! এখন সংসার চালামু ক্যামনে বুঝবার পারতাছি না। সপ্তাহে দুইটা কিস্তি দিতে হয়।’

ঢাকার বস্তিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখনো করোনাভাইরাস সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই তাদের। রোগটি কীভাবে ছড়াতে পারে সে সম্পর্কেও জানেন না তারা। ফলে চায়ের দোকান ও রিকশার গ্যারেজে বসে আড্ডায় অলস সময় পার করছেন তারা। এসব আড্ডায় করোনাভাইরাস সম্পর্কে নানা ধরনের গল্প-গুজব নিয়ে দিনরাত আলোচনা চলছে। অনেকে বলছেন, করোনাভাইরাস শেষ হলে নতুন করে আরও কয়েকটি মহামারী দেখা দেবে। এর মধ্যে পাকিস্তান ও ভারতে ইতিমধ্যে দেখা দেওয়া পঙ্গপালের আক্রমণ নিয়ে নানা গল্প আছে সাধারণ বস্তিবাসীর মধ্যে। রায়েরবাজারের চা দোকানি আকাইদ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্যাশে গজব পড়া শুরু হইছে। করোনা গেইলে পঙ্গপাল আক্রমণ চালাইব। ফসলের ক্ষ্যাত খাইয়া সাবাড় কইরা ফালাইব। মানুষ না খাইয়া মরব। দুনিয়ায় দুর্ভিক্ষ আইতাছে।’

বস্তিগুলো ঘুরে দেখা যায়, সরকার ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। এতে বস্তিগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়েছে। যে যার মতো করে রাজধানী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তবে যাদের গ্রামের বাড়ি নেই তারা থেকে যাচ্ছেন। ফলে তাদের উদ্বেগও অনেক বেশি। রায়েরবাজারের ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী কবির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিস্তি থেকে ৫০ হাজার টাকা টাকা তুইল্যা ব্যবসা করতাছি। সপ্তাহে এক হাজার টাকার বেশি কিস্তি দিতে হয়। আয় নাই এক টাকাও। ঘরে দুই দিনের বেশি খাবারও নাই। বউ-সন্তান লইয়া এখন কই যামু কী করমু চিন্তায় ঘুম আইতাছে না। আবার শুনতাছি করোনার পর পঙ্গপাল আইব। ক্ষ্যাত খাইয়া শ্যাষ করব। তখন তো না খাইয়া মইরা যামু!’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হচ্ছে সবাইকে লকডাউনে পাঠাতে হবে। এতে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লাভ হবে। তবে যাদের একেবারেই বাইরে না গেলে হয় না তাদের সে রকম দুস্থ মানুষদের জন্য সরকার অন্তত ১৪ দিনের কিছু পরিকল্পনা নিতে পারে। যাতে তারাও ঘর থেকে বের না হয়। এর সঙ্গে কীভাবে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সেটা নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে।’