একাত্তরের মার্চে বিদেশি সংবাদপত্রে বাংলাদেশ

একাত্তরের মার্চ থেকে সিডনি শনবার্গ, মাইকেল লরেন্ট, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, মার্ক টালি, ড্যান কোগিন, সাইমন ড্রিং, নিকোলাস টোমালিন, ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ, মার্টিন ওলাকট, জন পিলজার, ডেভিড লোশাক, পিটার হ্যাজেলহার্স্ট ও আরও অনেকে তখন বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণ করছেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে, তার সাক্ষী হয়ে রইলেন কজন বিদেশি সাংবাদিক। ৩৫ জন বিদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিকে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময়ের জন্য আটকে রাখা হয় ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ২৭ মার্চ বলপ্রয়োগ করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়। ২৮ মার্চ ১৯৭১ নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হুমকি দিয়েছে, হোটেল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা হলে সাংবাদিকদের গুলি করা হবে।

সাংবাদিকরা হোটেল থেকেই দেখতে পেয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহীদের সমর্থক নিরস্ত্র বেসামরিক লোকজনকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গুলি করছে। বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় করাচির উদ্দেশে বিদেশি সাংবাদিকদের উড়োজাহাজে তোলার আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গসহ অন্য সাংবাদিকদের তল্লাশি করা হয়। তাদের নোটবই, ছবির ফিল্ম ও ফাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়। বহিষ্কৃত সাংবাদিকরা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান ও রাশিয়ার সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে কর্মরত ছিলেন। বহিষ্কারের কারণ জানতে চাওয়া হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা আমাদের ব্যাখ্যা করার কিছু নেই, এটা আমাদের দেশ।’

৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিক বহিষ্কার

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ২৮ মার্চ প্রকাশিত : ঢাকার একটি হোটেলে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে রাখার পর সামরিক কর্তৃপক্ষ ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিককে গতকাল (২৭ মার্চ, ১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তান থেকে বের করে দিয়েছে।

উত্তর ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে বের হলে তাদের গুলি করার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সাংবাদিকরা হোটেল থেকে দেখতে পেয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানি বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী নিরস্ত্র বেসামরিক লোকজনকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গুলি করছে। করাচির উদ্দেশে সাংবাদিকদের উড়োজাহাজে তোলার আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গসহ অন্য সাংবাদিকদের তল্লাশি চালানো হয়। তাদের নোটবই, ছবির ফিল্ম ও ফাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়।

বহিষ্কৃত সাংবাদিকরা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, রাশিয়ার সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে কর্মরত। ঢাকায় অবস্থানকালে সাংবাদিকদের সংবাদ পাঠাতে বা কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

সিডনি শনবার্গ বলেছেন, যখন সাংবাদিকদের আবাসন ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে জিজ্ঞেস করা হয়, বিদেশি সাংবাদিকদের কেন চলে যেতে হবে? তিনি জবাবে বলেন, ‘সেটা আমাদের ব্যাখ্যা করার কথা নয়, এটা আমাদের দেশ।’ তারপর তিনি ঘুরে তাকালেন এবং অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, ‘আমরা চাই আপনারা চলে যান। এখানে থাকাটা আপনাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ব্যাপারটা হবে খুব রক্তাক্ত।’

দ্য টাইমস-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এ এম রোজেনথাল প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তান সরকারের কাছে একটি টেলিগ্রাম পাঠান : ‘ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ এবং আরও ৩০ জন বিদেশি সংবাদদাতাকে বহিষ্কারের অপ্রত্যাশিত ও নজিরবিহীন ঘটনায় আমরা বিস্মিত। এটি আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।’

পিআইএর উড়োজাহাজে সৈন্য আনা হচ্ছে

২৯ মার্চ ১৯৭১ নিউজউইক-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি লিখিত হয় আগের সপ্তাহে।

ইয়াহিয়ার সঙ্গে যখন সমঝোতার আলোচনা চলছে মুজিব ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এলেন এবং বেরোবার সময় ইয়াহিয়াকে বললেন, আপনার সঙ্গে আলাপ করে লাভ নেই। আপনি আলোচনার আসল জায়গায় আসছেন না।

ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার ভেতরের খবর প্রকাশিত না হওয়ায় ভয়ার্ত গুজব ঢাকাকে ছেয়ে ফেলেছে। বিমানযোগে যারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসছেন তারা জানাচ্ছেন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে এখানকার মজুদ সেনাশক্তি আরও জোরদার করতে সৈন্য টানা হচ্ছে। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাদের বেসামরিক পোশাকে আড়াল করেও আনা হচ্ছে। এখানে বোমা ও গোলাগুলির ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে।

উৎফুল্ল জনতাকে শেখ মুজিব বলেছেন, ‘আমার জনগণ ঐক্যবদ্ধ, তাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’

জনতা চিৎকার করে বলছে, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

কিন্তু সমস্ত উচ্ছ্বাস ও উৎফুল্লতা হয়তো অকালপক্ব হয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কায় মুজিবের একজন সহযোগী বিষণœ বদনে বললেন, ‘আমরা একটি আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি। যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’

শুরু হলো গুলিবর্ষণ

দ্য বাল্টিমোর সান-এর প্রতিবেদক জন উডরাফ লিখছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর এই যে হঠাৎ আক্রমণ তা সেখানকার মানুষের জন্য তা আকস্মিক হলেও ব্যাপারটা ইয়াহিয়া খানের পূর্বপরিকল্পিত।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে একজন ক্যাপ্টেন এসে বললেন, ‘আজ রাতের জন্য আমার ওপর আদেশ হয়েছে কেউ যদি রাত ১১টার পর হোটেল থেকে বের হতে চেষ্টা করে তখনই তাকে গুলি করতে হবে। আপনারা (বিদেশি সাংবাদিকরা) ভেতরে চলে যান।’

লবিতে একটি আদেশনামা সেঁটে দেওয়া হয়েছে : ‘দয়া করে বাইরে যাবেন না।’

কয়েক মিনিটের মধ্যে শহরজুড়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ শোনা যেতে থাকল। রাত ১টা নাগাদ ভারী মেশিনগান এবং কামানের গোলাবর্ষণ শুরু হলো। প্রজ¦লিত আগুনের শিখা দেখা যেতে শুরু করল। সেটিই গোলাগুলি অগ্নিসংযোগের প্রথম রাত।

যা ঘটেছে তা যে সতর্কতার সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রতিরক্ষাহীন সাধারণ মানুষের অহিংস অসহযোগ আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্যই করা হয়েছে পূর্ব পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনাক্রম তারই সাক্ষ্য দেয়।

জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন অস্ত্র

৩০ মার্চ ১৯৭১ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পাকিস্তানের জন্য মার্কিন সাহায্যের অসারতা নিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে।

কোনো ধরনের আভাস না দিয়ে কিংবা কোনো ধরনের সশস্ত্র উসকানি ছাড়াই গত শুক্রবার রাতে মেশিনগান ও রিকয়েলস রাইফেল থেকে গুলি চালানো হয়েছে, ট্যাংক থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে মূলত নিরস্ত্র অথবা স্বল্প প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের ওপর। এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে সংখ্যাটি কেবল অনুমানই করা যাচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব নয়।

কারণ পাকিস্তান সরকার সংবাদ প্রকাশের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে এবং সব বিদেশি সংবাদদাতার সংগৃহীত সংবাদের নোট এবং ক্যামেরার ফিল্ম বাজেয়াপ্ত করে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সাম্যবাদবিরোধী শক্তি হিসেবে এত বছর ধরে পাকিস্তানকে যেভাবে অস্ত্রসজ্জিত করেছে এবং উন্নয়ন সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে তা যে কতটা অপ্রাসঙ্গিক, বহিরাগত ব্যক্তিরা এখন যে চোখে পাকিস্তানকে দেখছে, তাতে এটা স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র গ্রহণকারী সরকার নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই সেই অস্ত্র ব্যবহার করছে বলে আজ অভিযোগ উঠেছে। এটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আর সব মিলিয়ে আসল ট্র্যাজেডি তো পাকিস্তানেরই।

