৪০ হাজার বিদেশফেরতকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অনেক প্রবাসীর ঠিকানা ঠিক না থাকায় বিপাকে পড়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। দেশের সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর দিয়ে আসার সময় অনেকের পাসপোর্টে দেওয়া ঠিকানাতেই দেখা দিয়েছে নানান গলদ। ওইসব ঠিকানা যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যরা কাউকে পাচ্ছেন, আবার কাউকে পাচ্ছেন না। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ৩৮ হাজার বিদেশফেরত লোককে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রবাসীদের বাসাবাড়িতে পুলিশ গেলে সেখানকার লোকজন জানিয়ে দিচ্ছেন ‘ওমুক নামে কেউ এখানে থাকেন না। বিদেশ থেকেও আসেননি।’ পুলিশের আশঙ্কা, খোঁজ না পাওয়া ওইসব প্রবাসীর কারণে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই যেভাবেই হোক তাদের খুঁজে বের করে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে করোনাভাইরাস ঠেকাতে বাড়ি-ঘরে রাখার নামে মাঠপর্যায়ে

পুলিশের বাড়াবাড়িতে ব্যাপক ক্ষুব্ধ পুলিশ সদর দপ্তর। এমন পরিস্থিতিতে সদর দপ্তর থেকে বিনা কারণে নিরপরাধ কাউকে মারধর করলে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ নির্দেশনা পেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাজ শুরু করেছেন। তাছাড়া পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী গত শুক্রবার রাতে একটি বার্তা পাঠিয়ে বলেছেন, জনসাধারণের সঙ্গে সহনশীল, বিনীত ও পেশাদার আচরণ করতে হবে পুলিশকে। জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সেবায় নিয়োজিত যানবাহনের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন অধস্তনদের। বার্তায় তিনি আরও বলেছেন, ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী খাদ্য, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও মোবাইল ফোন সেবার মতো জরুরি সেবার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও যানবাহনের নির্বিঘœ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। সবার সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর আওতায় করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় না মানলে একজন ব্যক্তি এ আইনে অপরাধী বলে চিহ্নিত হতে পারেন বলে ব্যাখ্যা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আইন অনুযায়ী, কোনো অস্থায়ী বাসস্থান বা আবাসিক হোটেল ও বোর্ডিংয়ে অবস্থানকারীদের কেউ এ সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসককে জানাতে হবে। সরকারের নির্দেশে বিদেশফেরত প্রবাসী নাগরিকরা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন কি নাÑ তা নিশ্চিত করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। কিন্তু বেশিরভাগ প্রবাসীই তাদের পাসপোর্টে উল্লিখিত ঠিকানায় অবস্থান করছেন না। কিছুদিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর সারা দেশে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে বলেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বিদেশফেরত সব প্রবাসীকে তাদের বর্তমান অবস্থানের নিকটস্থ থানায় শিগগিরই যোগাযোগ করে তাদের বর্তমান ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর জানাতে হবে। নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, প্রয়োজনে তাদের পাসপোর্ট রহিত করারও উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে অভিযোগ উঠেছে, থানা পুলিশের সঙ্গে বেশিরভাগ প্রবাসী যোগাযোগ করছেন না। নির্দেশনা অমান্য করে ঘোরাফেরা করেই যাচ্ছেন।

