বিশেষ দিবসে বিশেষ ডিজাইনের পোশাক এখন আর অভিনব বিষয় নয়। নতুন উদ্ভাবনে কতটা আকর্ষণীয় পোশাক তৈরি করা যায় তা-ই বরং এখন ডিজাইনারদের লক্ষ্য। নতুন প্রজন্মের ইফতেহার মাহমুদের ডিজাইন নিয়ে লিখেছেন ফয়সাল ইসলাম
দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, ত্যাগ এবং নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অর্জন এই বাংলাদেশ। আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু কীভাবে অর্জিত হলো এই স্বাধীনতা? ইতিহাস আমরা কতটাই বা জানি? তরুণ প্রজন্ম এই ইতিহাসকে জানতে কতটা আগ্রহী?
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শুধু ইতিহাসই শেখাবে না বরং জাগ্রত করবে দেশপ্রেম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে পোশাকের নকশা করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনার ইফতেহার মাহমুদ। শুধু পোশাকের ডিজাইন নয় বরং কাটিংয়েও রেখেছেন নতুনত্ব।
নকশায় নতুনত্ব
নতুন নকশা সম্পর্কে ইফতেহার জানান, আমাদের সবাইকেই কোন কোন সাবজেক্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশনের শেষ পর্যায়ে পোর্টফোলিওর অধীনে ফাইনাল ড্রেস কালেকশনের জন্য পোশাক সাবমিট করতে হয়। পরবর্তী সময়ে সেই সাবমিট করা পোশাকগুলো নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন হয়। শুরুতেই গতানুগতিক ডিজাইন না করে ব্যতিক্রমধর্মী কাজ করতে চেয়েছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি দেশ নিয়ে কোনো কাজ করব। তাই বেছে নিই মুক্তিযুদ্ধকে। তি আমি চেষ্টা করেছি আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পোশাকের নকশায় উপস্থাপন করতে।
যেসব পোশাকে নকশা করেছেন
প্রদর্শনীতে ইফতেহারের মোট তিনটি ক্যাটাগরির পোশাকে আটটি ডিজাইনের পোশাক প্রদর্শিত হয়। এর মধ্যে পাঞ্জাবি ছিল দুইটি। কাতুয়া যাকে শার্ট এবং ফতুয়ার মাঝামাঝি একটি পোশাক বলা হয় ছিল একটি । তৃতীয় যে পোশাকটি তিনি ডিজাইন করেন এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নতুন ধরনের একটি পোশাক। পোশাকটি অনেকটা শেরওয়ানির মতো হলেও একে পুরোপুরি শেরওয়ানি বলা যায় না। ওপরের অংশটি শেরওয়ানির মতো। কিন্তু নিচের কাটিংটি ভিন্ন ধরনের একটি বক্র জ্যামিতি তিনি কাজে লাগিয়েছেন। এই ডিজাইনের পোশাক ছিল পাঁচটি।
ডিজাইনটি কীসের আদলে করা হয়েছে সেই প্রসঙ্গে ইফতেহার আরো জানান, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সবসময়ই বলতেন কোনো কিছুর হুবহু নকল না করে তার বদলে বিভিন্ন থিম থেকে উৎসাহ নিয়ে নিজের মতো করতে। এতে নিজস্ব ভাবধারার সৃষ্টি করা যায়। শিক্ষকেরই পরামর্শটি তিনি তার কাটিংয়ের কাজে লাগিয়েছেন। এভাবে কাটিংয়ে উৎসাহ নিয়েছেন অনলাইনে ডব্লিউজিএসএম এবং পিনটারেস্ট থেকে। আর মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলো তিনি সংগ্রহ করেছেন ইন্টারনেট থেকে। সংগ্রহ করে সেগুলোকে এডিট করে তারপর ব্যবহার করেছেন। তবে এই সব পোশাকই শুধু ছেলেদের জন্য করা। মেয়েদের পোশাকেও এমন ডিজাইন করা সম্ভব এবং সামনে এটিও করতে চান তিনি।
প্রিন্ট মিডিয়া
প্রিন্টের ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের সাবলিমেশন পদ্ধতিকে। সাবলিমেশন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশে আসা প্রায় নতুন একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে স্টিকারের মতো প্রথমে একটি প্রিন্ট নিয়ে এরপর সেটিকে জামার সঙ্গে হিট দিয়ে লাগিয়ে দিতে হয়। সাবলিমেশন কম খরচের একটি ভালো প্রিন্ট পদ্ধতি। এর স্থায়িত্বও অন্যান্য মিডিয়ার চেয়ে ভালো বলে জানান তিনি।
অন্য পদ্ধতিতে কেন গেলেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে চেয়েছিলাম হ্যান্ডপেইন্ট করব। কিন্তু পরে দেখলাম হ্যান্ডপেইন্ট করতে গেলে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রথমত এই পেইন্টের খরচ অনেক বেশি। আরেকটি বিষয় হলো, হ্যান্ডপেইন্টের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের এই বিষয়কে ডিজাইনে ফুটিয়ে তোলা বেশ কষ্টসাধ্য। কেননা এখানে প্রয়োজন নিখুঁত ডিজাইনের যা হ্যান্ডপেইন্টের মাধ্যমে করা বেশ কষ্টকর।
এছাড়াও অন্যান্য মিডিয়া যেমন স্ক্রিনপ্রিন্ট এসবের চেয়ে সাবলিমেশন পদ্ধতিকে সবচাইতে উপযুক্ত মনে হয়েছে আমার। ডিজাইনে তিনি ব্যবহার করেছেন ছয় থেকে সাতটি কালার।
ফেব্রিক ও অন্যান্য বিষয়ে
পাঞ্জাবি এবং শেরওয়ানির মতো পোশাকটিতে ইফতেহার ব্যবহার করেছেন কনকর্ড ফেব্রিক। কনকর্ডে সুতির পরিমাণ আছে শতকরা ৬০ ভাগ। আর কাতুয়াতে ব্যবহার করেছেন থার্টি ফাইভ সিক্সটি ফাইভ ফেব্রিক। তবে সাবলিমেশন প্রিন্টের জায়গায় তাকে ব্যবহার করতে হয়েছে মাইক্রো পলেস্টার। এই বিষয়ে ইফতেহার বলেন, সাবলিমেশনের শর্ত হলো এখানে অবশ্যই পলেস্টার ব্যবহার করতে হবে। কেননা সুতি বা অন্যান্য ফেব্রিকে এই প্রিন্টটি ঠিক মতো জোড়া লাগে না। দেখা যায় দু’একবার ধোয়ার পরেই প্রিন্টটি উঠে যেতে শুরু করে। কিন্তু পলেস্টারে এটি অনেকবার ধুলেও সাবলিমেশন প্রিন্ট ঠিক থাকে। আবার সাবলিমেশন প্রিন্টের আরেকটি শর্ত হলো এতে ব্যবহৃত পলেস্টার ফেব্রিকটি হতে হবে সাদা রঙের। বোতামের উপাদান হিসেবে ইফতেহার বেছে নিয়েছেন ধাতব এবং কাঠের বোতাম। বোতামেও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ডিজাইন। ইফতেহার বলেন, বাংলাদেশ অনেক ভালো মানের বোতাম তৈরি করতে পারে। অনেক সূক্ষ্ম ডিজাইনের কাজ করার মতো ভালো মেশিন আমাদের দেশে আছে।
কেমন ক্রেতাদের জন্য করা
ক্রেতাদের বিষয়ে ইফতেহার জানান, যারা ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে সচেতন এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ইভেন্ট যেমন স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসে বাইরে বের হন তাদের কথা মাথায় রেখেই মূলত এই ডিজাইনগুলো করা। এ বিষয়ে আমি মাঠ পর্যায়ের একটি জরিপ পরিচালনা করি। নতুন কোনো কাজ শুরুর আগে এ ধরনের জরিপের কাজ করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা কোনো একটি ডিজাইন বাজারে বের করার আগে হিসাব করতে হয় এই ডিজাইনের আগ্রহী মানুষেরা কেমন ক্রয়সীমার মধ্যে পড়ে। কেননা এটি খুবই স্বাভাবিক যে, কোনো একটি ধরনের ডিজাইনে আগ্রহী ব্যক্তিরা যদি পণ্যটির ক্রয়সীমার মধ্যে না পড়ে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেই পণ্যটি বাজারে টিকবে না। আমি যে ডিজাইনটি তৈরি করেছি এই ডিজাইনের জামা প্রস্তুত করতে যে খরচ পড়বে এবং পরিশেষে এর যে বাজারমূল্য দাঁড়াবে সেটা যদি আগ্রহীদের ক্রয়সীমাকে অতিক্রম করে যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে হবে আমার কাজটি সঠিক হয়নি।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি মোট ৮০ জনের ওপরে একটি জরিপ চালাই। এর মধ্যে ৪০ জন ছিলেন উচ্চ মধ্যবিত্ত আর বাকি ৪০ জন সাধারণ বা নিম্ন মধ্যবিত্ত। উচ্চ মধ্যবিত্তের শতকরা ৭০ জনই আমার এই ডিজাইনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আর নিম্ন মধ্যবিত্তের প্রায় শতকরা ৪০ জন আগ্রহী হয়েছেন।
জামাগুলোর মূল্য কেমন হতে পারে_ এই প্রশ্নে তিনি জানান যেহেতু এখনো বাণিজ্যিকভাবে আমি এগুলো বানানো শুরু করিনি সুতরাং এখন আসলে বলা কঠিন যে জামাগুলোর সঠিক বাজারমূল্য কত হতে পারে_ তবে আনুমানিক একটি ধারণা করে বলা যেতে পারে আমার পাঞ্জাবি এবং শেরওয়ানির মতো জামাগুলোর মূল্য পড়বে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা আর কাতুয়ার দাম পড়বে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকার মতো। এই মূল্য দিয়ে উচ্চ মধ্যবিত্তরাই পোশাকগুলো সহজে কিনতে পারবে। নিম্ন মধ্যবিত্তের ক্রয়সীমার ব্যাপারে ইফতেহার বলেন, জরিপে যেটা আমি দেখেছি তা হলো, দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা মূল্যের পোশাক তাদের জন্য সহজ ক্রয়সীমার মধ্যে পড়ে। আমার পোশাকগুলোও এর মধ্যে আনা সম্ভব তবে এর জন্য যেমন পাঞ্জাবিতে কনকর্ড ফেব্রিকের বদলে টিসি কটন ব্যবহার করতে হবে। আর শেরওয়ানির মতো পোশাকটির ক্ষেত্রে কনকর্ডই ব্যবহার করতে হবে। কেননা এই ধরনের পোশাকে একটু ভারী ফেব্রিকের প্রয়োজন হয়। তবে কনকর্ড ফেব্রিকের অনেক সুলভ মূল্যের কাপড় আছে সেগুলো ব্যবহার করেও এই মূল্যসীমার মধ্যে তা করা সম্ভব হবে।
সাব্লিমেশনের নকশা
যেকোনো নতুন কাজেই কিছু না কিছু বাধা থাকে। ধাপে ধাপে সেই বাধাগুলোকে পার করে এগোতে হয় সামনে। ইফতেহার বলেন, ফ্যাশন ডিজাইনের কাজে সাব্লিমেশনের ব্যবহার অনেকটাই নতুন। বাংলাদেশের অনেকেই এর সঙ্গে পরিচিত নন। তাই এই মিডিয়া ব্যবহার করে কাজ করতে গিয়ে প্রথমে আমাকে একটু ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল। বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র প্রতিষ্ঠান সাব্লিমেশন প্রিন্টের কাজ করছেন। যদিও এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা প্রচুর। সাব্লিমেশনে অল্পসংখ্যক প্রিন্টের কাজ করতে গেলে খরচ পড়ে যাচ্ছে অনেক বেশি। হয়তো অনেক বেশিসংখ্যক অর্ডার করলে খরচটি স্বাভাবিক মাত্রায় আসতে পারে। তবে সাব্লিমেশনের প্রচলন বাড়লেই এ সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সেলাই বা বোতামের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি, বলে জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মুক্তিযুদ্ধকে থিম হিসেবে নিয়ে আরো কাজ করতে আগ্রহী তিনি। পোশাকগুলো নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে আগ্রহী ডিজাইনার ইফতেহার মাহমুদ। আপাতত একটি ফেইসবুক পেজ আর ওয়েবসাইট তৈরির পরিকল্পনা আছে তার। অনলাইনে পণ্যের সাড়া পেলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। তবে প্রথমদিকের প্রোডাকশন বায়ারদের অর্ডারের ওপর নির্ভর করেই তৈরি করতে হবে বলে জানান তিনি।