সাবেক ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর মৃত্যু

পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসনের পাঁচবারের সংসদ সদস্য (এমপি), সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুর রহমান শরীফ ডিলু (৮০) মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি স্ত্রী, চার ছেলে, পাঁচ মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা শামসুর রহমান ডিলু ১৯৪০ সালের ১০ মার্চ পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের চর শানিকদিয়ার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম লুৎফর রহমান ও মায়ের নাম জোবেদা খাতুন। তার পৈতৃক নিবাস ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের কৈকুণ্ডা গ্রামে। গতকাল বিকেল সোয়া ৪টায় ঈশ্বরদী শহরের আলীবর্দী সড়কে বাড়ির সামনে প্রথম ও বাদ আসর কৈকুণ্ডা গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। স্বজনরা জানিয়েছেন, গত প্রায় সাত মাস ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শামসুর রহমান চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতাল, লন্ডন ও ভারতের মুম্বাই টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন তিনি।

শামসুর রহমান শরীফ ডিলু শৈশবে ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নে প্রাইমারি স্কুল ও পাকুড়িয়া মিলড ইংলিশ স্কুলে পড়াশোনা করে পাবনা জেলা স্কুলে ভর্তি হন। তিনি পাবনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৬২ সালে তিনি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন।

পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শামসুর রহমান শরীফ ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও সর্বশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরপর পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হলে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাকে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি পাবনা জেলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মিছিল থেকে প্রথম গ্রেপ্তার হন। তারপর প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে তিনি ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তারপর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রথমে লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি ও পরে ২০০৫ সালে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু তিনি দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তৎকালীন সরকারের আমলে টানা পাঁচ বছর ও এরশাদ সরকারের আমলেও তাকে কারাগারে থাকতে হয়।

স্বজনরা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা না হওয়ায় শামসুর রহমান শরীফের মরদেহ ঢাকা থেকে গতকাল বেলা ৩টায় ঈশ্বরদীর আলীবর্দী সড়কের বাড়িতে আনা হয়। মরদেহ সেখানে কিছুক্ষণ রাখার পর বিকেল সোয়া ৪টায় বাড়ির সামনের মাঠে প্রথম জানাজা হয়। সেখানে পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ ও পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার প্রদান করে। এরপর পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল, সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নাদিরা ইয়াসমিন জলির নেতৃত্বে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। পরে ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক : বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ শামসুর রহমান শরীফের মৃত্যুতে শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘তার মৃত্যুতে দেশ একজন দক্ষ সংগঠক ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে হারাল। শরীফের মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’ রাষ্ট্রপ্রধান মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেন, ‘১৯৮১ সালে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসার পর থেকে আমি শামসুর রহমান শরীফকে দেখেছি তিনি বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে আওয়ামী লীগের ঝাণ্ডা উড্ডীন রেখেছেন। সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এজন্য তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের অমানুষিক নির্যাতন ও জুলুমের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে, আওয়ামী লীগের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।’ প্রধানমন্ত্রী তার রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এছাড়াও গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, ১৪ দলের মুখপাত্র ও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাবউদ্দিন, রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান প্রমুখ।