প্রশাসন, পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয় চলছে

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সারা দেশে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি জীবাণুনাশক ছিটানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকাসহ সারা দেশে জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সেনাবাহিনী করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে ও কেনাকাটায় নির্দিষ্ট দূরত্ব নিশ্চিতে বিভিন্ন বাজার পর্যবেক্ষণ করছে তারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে করা হচ্ছে সচেতনতামূলক মাইকিং। বিতরণ করা হয়েছে করোনাভাইরাসে করণীয়বিষয়ক লিফলেট। স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা হিসেবে তারা এসব কাজ করছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর, আমাদের ঢাকা অফিস, চট্টগ্রাম             

ব্যুরো ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।

চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় রাস্তায় গতকাল সকাল থেকেই দেখা যায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল। কেবল কিছু ওষুধ ও মুদি দোকান ছাড়া অন্য সব দোকানপাট বন্ধ ছিল। দুপুরে জুমার নামাজের জন্য কিছু লোক ঘর থেকে বের হলেও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনার কারণে মাত্র দুই রাকাত জুমার জামাত আদায় শেষে দ্রুত বাসায় ফিরে যান তারা। গতকাল সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নৌ ঘাঁটি ঈশা খাঁর আশপাশের রাস্তায় ব্লিচিং পাউডার মেশানো পানি ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করেন নৌবাহিনীর সদস্যরা। এছাড়া স্থানীয় নিম্ন আয়ের মানুষকে খাদ্য সহযোগিতাও দেন নৌসেনারা। এদিকে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি ক্রেতা-বিক্রেতার সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে নগরীর বিভিন্ন বাজারে যৌথ অভিযান চালায় সেনাবাহিনী ও জেলা প্রশাসন। এ সময় প্রতিটি দোকানের সামনে এক মিটার দূরত্বের লাল বৃত্ত এঁকে দেওয়া হয়।

শরীয়তপুরে সমন্বিতভাবে কাজ করছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সেনাবাহিনী। সরকার ঘোষিত সামাজিক ও ব্যক্তিগত দূরত্ব নিশ্চিতের কাজ অনেকটাই গতি পেয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. এস এম আবদুল্লাহ-আল-মুরাদ জানান, জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের পদক্ষেপের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যৌথ জোরদার কার্যক্রমের ফলে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের ফলে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাও অনেক সহজতর হয়েছে।

সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে ও মানুষকে ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে ঝিনাইদহে টহল অব্যাহত রেখেছে সেনাবাহিনী। গতকাল সকাল থেকে তারা শহরের পায়রা চত্বর, আরাপপুর, হামদহ, বাস টার্মিনাল এলাকায় মাইকিং করে জনগণকে ঘরে থাকাসহ করোনা প্রতিরোধে নানা পরামর্শ দেয়। এছাড়া জনসমাগম বন্ধসহ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করতে প্রচার চালায়।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় জনসাধারণের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল দিনভর অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় নিজেদের মধ্যে দূরত্ব মেনে না চলায় একাধিক ব্যক্তিকে শারীরিক সাজা ও অতিরিক্ত মূল্যে রসুন বিক্রির অভিযোগে পাকুল্যা বাজারের ব্যবসায়ী দুলাল সাহাকে ৫ হাজার টাকা অর্থদ- দেওয়া হয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ঢাকার নবাবগঞ্জ প্রশাসনকে সহযোগিতার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে মাঠে কাজ করছে সেনাবাহিনী। গতকাল সকালে উপজেলার সদর থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল জনসাধারণের অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করে। এ সময় তারা অকারণে বাইরে না থেকে বাড়ি ফেরার জন্য এবং মাস্ক পরার জন্য লোকজনকে পরামর্শ দেয়। অকারণে কোনো স্থানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে তাকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করার পরামর্শ দেন সেনা সদস্যরা। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সেনা সদস্যরা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বিভিন্ন মানুষের বাসায় যান এবং তাদের খোঁজখবর নেন। কেউ সরকারি নির্দেশনা না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান সেনা সদস্যরা।