এদিকে গতকাল রবিবার পুলিশ সদর দপ্তরে একটি অনুষ্ঠানে আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, করোনা বিস্তারের প্রথম দিক থেকে পুলিশ প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রবাসীদের খোঁজ-খবর নিয়েছে। যাদের পাসপোর্টে উল্লিখিত ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায়নি, তাদের থানায় যেতে বলেছি। এরপরও অনেকে সরকার ও পুলিশের বিনীত আহ্বানে সাড়া দেননি, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকেননি। আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় জরিমানা নিশ্চিত করেছি। এখনো আমাদের সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১ মার্চ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুই লাখেরও বেশি প্রবাসী ফিরেছেন। বিমানবন্দর বা স্থলবন্দর দিয়ে যারা এসেছেন তাদের পাসপোর্টে ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল। ওই ঠিকানা অনুযায়ী পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৩৮ হাজারের বেশি লোককে (ঠিকানা অনুযায়ী) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কোথায় আছেন তাও কেউ বলতে পারছেন না। এমনকি অনেকের পাসপোর্টের ঠিকানাও ভুল। এ নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। তিনি বলেন, আমরা অনুসন্ধান করে জেনেছি, প্রবাসীদের মধ্যে বেশিরভাগই ইউরোপের। ইতালিসহ অন্যান্য দেশে অনেকেই অবৈধভাবে থেকে আসছিলেন। তারা পাসপোর্টে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করতেন। আবার কেউ কেউ ওই দেশের থাকার কার্ডেও ঠিকানা ভুয়া দিতেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিদেশফেরত ১ হাজার ২৪০ জন প্রবাসী এসেছেন। ৫৯২ জনের ঠিকানা সঠিক পাওয়া গেছে। বাকিদের ঠিকানা এখনো পাওয়া যায়নি। নির্ধারিত ঠিকানায় অবস্থান না করে তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। শেরপুরে পাঁচটি উপজেলায় গত এক মাসে ৫১১ জন প্রবাসী দেশে এসেছেন। তাদের মধ্যে ১০১ জনকে ঠিকানা অনুযায়ী পাওয়া গেছে। বাকিরা কোথায় আছেন কেউ বলতে পারছেন না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যসহ প্রশাসনের লোকজন তাদের খোঁজে কাজ করে যাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মাহবুবর রহমান জানান, বিদেশফেরত অনেকের ঠিকানা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না তা সত্য। পুলিশ প্রবাসীদের সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নিচ্ছে। ঠিকানা অনুযায়ী কেন ওইসব প্রবাসী থাকছেন না তা বুঝতে পারছি না। তারা তো সবাই বাংলাদেশি নাগরিক। আশা করি বিদেশফেরত প্রবাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা করবেন। সিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৮ হাজার প্রবাসীকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের ধারণা তাদের পাসপোর্টে থাকা ঠিকানাগুলো সঠিক ছিল না। আবার কেউ ঠিকানা অনুযায়ী না থেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের নিয়ে আমরা বিপাকে পড়েছি। তাদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

পুলিশের একটি শাখার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সভা থেকে পুলিশ মহাপরিদর্শক দেশে ছড়িয়ে পড়া প্রবাসীদের অবস্থান শনাক্তের জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেন। ইমিগ্রেশন কর্র্তৃপক্ষের সরবরাহ করা প্রবাসীদের তালিকা ধরে তাদের অবস্থান শনাক্তে কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু পাসপোর্টে উল্লেখ করা ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে না অনেক প্রবাসীকে। তাদের খুঁজতে বেগ পেতে হচ্ছে। গত ২১ মার্চ থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে আসা সব যাত্রীর হাতে অমোচনীয় কালিতে পরবর্তী ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার তারিখ সংবলিত সিল মারা হচ্ছিল। আর মার্চের শুরুর দিকে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের শুধু মৌখিকভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই হোম কোয়ারেন্টাইনে না থেকে সামাজিকভাবে ঘোরাফেরা করেছেন। এখানে আমাদের বড় একটি ভুল হয়েছে। তা হলোÑ তাৎক্ষণিক পাসপোর্টের ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া। তারপরও এখন আমরা চেষ্টা করছি তাদের খুঁজে বের করতে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ৯৬ প্রবাসীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঝালকাঠিতে ফেরা ১ হাজার ২৩ জনের মধ্যে ১৪৫ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাকিদের হদিস নেই।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েক দিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের লাঠিচার্জ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে আইজিপি স্যারসহ সবাই বিব্রত। ইতিমধ্যে আইজিপি স্যার বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বিনা উসকানিতে যারা বেশি বেপারোয়া ছিলেন তাদের ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এ সময়ে রাস্তায় বেরোনো ঠিক না। যারা বের হচ্ছেন তাদের বুঝিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। কাউকে মারা যাবে না।