সৈন্য পরিবহনের জন্য হেলিকপ্টার ত্রাণ সহায়তার জন্য নয়

দ্য বাল্টিমোর সান-এর জন উডরাফ লিখছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি নির্মূল করে যাচ্ছে।

চার মাসেরও কম সময় আগে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বলেছে গাঙ্গেয় মোহনায় সাইক্লোনে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর পর যে ক’জন বেঁচে আছে তাদের উদ্ধারকাজে পূর্ব বাংলায় সৈন্য ও হেলিকপ্টার পাঠাতে পারবে না। তারা বলেছে, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ট্রুপস ও হেলিকপ্টার সরিয়ে নিলে ভারত আক্রমণ করে বসতে পারে।

সেনাবাহিনীর এই ঘোষণা জারি হতে হতে ভারতই সাইক্লোন দুর্গতদের জন্য ত্রাণ সহায়তার হাত ক্রমেই বাড়াতে থাকে।

আর সেই পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী (সত্তরের) ডিসেম্বরের নির্বাচনের রায় গুলি করে নস্যাৎ করতে হেলিকপ্টারে মজুদ শেষ সৈন্যটিও পাঠাতে প্রস্তুত। পাঞ্জাবি প্রাধান্যের সেনাবাহিনী এতটা বাড়াবাড়ি করবে এটাই স্বাভাবিক।

নির্মম গণহত্যার সাক্ষী

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ ২৫ মার্চের গণহত্যার একজন সাক্ষী। ২৭ মার্চ যে ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিক সেনা পাহারায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে তেজগাঁও এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এনে তাদের নোটবুক ও ফিল্ম কেড়ে রেখে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল সিডনি শনবার্গ তাদের একজন। ২৮ মার্চ ১৯৭১ নিউ ইয়র্ক টাইমস তার যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তার একাংশ :

হোটেলের (ইন্টারকন্টিনেন্টাল) চারপাশে আগুন ও গোলাগুলি বাড়তে থাকে, রাত ১টা নাগাদ পুরো শহরে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মিলিটারি গার্ডের আদেশে রাত ১.২৫ মিনিটে হোটেলের টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। তখনই টেলিগ্রাফ অফিসের টাওয়ারের বাতিও নিভে যায়। ভারী ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসে বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের অন্যান্য অংশ থেকে।... ভোর পৌনে ৫টায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদর দপ্তরের দিকে ভয়াবহ অগ্নিশিখা দেখা গেল। পৌনে ৬টার দিকে আবছা আলোয় চোখে পড়ল চাইনিজ টি-৫১ হালকা ট্যাঙ্কে চড়ে সৈন্যরা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।

২৭ মার্চ ১৯৭১ বিবিসির সংবাদ

তিন দিন আগে সেনা মোতায়েনের একজন চাক্ষুষ সাক্ষী বিবিসি প্রতিনিধি নিজেই : তাকে ঢাকা থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ঢাকা শহরের লোকদের সন্ত্রস্ত করার জন্য সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পিত নিষ্ঠুর একটি অপারেশন চালিয়েছে।

আমাদের সংবাদদাতা আরও বলেছেন, ট্যাঙ্ক ও আর্মার্ড ট্রাকভর্তি সৈন্য খুব কমই প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে, যদিও ছাত্রদের হাতে কিছু অস্ত্র ছিল। চারদিকে গুলির শব্দ এবং ভবনগুলোতে লেলিহান অগ্নিশিখা।

আমাদের প্রতিনিধি ও তার সঙ্গী ফিল্ম ক্রুকে তিনবার ব্যাপকভাবে তল্লাশি করা হয়েছে। দেশের বাইরে প্রেরণের আগেই তাদের সংবাদ ও কাগজপত্র জব্দ করে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সামরিক সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে যাতে সেন্সরবিহীন সংবাদ দেশের বাইরে যেতে না পারে। প্রতিনিধি আরও জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তার হওয়ার সংবাদটি সম্ভবত সত্য।

লেখক : লেখক ও অনুবাদক