সমন্বয়হীন ত্রাণ কার্যক্রম

সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ দেওয়ার কথা বলা হলেও দেশের নানা স্থানে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা তাদের মতো করে ত্রাণ দিচ্ছে। রাজধানীতেও চেনামুখই বারবার ত্রাণ পাচ্ছে। আর এসব ত্রাণ বিতরণের সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সরকারি নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিরা আগে যে তালিকা তৈরি করেছেন সেটা ধরে এ দুর্যোগে ত্রাণ দিলে চলবে না। কারণ এগুলো বেশিরভাগই মুখ চেনা ও দলীয়। এখন মানুষের হাতে কোনো কাজ নেই। যেমন নির্মাণশ্রমিক ও ট্রান্সপোর্ট শ্রমিক, তারা কখনই ত্রাণ নিত না। কিন্তু এখন খুবই দরকার। এজন্য সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের উচিত নতুন তালিকা করে ত্রাণ দেওয়া।

গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রাণের দাবিতে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে প্রায় ২০০ নারী-পুরুষ বিক্ষোভ করেছে। সরকারি ত্রাণবঞ্চিত এসব নারী-পুরুষ জড়ো হতে শুরু করলে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তারা কার্যালয় চত্বরে অবস্থান নেয়। বিক্ষোভকারীরা জানায়, সকাল

১০টার দিকে পৌরসভার উদ্যোগে পৌর কমিউনিটি সেন্টারে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়। সেই সময় সেখানে হাজার হাজার লোকের সমাগম হলে হুড়োহুড়ি অবস্থার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে দুপুরের দিকে ত্রাণ বিতরণ শেষ হলেও সেখানে কয়েকশ নারী-পুরুষ তখনো ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছিল। ত্রাণবঞ্চিত এসব নারী-পুরুষ দুপুর দেড়টার দিকে কালেক্টরেট চত্বরে সমবেত হয়।

যশোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ শফিউল আরিফ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছু লোক ত্রাণের আশায় ডিসি অফিসের সামনে জড়ো হয়েছিল। কোনো ডিসি অফিসেই ত্রাণ থাকে না। কাজেই আমাদেরও নেই। অসহায় মানুষের তালিকা তৈরি ও ত্রাণ বিতরণ করে স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন সংস্থা। আমি ত্রাণপ্রত্যাশীদের সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। পরে তারা সেখান থেকেই ত্রাণ নিয়েছে।

যশোর পৌরসভার সচিব আজমল হোসেন সাংবাদিকদের জানান, যশোর পৌরসভায় পাঁচ হাজার পরিবারকে এ পর্যন্ত ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। যারা বিক্ষোভ করেছে পৌরসভার ত্রাণের তালিকায় তাদের নাম নেই। জেলা প্রশাসক যশোর পৌরসভাকে অবহিত করলে তাদের ডেকে এনে ত্রাণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে যশোর পৌরসভা।

যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আনোয়ারা বলেন, ‘আমি স্বামী পরিত্যক্তা। এক ছেলে আছে সেও প্রতিবন্ধী। প্রতিদিন ভিক্ষা করে সংসার চালাতাম। এখন কেউ ভিক্ষা দিচ্ছে না। আমি ত্রাণও পাচ্ছি না। গরিব লোকে পায় না; পাচ্ছে বড় লোকেরা।’ পালবাড়ি পুলিশ লাইন বস্তি এলাকার বাসিন্দা জাফর শেখ বলেন, ‘তিন দিন ধরে পৌরসভায় আসছি। কিন্তু কোনো ত্রাণ পাইনি। চাল নিতে আসার কারণে তাড়িয়ে দিয়েছে পৌরসভার লোকজন। তাই আমরা ডিসি অফিসে এসেছি। কিন্তু ডিসিও আমাদের কথা শুনলেন না।’

ত্রাণসামগ্রী বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে খুলনাতেও। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের খুলনা প্রতিনিধি জানান, খুলনা জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি খুলনা সিটি করপোরেশনও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ শুরু করে। কিন্তু এ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে মুখ চিনে চিনে। যারা ওই জনপ্রতিনিধির কাছের লোক, তারাই নামের তালিকা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় লোক না হলে তাদের ভাগ্যে সিটি করপোরেশনের ত্রাণ জুটছে না।

এ বিষয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলহাজ সামছুজ্জামান মিয়া স্বপন বলেন, আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত হলো কোনো অসহায় মানুষ না খেয়ে থাকবে না। মুখ চিনে কাউকে ত্রাণসামগ্রী দিতে নিষেধ করা হয়েছে। তারপরও অনেকেই এ ধরনের কাজ করছে বলে আমরা শুনেছি। তাদের সতর্ক করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তরের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হতদরিদ্রদের মধ্যে চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বাঘড়া ইউনিয়নে। গত ২৬ ও ২৭ মার্চ দিনব্যাপী উপজেলার বাঘড়াবাজারে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূরুল ইসলামের মার্কেটে এ চাল বিতরণ করা হয়।

দেশব্যাপী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ঘরে থাকার কারণে দিনমজুরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। হতদরিদ্রদের মধ্যে চাল বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে শ্রীনগরের বাঘড়া ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের মধ্যে চাল বিতরণের জন্য ৫৪০টি কার্ড দেওয়া হয়।

বাঘড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম ঢাকায় অবস্থান করছেন। চেয়ারম্যানের ভাই মুক্তি হোসেন ও ডিলার হোসেন আলীর যোগসাজশে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে না জানিয়ে হতদরিদ্রদের কাছ থেকে কার্ডপ্রতি ৫০ টাকা করে আদায় করছেন। এমনকি প্রতি কার্ড হোল্ডারদের কাছ থেকে ৩০ কেজি চালের মূল্য নিয়ে ২৮ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে হতদরিদ্রদের কার্ড দেওয়ার সরকারি নিয়ম থাকলেও আর্থিক সুবিধা নিয়ে সচ্ছল পরিবারকেও কার্ড দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসাম্মৎ রহিমা আক্তার বলেন, ‘হতদরিদ্রদের চাল বিতরণের কার্ড ও চাল নিয়ে কেউ অনিয়ম করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এদিকে নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ, যারা লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে সংকোচবোধ করেন তাদের অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা তৈরি করে ত্রাণ বিতরণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল তাদের তালিকা তৈরি করে ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ২৯ মার্চ কর্মহীনদের তালিকা করে ত্রাণ বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই তালিকা ধরে রাস্তার ভাসমান মানুষ, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ব্যক্তি, ভিক্ষুক, ভবঘুরে, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানগাড়িচালক, পরিবহন শ্রমিক, রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, ফেরিওয়ালা, চা-শ্রমিক, চায়ের দোকানদার এবং অন্যান্য যারা দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে সংসার চালায় তাদের তালিকা প্রস্তুত করে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন চ্যানেলে এসব ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় ও ঘরে থাকার নিয়ম মানছে না সাধারণ মানুষ। জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় অবাধে চায়ের স্টলে চলছে আড্ডা। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সড়কে ব্যাপক যানবাহন চলাচল করছে। গতকাল সকাল থেকে অভিযানে নেমেছে পুলিশ। এ সময় এক সচেতনতামূলক সভায় পুলিশ কর্মকর্তা মো. মাসুক আলী বলেন, রিকশাচালকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের বাড়িতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হবে। তারা যেন একজন বারবার ত্রাণ না পায়। রিকশাচালকরা মনে করছে রাস্তায় বের হলেই মনে হয় ত্রাণ পাওয়া যাবে। তাই তারা বের হয়ে আসে। এবার তারা বের হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।