প্রবাসীদের আস্থা জাগাতে না পারার ব্যর্থতা

প্রকৃতির নিয়মই মাতৃমুখিনতা। বিপদে-আপদে তাই মানুষ নিজের অজান্তেই মা বলে ডেকে ওঠে। ঝড়ের কবলে পড়া পাখি যেমন নীড়ে ফেরার আকুতি নিয়ে ওড়ে, তেমনি মানুষও যেকোনো বিপদে ঘরেই ফিরতে চায়। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীর কবলে পড়ে যে প্রবাসীরা আজ মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছে, তাদের ফিরে আসার মূলেও এই মাতৃমুখিনতা। জনসমাগম কমিয়ে সংক্রমণ রোধ করতে দেশে লম্বা ছুটি ঘোষণার পর লাখ লাখ মানুষ যে রাজধানী-শহর-বন্দর ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেল তার নেপথ্যেও ওই মায়ের কাছে ফেরা; নিজ বাড়িতে ফেরা। এদিকে, বিদেশ আর দেশের হাজারে হাজারে, লাখে লাখে ঘরমুখো মানুষের কবন্ধ স্রোত দেখে সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় আমরাও যেন অন্ধ হয়ে গেছি। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাব, যথাযথ পদক্ষেপের অভাব দূর না করে, কেবল তাদেরই দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে দায়ী করছি, তাদেরই দোষারোপ করছি। কিন্তু এতে কারোর মনের খেদ কমলেও ঘরের বিপদ দূর হয়নি। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, দেশে ফেরা প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসীকে নিজ ঠিকানায় খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। অথচ, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে এই প্রবাসীদের যথাযথভাবে ঘরবন্দি রাখাই ছিল সবচেয়ে জরুরি কাজ।

সংগত কারণেই দেশে ফেরা হাজার হাজার প্রবাসীকে খুঁজে না পাওয়ার সংবাদে, তাদের যথাযথভাবে হোম কোয়ারেন্টাইন বা ঘরবন্দি না থাকার সংবাদে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু সম্ভাব্য এই বিপদের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো দেশে ফেরা প্রবাসীদের আস্থা অর্জন করতে না পারা। অথচ, শুরু থেকেই যদি প্রশাসন দেশে ফিরে আসাদের পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত করার পদক্ষেপ নিত তাহলে প্রবাসীদের আস্থা অর্জন করা নিশ্চয়ই কঠিন হতো না। দেশ রূপান্তরের ১৯ মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর, সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন। কিন্তু শুরু থেকে এদের বেশিরভাগকেই এমনকি থার্মাল স্ক্যানারের স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়েও যেতে হয়নি। পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে দেশের প্রবেশপথগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হয়।  আর গত ২১ মার্চ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে আসা সব যাত্রীর হাতে অমোচনীয় কালিতে পরবর্তী ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার তারিখ সংবলিত সিল মারা শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রবাসী যেমন সেটা মানছেন না, তেমনি অনেক ক্ষেত্রেই এসব তদারকি করাও সম্ভব হচ্ছে না। 

সর্বশেষ সংকট গিয়ে দাঁড়িয়েছে দেশে ফেরা প্রবাসীদের এক বড় অংশকেই খুঁজে না পাওয়া। সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘৪০ হাজার বিদেশফেরতকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ মার্চ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুই লাখেরও বেশি প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। কিন্তু পাসপোর্টে উল্লিখিত ঠিকানায় তাদের মধ্যে ৩৮ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কোথায় আছেন তাও কেউ বলতে পারছেন না।  এমনকি অনেকের পাসপোর্টের ঠিকানাও ভুল। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন। পাসপোর্টের ঠিকানায় খোঁজ করলে স্থানীয়রা বলছেন, এই নামে এখানে কেউ নেই, সেখানে বিদেশ থেকেও কেউ ফেরেননি।  অবস্থাদৃষ্টে এটা প্রতীয়মান যে, যেকোনো কারণেই হোক দেশে ফেরা প্রবাসীরা প্রশাসনকে আস্থায় নিতে পারছেন না। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এটা অনুধাবন করা জরুরি যে, এই সংকট যতটা মনস্তাত্ত্বিক ততটাই বাস্তবিক।  কেননা, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান বাস্তবতা থেকেই এই মনস্তত্ত্ব সৃষ্টি হয়েছে।  ভেবে দেখা প্রয়োজন, প্রবাসীদের বাড়ি বাড়ি লালপতাকা টাঙিয়ে দেওয়া, হজক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইন নিয়ে প্রবাসীদের লাঠিপেটা করা, নাকি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও প্রশাসনকে বিশ্বাস না করা, কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্বিচার প্রচারণায় দেশে ফেরা প্রবাসীদের একপ্রকার গণশত্রু  বানিয়ে ফেলাই কি প্রবাসীদের এই অনাস্থার কারণ?

মহামারীর বিস্তার রোধে সংক্রমিতদের চিহ্নিত করতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঘরবন্দি রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি। এজন্য সরকারকে প্রয়োজনে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। কিন্তু বিগত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্নস্থানে প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদস্যরা যেভাবে নির্বিচারে মানুষকে হেনস্তা করছেন, অপমান করছেন সেটা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নইলে প্রশাসনের জন্য প্রবাসীদের মতো দেশবাসীর আস্থায় থাকাটাও কঠিন হয়ে পড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিখোঁজ প্রবাসীদের খুঁজে বের করতে সবার আগে প্রয়োজন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অভয় দিয়ে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে প্রবাসীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।  আজ বিশ্বজনীন এই সংকটে মাতৃভূমিতে ফেরা সে মানুষদের প্রতি দেশের ও দশের সবারই দায়িত্ব আছে।