সাভার উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের কার্যক্রম শুরু করেছেন। সেনাবাহিনীর এই কার্যক্রমে সার্বিক তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মাহফুজ। সকাল থেকে শুরু করা টহলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট, বাজার ও বিদেশফেরত প্রবাসীদের বাসা পরিদর্শন করেন। এ সময় বারবার প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হ্যান্ডমাইক দিয়ে বলা হয়Ñ নিজে ভালো থাকুন, অন্যকে ভালো রাখুন। অকারণে কাউকে রাস্তাঘাটে পাওয়া গেলে এবং জনসমাগম তৈরি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপনাদের জন্যই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন একযোগে কাজ করছে। অযথা কেউ বাজার ও রাস্তায় ঘোরাঘুরি করবেন না। সরকার নির্দেশিত নীতিমালা অনুসরণ করুন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ছাড়া অন্য কোনো পণ্যের দোকানপাট খোলা রাখবেন না। জনগণের উদ্দেশে তারা বলেন, আপনাদের আশপাশে কেউ বিদেশফেরত থাকলে আমাদেরকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন। নিজেরা হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলুন, সুস্থ থাকুন, সুস্থ রাখুন।

খুলনার শিববাড়ী মোড় ও খানজাহান আলী সড়কসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাটে কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি ছিটিয়ে পরিষ্কার করেন পুলিশের সদস্যরা। পরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতে টহল দেন সেনা সদস্যরা। দোকানপাট বন্ধ রাখা ও রাস্তাঘাটে মানুষের অবাধে চলাফেরা রোধে ফেনীতে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মাঠে রয়েছে সেনাবাহিনী। রাজশাহীতে প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় চলাফেরা করায় বেশ কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। নগরীর তালাইমারী, সাহেববাজার জিরোপয়েন্টসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে সেনাবাহিনী। নওগাঁর দোকানপাট ও রাস্তাঘাটে জীবাণুনাশক ছিটান সেনা সদস্যরা। এছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় করোনা সম্পর্কে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করেন তারা।

সাতক্ষীরা জেলার প্রতিটি উপজেলায় করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতামূলক অভিযানে প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও ওষুধের দোকানের সামনে সাদা গোল বৃত্তের মধ্য থেকে কেনাকাটা করার জন্য মানুষকে সচেতন করেন।

খাগড়াছড়িতে করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি রোধে ও মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে প্রশাসনের কড়াকড়িতে দোকানপাট বন্ধ ও রাস্তাঘাট ফাঁকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল রয়েছে। তারা মাইকিং করে মানুষকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছে। মাঠে রয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট।

লালমনিরহাটে করোনা প্রতিরোধে পণ্যসামগ্রী কেনাকাটায় ট্রাফিক পুলিশ উদ্যোগ নিয়েছে। রং-তুলি দিয়ে তিন ফুট দূরত্বে গোল বৃত্তাকার ও চারকোনা করে মার্কিং করে দিচ্ছে।

যশোর পৌর এলাকার সব সড়কে জীবাণুনাশক স্প্রে করছে পৌরসভা কর্র্তৃপক্ষ। নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে গত তিন দিন ধরে এ কার্যক্রম চলছে এবং সংকট শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। অব্যাহত রয়েছে সেনা টহল।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসনে সরকারের স্বাস্থ্য বিধিমালা মেনে চলতে সব প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ১৩ উপজেলাসহ দিনাজপুর শহরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১৭টি টিম কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া সেনাবাহিনী, র‌্যাব এবং পুলিশ মাইকিং করে জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। নাটোরে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে জীবাণুনাশক স্প্রে করেছে সেনাবাহিনী।

পঞ্চগড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে মসজিদ, হাসপাতাল ও শহরের বিভিন্ন রাস্তায় জীবাণুনাশক ওষুধ স্প্রে করা হয়েছে। হোম কোয়ারেন্টাইনসহ সরকারি নির্দেশ পালনে জনসচেতনতা রক্ষায় মানিকগঞ্জ শহরসহ সাত উপজেলায় টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ বাহিনী। ভোলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজ নিজ ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো প্রচারণা চালিয়েছে নৌবাহিনীর সদস্যরা। জনসচেতনতা বাড়ানো, সামাজিক দূরত্ব বজায় ও দোকানপাট বন্ধ রাখা নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রাম জেলা শহরের পর এবার উপজেলাগুলোতেও প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর যৌথ টহল শুরু হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের মহাসড়ক ও সড়ক বেশ ফাঁকা রয়েছে। তবে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে এখনো রয়েছে জনসমাগম। চায়ের দোকানগুলোকে দেখা গেছে স্থানীয়দের জটলা ও আড্ডা। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অলিগলিতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে।