মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া ইউনিয়নের মনাইরকান্দি গ্রামে সর্দি-কাশি-জ্বর নিয়ে গতকাল সোমবার ভোরে সোহরাব হোসেন (১২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে একই গ্রামের শহীদুল ইসলামের ছেলে। এরপর ওই গ্রামে করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সুনামগঞ্জের পৌর এলাকার পূর্ব নতুনপাড়ায় গতকাল ভোরে শ্বাসকষ্টে এক নারীর (৫৫) মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য ওই নারীর স্বামীকে সিলেটে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। গতকাল জ্বর-সর্দি-কাশি-শ্বাসকষ্ট নিয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আসার পর অটোচালক আশরাফুল ইসলামকে (৪০) মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে ঢাকায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানোর জন্য তার মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া শহরের চৌড়হাস শাহপাড়ায় আশরাফুলের ভাড়া বাসাটি লকডাউন ও যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে প্রশাসনের মাধ্যমে দাফনের জন্য মৃতদেহ গ্রামের বাড়ি ভেড়ামারায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় হোম কোয়ারেন্টাইন শেষের এক দিন পর মালয়েশিয়া ঘুরে আসা এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য গতকাল মারা গেছেন। তিনি উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। এছাড়া গতকাল যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক মেয়েশিশুর (১২) মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়নের তপসি গ্রামে গতকাল ভোরে জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্টে কুমিল্লাফেরত মো. ফরহাদ হোসেন (৪০) মারা গেছেন। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশনায় মৃতের পরিবারের চার সদস্যসহ ওই গ্রামের ৮৪ বাড়ির সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে প্রশাসন। এছাড়া জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় এক নারীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। একই সঙ্গে আশপাশের ১০টি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন।
মুন্সীগঞ্জ : গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তাসলিমা আক্তার বলেন, রবিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সর্দি-কাশি ও জ্বর নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয় সোহরাব। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গতকাল সকালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকায় পাঠান। পরে অ্যাম্বুলেন্সে শিশুটি মারা যায়।
ওই শিশু মৃত্যুর খবরে মনাইরকান্দি গ্রামে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, সোহরাবের বাড়ির পাশে বিদেশফেরত বেশ কয়েকজন হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শিশুকে দাফন করে ফেলায় নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। তার পরিবারের সদস্যদের সতর্কতা অবলম্বন করে চলাচল করতে বলা হয়েছে। তাদের কারও সর্দি-কাশি-জ্বর-শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাস্থ্য বিভাগকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।’
সুনামগঞ্জ : সিভিল সার্জনের কার্যালয় ও স্বজনরা জানান, ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে তার হালকা জ্বর ও কাশি হয়। এজন্য তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করছিলেন। রবিবার রাত ৩টার দিকে তার অবস্থার অবনতি হয়। পরে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সিভিল সার্জন ডা. মো. শামসউদ্দিন বলেন, ‘তার পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের আগে কিছু জানানো হয়নি। তিনি বাড়িতেই মারা গেছেন। আমরা যেটুকু জেনেছি তাতে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না। তাকে দ্রুত দাহ করায় নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। তার স্বামীও অসুস্থ। তার নমুনা সংগ্রহ করা হবে। তাকে সিলেটে পাঠানো হবে।
কুষ্টিয়া : স্বজনদের বরাত দিয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাপস কুমার সরকার বলেন, গত তিন দিন ধরে অটোচালক আশরাফুল শহরের চৌড়হাস এলাকার ভাড়া বাসায় ঠাণ্ডা, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। ভোরে অচেতন হয়ে পড়লে সকালে স্বজনরা তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে পৌঁছার আগেই তার মৃত্যু হয়।
আশরাফুল ইসলাম ভেড়ামারা উপজেলার ক্লিকমোড় এলাকার নুর আলীর ছেলে। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কি না, তা জানার জন্য মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডা. তাপস।
সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সকালে করোনাভাইরাস আক্রান্তের লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া অটোচালকের চৌড়হাস শাহপাড়ার বাসাটি লকডাউন করা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের মাধ্যমে দাফন করানোর জন্য মৃহদেহ তার গ্রামের বাড়ি ভেড়ামারায় পাঠানো হয়েছে।
যশোর : বাঁকড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফার ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তার বাবা ১৪ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে ফেরার পর হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। গত ২৮ মার্চ তার ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনের মেয়াদ শেষ হয় এবং তিনি সুস্থ অবস্থায় চলাফেরা করছিলেন। গতকাল সোমবার সকালে তিনি বুকে ব্যথা অনুভব ও কয়েকবার বমি করেন। পরে পল্লী চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগেও তার দুবার মিনি স্ট্রোক হয়েছিল। তার বয়স ৫৮-৫৯ হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘তার শরীরে করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তিনি ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। তার শরীরে অসুস্থতার কোনো লক্ষণ ছিল না। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।’
এদিকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আরিফ আহমেদ জানান, আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকা এক শিশুকন্যা গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মারা গেছে। সকালে আইইডিসিআরের স্থানীয় প্রতিনিধিদের তার নমুনা সংগ্রহের কথা ছিল। মৃত্যুর পর আইইডিসিআর প্রতিনিধিরা উপসর্গ শুনে বলেছেন সে করোনায় আক্রান্ত ছিল না। তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ১২ বছরের ওই শিশুকে রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার অভিভাবকরা।
যশোর করোনাভাইরাসবিষয়ক চিকিৎসা কমিটির প্রধান গৌতম আচার্য বলেন, তাকে করোনা সন্দেহে ভর্তি নেওয়া হয়েছিল এবং আইইডিসিআরের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল।
বিরামপুর (দিনাজপুর) : দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক জানান, ফরহাদ হোসেন কুমিল্লায় কৃষিশ্রমিকের কাজ করতেন। তিনি যে বাড়িতে কাজ করতেন সেই বাড়ির মালিক সৌদিপ্রবাসী। সম্প্রতি তিনি দেশে ফেরার পর ওই বাড়ির সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেয় স্থানীয় প্রশাসন। ১০-১২ দিন আগে ফরহাদ জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হয়ে কুমিল্লা থেকে পালিয়ে বাড়িতে আসেন। এছাড়া তিনি জন্ডিসেও আক্রান্ত হন। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না গিয়ে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করাতে থাকেন তিনি। গতকাল ভোরে ফরহাদ মারা যান।
চেয়ারম্যান রাজ্জাক আরও জানান, ফরহাদের মৃত্যুর পর ওই গ্রামে আসা-যাওয়া ঠেকাতে গ্রামপুলিশের পাহারা বসানো হয়েছে। উপজেলা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সহায়তায় দুপুরে তার লাশ দাফন করা হয়।
বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. সোলায়মান হোসেন মেহেদী জানান, মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেটি ঢাকার আইইডিসিআরে পাঠানো হবে। তাকে গোসল করানো চার ব্যক্তিকে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এছাড়া ওই গ্রামের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জামালপুর : করোনা সন্দেহে জেলার ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী ইউনিয়নের ঢেংগারগড় গ্রামের এক নারীর নমুনা সংগ্রহ করে রবিবার রাতে আইইডিসিআরে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সিভিল সার্জন ডা. গৌতম রায় জানান, করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় ওই নারীর নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। জেলায় বিদেশফেরত ১১১ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছে এবং ইতিমধ্যে ৫৩০ জনের হোম কোয়ারেন্টাইনের সময় শেষ হয়েছে।
ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ওই নারী সম্প্রতি ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন। পরে জ্বর দেখা দিলে করোনাভাইরাস সন্দেহে তার নমুনা সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য বিভাগ। ওই বাড়ির আশপাশের ১০টি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করে বাসিন্দাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর, জামালপুর প্রতিনিধি ও বিরামপুর সংবাদদাতা)