করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জীবাণুনাশক স্প্রে করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এছাড়া দেশব্যাপী সামাজিক দূরত্ব ও কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিতরণ করা হচ্ছে সচেতনতামূলক লিফলেট, এলাকায় এলাকায় করা হচ্ছে মাইকিং। স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তার অংশ হিসেবে তারা এসব কাজ করছেন। আর রাজধানীতে
চলছে শুনশান নীরবতা। আমাদের ঢাকা অফিস, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর), চট্টগ্রাম ব্যুরো ও জেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব তথ্য জানা যায়।
গতকালও রাজধানীর সড়কগুলো ছিল ফাঁকা। সড়কে যনাবাহন ও মানুষের উপস্থিতি না থাকায় চিরচেনা রাজধানীকে এক অচেনা শহর মনে হয়েছে। রাতের ঢাকা হয়ে উঠছে আরও নিস্তব্ধ। চায়ের দোকানে আড্ডা নেই, খোলা নেই হোটেল-রেস্তোরাঁ। জরুরি কাজে যারা বের হয়েছিলেন তারা যত দ্রুত পারছেন বাসায় ফিরছেন। রাজধানীর বাসিন্দাদের বেশিরভাগ আতঙ্কে গ্রামে চলে যাওয়ায় বাসাবাড়িও ছিল ফাঁকা। ঈদের সময়ও এমন পরিস্থিতি হয় না বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। মোবাইল অপারেটরদের তথ্যমতে, এতদিন ঢাকায় ব্যবহার হতো এমন ১ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মোবাইল সিমের লোকেশন এখন রাজধানীর বাইরে। এমন গুমোট পরিবেশে রাজধানীতে যেসব বাসিন্দা আছেন তারা চুরি ও ছিনতাই আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
রাজধানীতে মানুষের বিনা প্রয়োজনে চলাচলে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন। কারণ ছাড়া কেউ বাসা থেকে বের হলে তাকে সেনাবাহিনী বা পুলিশের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। এজন্য কেউ বাসা থেকে বের হয়নি। যাদের একান্ত প্রয়োজনে বের হতে হয়েছে তাদের বাহন ছিল ব্যক্তিগত গাড়ি অথবা রিকশা। গণপরিবহন না থাকয় কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে যাত্রীদের। অন্যদিকে যাত্রীসংকটে বেশিরভাগ রিকশাচালকেরই অলস সময় পার করতে হয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে দুএকটি সিএনজিও দেখা গেছে। এছাড়া সড়কে কেবল প্রশাসন ও জরুরি সেবায় ব্যবহৃত যানবাহন চলতে দেখা গেছে। বন্ধ ছিল বেশিরভাগ পেট্রল পাম্প। রাজাধানীর মুদি ও কাঁচাবাজার খোলার অনুমোদন থাকলেও বেশিরভাগ বিক্রেতা দোকানই খোলেননি। আর ক্রেতাও ছিল সামান্য। প্রায় সবার চোখেমুখে ছিল একই আতঙ্ক।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গতকাল শনিবার বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বর, ইব্রাহিমপুর, কচুক্ষেত, ভাষানটেক ও তৎসংলগ্ন এলাকার প্রধান সড়ক, ফুটপাত, স্থানীয় বাজার, মসজিদসহ আশপাশের পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে জীবাণুনাশক স্প্রে করে। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলামসহ নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর নৌবাহিনীর সদস্যরা রাজধানীর বনানী ও গুলশানের বিভিন্ন এলাকায় জীবাণুনাশক স্প্রে করে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা, মংলা এবং কাপ্তাইয়ে নৌবাহিনীর দায়িত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে দিনব্যাপী জীবাণুনাশক স্প্রে করে তারা। এ সময় তারা জনসমাগম বন্ধসহ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এবং মানুষকে ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে মাইকিং করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রচারণা চালায়। বিভিন্ন স্থানে তারা গরিব, দুস্থ ও অসহায় মানুষদের মাঝে জীবাণুনাশক, সাবান ও মাস্ক এবং চাল, ডাল, আলুসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তারা এই কার্যক্রম চলমান রাখবে।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মুন্সীগঞ্জ শহরের হাটবাজারের দোকানের সামনে ক্রেতা সাধারণের জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চিহ্ন একে দিয়েছেন সেনা সদস্যরা। শহরের পৃথক দুটি পয়েন্টে সচেতনতামূলক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ও গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মাইকিং করে। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের মুন্সীরহাট বাজারের অর্ধ-শতাধিক দোকানের সামনে ক্রেতাসাধারণের জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে চিহ্ন এঁকে দেন তারা। এসব কর্মকা-ের সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাভিদ রেজওয়ানুল সেনা সদস্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, গতকালও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় টহল দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন। তারা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও কোয়ারেন্টাইন বিষয়ে জনগণকে সচেতন করেছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শন করেছে যৌথবাহিনী। সকালে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিভক্ত হয়ে প্রশাসনের কয়েকটি টিম কাঁচাবাজার এবং মুদি দোকানে অভিযান চালায়। এসময় মূল্যতালিকা না থাকায় নগরীর পাহাড়তলী কাঁচাবাজারে একটি চালের দোকানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সতর্ক করা হয় হালিশহরসহ বেশ কিছু এলাকার মুদি দোকানদারকে। পরে কোয়ারেন্টাইনে অবস্থান করা ব্যক্তিদের খোঁজ নেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
এছাড়া সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের পাশাপাশি করোনা সম্পর্কে সচেতন করতে মাইকিং করা হয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে।
খাগড়াছড়ি জেলা শহর ও উপজেলাগুলোতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে সেনা ও পুলিশের টহল চলছে। তারা প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের না হতে মাইকিং করে মানুষকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছে। মাঠে রয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট। তবে শহরে সামাজিক দূরত্ব কিছুটা রক্ষা হলেও গ্রামের হাট-বাজারগুলোতে উপেক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ির মধুপুর, স্বনির্ভর বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন বিকালে বসছে হাট। সেখানে সামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করে জমায়েত হচ্ছে শত শত ক্রেতা-বিক্রেতা। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পুলিশের অভিযানের সময় লোকজন সরে গেলেও তারা চলে যাওয়ার পর আবার জড়ো হচ্ছে। সিভিল সার্জন ডাক্তার নুপুর কান্তি দাশ জানিয়েছেন, খাগড়াছড়িতে বিদেশ ফেরত ২৫৫ জনের মধ্যে ১৪৮ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে আনা সম্ভব হয়েছে। করোনাভাইরাসের লক্ষণ না পাওয়ায় ৮৮ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা অবস্থায় গত বুধবার রাতে মারা যাওয়া ব্যক্তির রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরে পাঠানো হলেও ফল পৌঁছেনি।
বাগেরহাটের মোংলায় নৌবাহিনীর সদস্যরা জীবাণুমুক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় মোংলা বন্দরের শিল্প এলাকার দিগরাজে মহাসড়ক, ড্রেন, দোকানপাট এবং সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনে জীবাণুনাশক স্প্রে করেন তারা। জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি, সামাজিক দূরত্ব ও হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকরণ, একান্ত প্রয়োজনে বাড়ির বাহিরে অবস্থানের ক্ষেত্রে মুখে মাস্ক ব্যবহারের জন্য নির্দেশনা দেন তারা। গতকাল মোংলায় ১৫০টি পরিবারের মাঝে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীও বিতরণ করেছে নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর এসব কার্যক্রম করোনা সংক্রমণ রোধ না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার তানভীর খান।
দিনাজপুর জেলার হাকিমপুরের হিলিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ও জনগণকে এ ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করতে এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে টহল দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। প্রশাসনের নির্দেশে গতকাল পঞ্চম দিনের মতো হিলি বাজারের ওষুধ, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানপাট ছাড়া সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে হিলি স্থলবন্দরের কার্যক্রম। হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রাফিউল আলম বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সেনা সদস্য ও পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন স্থানের জনসাধারণকে সচেতন করতে টহল দিয়ে যাচ্ছি।