বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্থবির হয়ে আছে গোটা দেশ। শিল্প কারখানাসহ সব ধরনের উৎপাদনমুখী শ্রম খাত প্রায় বন্ধ। এ অবস্থায় পোশাক কারখানা, চামড়া, নির্মাণ, পরিবহন, পোলট্রি, হোটেল-দোকান শ্রমিক, হকারসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত পাঁচ কোটি শ্রমিকের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদ ও শ্রম খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, করোনাভাইরাসের কারণে দেশীয় অর্থনীতির যে ক্ষতি হবে তার প্রধান শিকার হবেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের এসব মানুষ। সরকার যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে এর মধ্যেও পোশাক খাতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, করোনাভাইরাস দেশ থেকে বিদায় হলে, খাদ্যসংকট দেখা দিয়ে পারে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের ঋণের চাপ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি, নিম্ন মজুরি, উচ্চ বেকারত্ব ও শহরমুখী মানুষের ঢল আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা যে বাড়বে সে বিষয়ে এরই মধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ^ব্যাংক। গত মঙ্গলবার সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার থাবায় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হবে। ‘ইস্ট এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক ইন দ্য টাইমস অব কভিড-১৯’ নামক ওই প্রতিবেদনে বিশ^ব্যাংক আরও বলেছে, করোনাভাইরাস দ্রুত বিদায় নিলেও এসব অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ব্যাপকহারে কমে যাবে। এতে উচ্চ বেকারত্ব সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার প্রভাবে অর্থনীতি আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ৫ কোটির বেশি অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক এরই মধ্যে বেকার হয়ে গেছেন। কারখানাগুলো ব্যয় সংকোচনের জন্য শ্রমিক ছাঁটাই করবে। তখন এর মূল প্রভাব পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষদের ওপর। এ জন্য সরকারকে বড় শিল্পের আগে স্থানীয় ছোট শিল্পগুলো প্রণোদনা দিতে হবে। যাতে উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘœ না ঘটে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে উচ্চঝুঁকি : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬-১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে মোট শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৮ লাখ। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে (শ্রম আইনের সুবিধা পান এমন) কর্মরত জনশক্তি মাত্র ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। আর সবচেয়ে বড় অংশ ৮৫ দশমিক ১ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে শিল্প খাতে নিয়োজিত মোট শ্রমশক্তির ৮৯ দশমিক ৯ শতাংশ আর সেবা খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক হিসেবে নিয়োজিত। এসব শ্রমিকের মোট হিসাব করলে দেখা যায় ৫ কোটি মানুষ দিনমজুরের মতো কাজ করেন। যাদের শ্রম আইন-২০০৬ প্রদত্ত নিয়োগপত্র, কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিভাতা, চিকিৎসাভাতা, বাড়িভাড়াসহ বেশির ভাগ অধিকারই নিশ্চিত নয়। চাকরি দাতার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে তাদের পেশার ভবিষ্যৎ।