সহকর্মীদের আচরণে ক্ষুব্ধ অনেক সরকারি কর্মকর্তা

জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়ার বা ক্ষমতা প্রদর্শনের মহড়া চলছে। এ মহড়ায় বেশিরভাগ কর্মকর্তারই সায় নেই। তারা কিছু কর্মকর্তার আরও ক্ষমতার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ার এবং তা প্রদর্শনের চেষ্টাকে বাতিকগ্রস্ততার সঙ্গে তুলনা করছেন। সমসাময়িক এসব কর্মকর্তা অকপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব কথা বলছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারাও। উভয়ের দৃষ্টিতে কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ জনবিরোধী।

সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব তার ফেইসবুকে বলেছেন, প্রশাসন পরিবারের একজন সদস্য ও শুভানুধ্যায়ী হিসেবে কয়েকজন সহকর্মীর অনভিপ্রেত আচরণের জন্য আমিও সমভাবে ব্যথিত ও বিব্রত বোধ করছি। অভিজ্ঞতা, লব্ধ জ্ঞান, আনন্দ এবং দুঃখ শেয়ার করলে তা বৃদ্ধি পায়। ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক ভাবে আমরা ঈর্ষাকাতর ও বিস্মৃতিপ্রবণ কিন্তু নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জন্য উদগ্রীব এবং প্রদর্শন বাতিকগ্রস্ত। সিভিল সার্ভিস সদস্যদের বিশেষত মাঠ প্রশাসনে দায়িত্বরতদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইতিবাচক মানসিকতার বিকাশ ঘটেছে কি না তা নির্ণয় করা এখন জরুরি। বিচ্ছিন্ন দুএকটি ঘটনার সমালোচনা বা ব্যবস্থা গ্রহণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

ফেইসবুকে তিনি আরে বলেন, মাঠ প্রশাসনের সব পদে বাংলাদেশের সব বিভাগে দাযিত্ব পালনের বিরল অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি অধিকাংশ কর্মকর্তাই ভালো কিছু করতে চান। ভালো ও প্রথাবিরোধী ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সৃজনশীলতা পৃষ্ঠপোষকতা ও ইতিবাচক প্রচারণার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে। কতিপয় কর্মকর্তার মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক আচরণ, আত্মপ্রচারণার উদগ্র বাসনা এবং অল্প সময়ে সবকিছু পাওয়ার এবং ‘পাওয়ার’ প্রদর্শনের প্রবণতা বিদ্যমান। যার বহিঃপ্রকাশ দিন দিন সার্ভিসকে ব্যাধিগ্রস্ত করে তুলছে। এ ব্যাধির নিরাময় এখন সময়ের দাবি।

প্রশাসনের ভেতরের এই আত্মসমালোচনায় মধ্য পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। একজন যুগ্মসচিব তার ফেইসবুকে বলেন, যিনি কাজ করেন তিনি ভুল করতেই পারেন। নবীন কর্মকর্তাদের আত্মশুদ্ধির সম্মানজনক সুযোগ দেওয়া দরকার।

যুগ্ম সচিবের এই স্ট্যাটাস প্রকাশ হওয়ার পর শুরু হয় এর পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা।

একজন সমালোচনা করে বলেন, ‘এত কিছুর পরও তারা থামছে না কেন।’ অপর একজন এই স্ট্যাটাসের সমালোচনা করে বলেন, ‘নবীনদের দোষভার যে তার সুপারভাইজার তার ওপরও পড়ে। তাদের কি আত্মশুদ্ধি জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া উচিত।’

অপর একজন সমালোচনা করে বলেন, ‘এ কোন কর্মকর্তা যিনি বাবার বয়সী তিন বৃদ্ধকে কান ধরে উঠবস করালেন। নিজের মোবাইলে ছবি তুললেন। এসব দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। এটি আমলাতন্ত্রের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তারপরও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে এ ধরনের কর্মকর্তাদের সমুচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত।’ 

সাম্প্রতিক সময়ে সমালোচনা যেন পিছু ছাড়ছে না প্রশাসনের। সাধারণ মানুষ প্রশাসন নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে জামালপুর দিয়ে। নারী অফিস সহায়কের সঙ্গে জামালপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ কবীরের ভিডিওর ঘটনাটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবল আলোচনার খোরাক জুগিয়েছিল। বাধ্য হয়েই জনপ্রশাসন গত বছরের ২৫ আগস্ট তাকে প্রত্যাহার করে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত এই কর্মকর্তা বিভাগীয় মামলা মোকাবিলা করছেন। এই ঘটনাটি প্রশাসনের সিনিয়র ও জুনিয়র উভয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। কর্মকর্তাদের সম্মান লুটিয়ে দেওয়ার অপরাধে তারা তাকে কঠোর শাস্তির মুখে দাঁড় করাতে চেয়েছেন।

প্রশাসন থেকে জামালপুরের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় কুড়িগ্রাম বিতর্ক। সাংবাদিককে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। ১৩ মার্চ রাতের ওই ঘটনায় একসঙ্গে জড়িয়ে পড়েন প্রশাসনের চার কর্মকর্তা।  সাবেক জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন ছাড়াও এই ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (আরডিসি) নাজিম উদ্দীন এবং দুই সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলাম। প্রাথমিক তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা শুরু হওয়ার মুহূর্তেই যশোরের মনিরামপুরের ঘটনা।

জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছু কর্মকর্তা তাদের নিজেদের অনেক কিছু মনে করেন। তাদের সেই মানসিকতা বদলানো দরকার। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর কিছু দিনের প্রশিক্ষণে সেই মানসিকতা বদলানো যাবে না। আমরা জনগণের সেবক। তাদের টাকায় আমাদের বেতন-ভাতা হয়। এসব কর্মকর্তাকে তা বুঝতে হবে। যারা সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করছে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। কঠোর বিভাগীয় শাস্তি তাদের পেতে হবে।