দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকার ঘোষিত ছুটি আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। রেল, নৌ, সড়ক ও আকাশপথে সারা দেশের যোগাযোগ এখনো বন্ধ। হাসপাতাল, ওষুধ, মুদি দোকান, কাঁচাবাজার এবং জরুরি পরিষেবা ছাড়া সরকারি অফিসের পাশাপাশি বেশিরভাগ বেসরকারি অফিস, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান-বিনোদনকেন্দ্রসহ বেশিরভাগ দোকানপাট ও কলকারখানাও বন্ধ। ফলে সরকারিভাবে পুরোপুরি লকডাউন ঘোষণা করা না হলেও দেশে কার্যত লকডাউন চলছে। সরকারের নির্দেশনায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তাঘাটে নাগরিকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণেও কঠোর হয়েছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। কিন্তু করোনা দুর্যোগ সামাল দিতে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং বিশেষ পরিস্থিতির চাহিদা মোকাবিলার স্বার্থেই বিশেষ ব্যবস্থায় ওষুধ ও খাদ্যশিল্পসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা চালু রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, বড় আকারে কমিউনিটিতে বা সামাজিক পর্যায়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করতে সামনের দিনগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখনই লকডাউন পরিস্থিতি শিথিল করারও সুযোগ নেই। এই অবস্থায় নিয়ন্ত্রিত লকডাউনে বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করে উৎপাদন ও জরুরি সেবা চালুর জন্য বাস্তবিক সমন্বয় জরুরি।
বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়ওষুধশিল্পসহ উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা চালু রাখা যাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, তিনটি বিষয় বিবেচনা করে সরকার এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ওষুধ, খাদ্যসহ জরুরি বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা। তৈরি পোশাকশিল্পের কিছু কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হলেও অনেক কারখানায় এখনো আদেশ রয়ে গেছে। বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো ওইসব পোশাক শিপমেন্ট করার তাগাদা দিচ্ছে। এ অবস্থায় যেসব কারখানার আদেশ রয়েছে, সেগুলোর মালিকরা কারখানা বন্ধ রাখতে রাজি নন। তাদের দিক থেকে কারখানা সচল রাখার বিষয়ে একধরনের চাপও রয়েছে। আবার উৎপাদিত পণ্য দেশে বিক্রি করে এমন শিল্পমালিকদের যুক্তি উৎপাদন ও বিপণন ব্যাহত হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে সরকার চাইছে, সাধারণ ছুটি আরও বাড়ানোর কারণে কারখানার শ্রমিকরা যাতে গ্রামে চলে না যায়। শ্রমিকরা গ্রামে গেলে তাতে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি আরও বাড়বে। এসব সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে কারখানা সচল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছে সরকার।
তবে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মত হলোÑ এখনই লকডাউন শিথিল করা হলে করোনার ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় ধরনের সর্বনাশের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমনিতেই আগামী দুসপ্তাহ দেশে করোনার জন্য ‘ক্রুশিয়াল’ সময়। একদিকে, মৃদু আকারে হলেও কমিউনিটি বা সামাজিক পর্যায়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া, আরেকদিকে করোনা-পরীক্ষার সংখ্যা এখনো আশানুরূপ হারে বাড়াতে না পারায় প্রকৃত চিত্রটা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। আবার করোনায় দ্বিতীয়বারের মতো কেউ আক্রান্ত হতে পারেন কি না, সেটাও এখনো কেউ বলতে পারছেন না। কিন্তু করোনা রোগী ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। করোনা সন্দেহে সরকারের হটলাইনগুলোতেও বাড়ছে প্রতিদিনই কলের সংখ্যা। এমন অবস্থায় অন্তত আগামী দুই সপ্তাহ মানুষকে ঘরের মধ্যে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার করোনা উপদ্রুত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা মাথায় রাখলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এই পরামর্শের তাৎপর্য বোঝা সহজ হবে।
সর্বশেষ ঘোষণা অনুসারে সরকারি ছুটি ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি শেষে সরকারি অফিস খোলার কথা ১২ এপ্রিল। এর দুদিন পর অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল, পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ। সরকার ইতিমধ্যেই নববর্ষ উদযাপনের সব ধরনের কর্মসূচিও বাতিল ঘোষণা করেছে, যা এই পরিস্থিতিতে খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু সরকারি অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সারা দেশ থেকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর দিকে মানুষের ঢল নামবে। আর ইতিমধ্যেই কর্মহীন নি¤œবিত্ত মানুষেরা জীবিকার সন্ধানে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও কাজ খুঁজতে পথে নেমে আসার চেষ্টা করছে। লকডাউন শিথিল করার সঙ্গে সঙ্গেই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমতাবস্থায়, সরকারকে অবশ্যই ঘরবন্দি গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ঘরবন্দি রাখাকালেই বিশেষ ব্যবস্থায় ওষুধ ও খাদ্যশিল্পসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা চালু রাখার উদ্যোগে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ কলকারখানা চালু করতে গিয়ে গণপরিবহন চালু করা যাবে না, কিংবা এসব খাতের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত না করেও কারখানা চালু রাখা যাবে না। এটা করতে কর্মীদের যাতায়াত ও সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থার দায়িত্ব যেমন শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের নিতে হবে তেমনি সরকারকেও কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের পরিবারগুলোকেও সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, উৎপাদন চালু রাখতে গিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে গেলে গোটা দেশের জন্যই তা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।