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার আঘাতে মানুষের ভোগ কমবে। অর্থনীতি সংকুচিত হবে। এ সময় বাঁচার তাগিদে শ্রমিকরা স্থাবর সম্পত্তিও বিক্রি করে দেবেন। তাদের ঋণের চাপ বাড়বে। কারণ এ সময় একদিকে স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে খাদ্যঘাটতি রয়েছে। করোনা বিদায় নিলে খাদ্যঘাটতি আরও গভীর হবে। শহরাঞ্চলের সংকট বড় হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক আরও বাড়বে। এ সময় অনেক খাতের ভর্তুকি কমিয়ে কৃষি, শিক্ষা ও চিকিৎসা এই তিন খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সিনিয়র প্রোগ্রাম কনসালট্যান্ট খোন্দকার আব্দুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই মুহূর্তে কৃষি ছাড়া সব উৎপাদন খাত থমকে গেছে। খুচরা-পাইকারি, গ্রামীণ-শহুরে সব বাজার ব্যবস্থাপনা স্থবির হয়ে আছে। শহর ছেড়ে যেসব মানুষ গ্রামে গেছে তারা করোনা থামলে শহরে ঢুকবে। এ সময় কাজ না পেলে শ্রম খাতে ইমব্যালান্স অবস্থা তৈরি হবে। এখন পর্যন্ত আমরা যেসব খবর পাচ্ছি, তাতে অসংখ্য ছোট পোশাক ও চামড়ার কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ তাদের ওপর বড় অঙ্কের ঋণের চাপ রয়েছে। এর সরল শিকারে পরিণত দরিদ্র শ্রমিক।
উচ্চ বেকারত্বের শঙ্কা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সালের শ্রম জরিপে বলা হয়েছিল, দেশে মোট ২৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বেকার। আর গত বছর প্রকাশিত বিআইডিএসের এক প্রতিবেদন বলছে, দেশে উচ্চ শিক্ষিতের ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশই বেকার বা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। জানা গেছে, শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত মিলে প্রতিবছর দেশে ২২ লাখ মানুষ কর্মবাজারে প্রবেশ করেন। যার মধ্যে কাজ পান ৭ লাখ। করোনাভাইরাসের প্রভাবে চলতি বছর কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, করোনা শিক্ষার ওপর বড় প্রভাব রেখে যাবে। কারণ অনেক দরিদ্র মানুষ এ সময় কাজ হারিয়েছে। যারা সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারবে না। একই সঙ্গে এ বছর উচ্চ শিক্ষিতরাও নতুন কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তায় পড়েছে। একদিকে তারা কাজ পাবে না অন্যদিকে কাজ পেলেও মনমতো কাজ পাবে না। দারিদ্র্য দেখা দিলে সামাজিক বৈষম্য প্রকট হবে। বৈষম্য বাড়লে শ্রমিকের মজুরি কমে যাবে। মজুরি কমলে ভোগ কমবে। এভাবে অর্থনীতিতে এক বড় ধাক্কা যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
শহরমুখী জনতার ঢল বাড়বে
বিশ^ব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, বছরে সাত লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের খোঁজে ঢাকায় আসে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চল এবং পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর চরাঞ্চলগুলোতে মানুষের দারিদ্র্যের হার সর্বাধিক। দারিদ্র্যে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো পরিসংখ্যানে এগিয়ে। এসব অঞ্চল থেকে আসা লাখ লাখ মানুষ ঢাকার বস্তিগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করে। করোনার থাবা দীর্ঘমেয়াদি হলে এসব অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে আসা মানুষের হার আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নগর দারিদ্র্যের শিকার মানুষরা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অপুষ্টির শিকার হতে পারে।
পোশাক কারখানায় ছাঁটাইয়ের অভিযোগ
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে কারখানা বন্ধের সময়ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি অসন্তোষ ঠেকাতে কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের নামে মামলা দিচ্ছেন। করোনা দুর্যোগে শ্রমিক সহায়তা হিসেবে সরকার যে ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে, সেই টাকা ছোট কারখানার শ্রমিকরা পাবেন না বলে আশঙ্কা রয়েছে। একতা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্যোগের মধ্যেও ডেকো, গীতা, মেট্রিক্স, এস এস সুলতানাসহ অনেক কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করছে। তারা জোর করে লে অফ (দুর্যোগকালীন ৪৫ দিনের ছুটি) করছে। তিনি বলেন, আমরা আশঙ্কা করছি সরকারের দেওয়া ৫ হাজার কোটির টাকার ভাগ ছোট কারখানার শ্রমিকরা পাবেন না। বিজিএমইএর কর্মকর্তারা বড় কারখানাগুলোর মধ্যে বাটোয়ারা করে দেবেন। অথচ করোনাভাইরাসের কারণে কমপক্ষে ৫ শতাংশ ছোট কারখানা নিশ্চিত বন্ধ হয়ে যাবে।