করোনাভাইরাসের প্রভাবে বেকায়দায় পড়েছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের উদ্যোক্তারা। সাধারণত স্বাধীনতা দিবস, পয়লা বৈশাখ ও ঈদুল আজহার উৎসবকে এসএমই পণ্য বিক্রির মৌসুম বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু দেশে কভিড-১৯-এর রোগী শনাক্ত হওয়ার পর উৎসবে ভাটা পড়ে। এসএমই মেলায়ও বিক্রি কমে যায়। এই সমস্যা কত দিনে সমাধান হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। ফলে আপাতত বেকার হয়ে পড়েছে এ খাতে কর্মসংস্থান হওয়া ৭৩ লাখ মানুষ। এই বেকারত্ব দীর্ঘকালীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের সহযোগিতা না পেলে ৩০-৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা ঝরে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ জন্য তারা টিকে থাকতে ঋণের সুদ মওকুফসহ নতুন করে স্বল্প মেয়াদি ঋণ চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় নির্ধারণ করতে আগামী ৩০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত্ব এ বৈঠকে বাণিজ্য সচিব ছাড়াও এসএমই ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
শাওন ক্রাফটের স্বত্বাধিকারী ও কারু শৈলী কুটিরশিল্প নারী উন্নয়ন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আনোয়ারা আক্তার শিউলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৩ তারিখ থেকে আমার কারখানার কারিগরদের ছুটি দিয়েছি, উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কর্মচারীর বেতন, শো-রুম ভাড়া ও ব্যক্তিগত খরচ বন্ধ হয়নি। এর বাইরে বড় অঙ্কের ব্যাংক সুদ গুনতে হচ্ছে। যদিও ব্যবসা থেকে এক পয়সা আয় আসছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেওলিয়া হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অক্টোরব থেকে জানুয়ারি আমাদের ব্যবসায় বেচাকেনা মন্দা থাকে। এর মানে ব্যবসার ভড়া মৌসুমে আমরা করোনায় নেতিবাচক প্রভাবে পড়লাম। সরকার সহযোগিতা না করলে কোনোভাবেই টিকে থাকা সম্ভব না।’
একই কথা বলেছেন কাগজের কাপ তৈরির প্রতিষ্ঠান কাজী পেপার কাপ বা কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী কাজী সাজিদুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকে থাকার লড়াইয়ে বেকায়দায় পড়েছে এসএমই উদ্যোক্তারা। কারখানা বন্ধ কিন্তু খরচ থেমে নেই। এ অবস্থায় ব্যাংকঋণের সুদের হার ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কারখানা চালু রাখতে সুদবিহীন ঋণ জরুরি। সেটা স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দিতে হবে। কারণ সরকার এ ধরনের সহযোগিতা না দিলে ৩০-৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা হারিয়ে যাবে। বেকার হবে লাখ লাখ মানুষ।
মিরপুরের হানিফ সিল্কের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দোকান বন্ধ, কিন্তু কোনো খরচ বন্ধ হয়নি। ছোট উদ্যোক্তারা কীভাবে টিকে থাকবে এটা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। আল্লাহর কাছে সহযোগিতা চাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমএমই উদ্যোক্তাদের জন্য অবশ্যই একটা ফান্ড করা উচিত। সেটা অনুদান না হলেও চলবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তারা যেন এ খাতের কারখানা চালু রাখতে পারে, তার জন্য স্বল্পমেয়াদি সহায়তা। কারণ টিকে থাকার ক্ষেত্রে এসএমই উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা অনেক কম।
ওয়ার্ল্ড এসএমই ফোরামের তথ্য অনুসারে, দেশে ৭০ লাখ ৮১ হাজার শিল্পের মধ্যে ৬০ লাখ ৮০ হাজার কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্রশিল্প ১ লাখ ১০ হাজার, ছোট শিল্প ৮ লাখ ৫০ হাজার, মাঝারি শিল্প ৭১ হাজার ও ৫২ হাজার বৃহৎ শিল্প রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পঞ্চম স্থানে থাকা বাংলাদেশ এসএমই শিল্পসংখ্যায় বিশে^ সপ্তম স্থানে রয়েছে। দেশে এসএমই খাতে কর্মসংস্থানের পরিমাণ ৭৩ লাখ।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বৈঠক বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বহুমাত্রিক ক্ষতি সাধিত হবে। এ ক্ষেত্রে এসএমই উদ্যোক্তারা বড় ক্ষতির সম্মুখীন। একদিকে তাদের পুঁজি কম, এতে টিকে থাকার সক্ষমতাও কম। ফলে এ খাতের অনেক উদ্যোক্তার দেওলিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তিনি বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশন কোনো রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু সুপারিশ করতে পারে। ৩০ তারিখের বৈঠকে উদ্যোক্তাদের জন্য গুচ্ছ প্রস্তাব করা হবে।
কী ধরনের প্রস্তাব দেবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা যেন তাদের ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ ৩-৬ মাস মওকুফ পায় সেই প্রস্তাব করব। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে উদ্যোক্তারা যেন স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে অল্প সময়ের জন্য ঋণ পায় তার জন্য তহবিল রাখার প্রস্তাব করা হবে। তবে করোনায় ক্ষয়ক্ষতি কতটুকু হবে, সেটা বলা যাচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আরও কাজ করা হবে।
এর আগে শিল্প সচিব আবদুল হালিম বলেন, বর্তমানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। ২০৪১ সালের মধ্যে তা ২৮ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ওই সময় জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান হবে ৪০ শতাংশ।