চিকিৎসকের পক্ষ নেয়ায় শিক্ষক বরখাস্ত: একটি আত্মঘাতী ভুল

গত দু’মাসের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রোগ এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যান শুনতে শুনতে যাদের প্রতি একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা এবং নির্ভরতায় পৃথিবীর মানুষ আনত হয়েছে, তারা হলেন চিকিৎসক। পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে গৃহের নিরাপত্তায় পাঠিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরন্তর লড়াই করে যাচ্ছেন প্রায় অচেনা এক শত্রুর সঙ্গে। এটা সত্যিই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে অস্ত্রের চেয়েও অপরিহার্য হলো, বর্ম। সব দেশ তাদের সাধ্যমতো চিকিৎসকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করে তবে যুদ্ধ শুরু করছে।

করোনাভাইরাস আজ বাংলাদেশকেও স্থবির করে দিয়েছে। সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় আমাদের চিকিৎসকেরা দিশেহারা। তাঁদের উপর বারবার নির্দেশ আসছে, তাঁরা যে কোনো অবস্থায় চিকিৎসা দিতে বাধ্য, নিজেরা নিজ দায়িত্বে যেন সুরক্ষার ব্যবস্থা করে। এর মধ্যে রেইনকোট, কিচেন গ্লাভস দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য বলে দেয়া হয়েছে তাদের।

 মিরপুরে কভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসককে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হতে হয়েছে। সেই রোগী আক্রান্ত হওয়ার আগে তাকে যে চিকিৎসক দেখেছিলেন তিনি কোয়ারেন্টাইনে। বাংলাদেশের একজন নামকরা হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ তিনি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। কক্সবাজারে একজন কভিড রোগী শনাক্ত হওয়ায় চিকিৎসকসহ ২০ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে কোয়ারেন্টাইনে যেতে হয়েছে।

তাহলে স্বাস্থ্যসেবা কে দেবে? শুধু করোনা আক্রান্ত রোগী নয়, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবাও আজ হুমকির মুখে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই)  ছাড়া চিকিৎসা করে একজন চিকিৎসক মৃত্যুঝুঁকিতে পড়বেনই

অধিকন্তু তিনি মানববোমা হিসেবে কাজ করবেন, আর হাজার মানুষের মাঝে ভাইরাস ছড়িয়ে দেবেন।

দুদিন আগে পত্রিকায় সচিত্র সংবাদ হলো, বিভিন্ন জেলার ডেপুটি কমিশনারগণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনারদের মধ্যে পিপিই বিতরণ করছেন। এদিকে চিকিৎসকেরা কাজ করছেন সেই রেইনকোট আর কিচেন গ্লাভস পরেই, অথবা একেবারেই সাধারণ পোশাকে। পিপিই’এর জন্য পুরো বাংলাদেশের চিকিৎসকদের হাহাকার আমরা শুনতে পাচ্ছি।

সচেতন মানুষমাত্রেই ক্ষুব্ধ হয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এমনই দুটি ফেসবুক পোস্টের কারণে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের দুজন শিক্ষককের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে ময়মনসিংহের গফরগাঁও সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাকিয়া ফেরদৌসী এবং বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক শাহাদাত উল্লাহ কায়সারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বুধবার তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।

এই শিক্ষকদের বরখাস্তের আদেশে বলা হয়েছে, ‘দেশব্যাপী করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়, দপ্তর, সংস্থা বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।... সে অবস্থায় আপনি আপনার ফেসবুক আইডি থেকে নিজ নামে অনভিপ্রেত ও উসকানিমূলক বক্তব্য ও ছবি পোস্ট করেছেন, যা সরকারের চলমান সমন্বিত কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

শিক্ষা ক্যাডারের এই কর্মকর্তাদের আচরণকে ‘সরকারি ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থবিরোধী এবং শৃঙ্খলা পরিপন্থী’ আচরণ উল্লেখ করে একে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

পুরো পৃথিবী কভিড-১৯ এর তাণ্ডবে পর্যুদস্ত, সকলেই যুদ্ধ করছে৷ সেই যুদ্ধের অগ্রভাগে রয়েছেন চিকিৎসকসমাজ। তাদের দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ সুরক্ষা এবং সম্মান। আর আমরা চিকিৎসকদের শতভাগ ঝুঁকির মুখে কাজ করতে বাধ্য করে কেমন চিকিৎসা পেতে চাইছি? পাশের দেশ ভারত, যার প্রশাসনিক কাঠামোর মিল রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে, তাদের দিকে তাকালেও আমরা নিজেদের অবস্থা বুঝতে পারব।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য সচিব এক অফিস আদেশে চিকিৎসকদের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সকল ডেপুটি কমিশনার ও কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটদের কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে আমাদের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির মধ্যেও চিকিৎসকদের সেবা প্রদানে বাধ্য করার জন্য সেনা টহল পোস্টে অভিযোগ করতে বলেছিলেন। আশার কথা, বিতর্কের মুখে আদেশটি স্থগিত হয়েছে। আমরা দেখেছি কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ চিকিৎসক ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কোনো জবরদস্তি ব্যবস্থা একটি সেবাখাতের পেশাজীবীর কাছ থেকে সেরা সার্ভিস আদায় করতে পারে না। আমাদের চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের আস্থায় নিয়েই এই কঠিন বিপদের মোকাবিলা করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ প্রশাসনের নেতৃত্বে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করতে চায়। দেশকে ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে চাইলে এই আত্মঘাতী ভুলটি যত দ্রুত সম্ভব সংশোধন করা হবে বলে আমরা আশা করছি।

লেখক: প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ, শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সরকারি কলেজ, ঢাকা