সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে করোনা

১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে আজকের এফডিসি। ২০১২ সাল থেকে দিনটিকে স্মরণ করা হয় জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে।

প্রতি বছর জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে নানা উদযাপন থাকলেও এ বছর কোনো উৎসব করা হয়নি। গতকাল সারা দিন ছিল বর্ণহীন একটি দিন। আর এসবের মূলে ছিল করোনা আতঙ্ক। জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে মাসখানেক আগে থেকেই বেশ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল এফডিসি কর্র্তৃপক্ষসহ চলচ্চিত্রের নানা সংগঠন।

উৎসব পালন না করা প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবাই ভয়াবহ একটা সময় পার করছি। করোনার কারণে জনসমাগমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। সে কারণে এবার আমরা কোনো উদযাপন করিনি।’

শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, ‘প্রতি বছর এ দিবসটি আমরা ঘটা করে পালন করলেও এবার করোনাভাইরাসের কারণে দিবসটি পালন করতে পারিনি। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে এটা কোনোভাবে সম্ভবও নয়। আশা করছি আগামী বছর বড় আয়োজন করে দিবসটি পালন করব।’

এদিকে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসের এই দিনে এসে অনেক পরিচালক-প্রযোজকই হিসাব কষছেন সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ।

পরিচালক সমিতির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মানিক বলেন, ‘এমনিতেই মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। করোনা এসে কফিনে শেষ পেরেকটা দিয়ে গেল। করোনার কারণে যে ক্ষতি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে হচ্ছে, সেটা কাটিয়ে ওঠা শিগগিরই সম্ভব হবে না। একটা দীর্ঘ মেয়াদি সমস্যার ভেতরে পড়ে গেল ইন্ডাস্ট্রি। জানি না ভবিষ্যতে কী হবে।’

বাংলাদেশ প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু জানালেন তার আশঙ্কার কথা। খসরু বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে চলচ্চিত্রের এখানে যারা আছেন কয়েকজন শিল্পী এবং পরিচালক ব্যতীত সবার অবস্থা খুবই খারাপ। আর্টিস্টের বাইরে মেকআপম্যান, প্রোডাকশন বয়, সহকারী পরিচালক সবাই শিফটে কাজ করেন। বলা যায় দিনের টাকা দিন নিয়ে যান। এর আগে নানা সময়ে হরতাল হয়েছে, কারফিউ হয়েছে, নানা ধরনের সমস্যা হয়েছে কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েনি চলচ্চিত্রশিল্প। কখনো এত দিনের জন্য শুটিং বন্ধ থাকেনি। এর ফলে অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেকেই সহযোগিতা করছেন। কিন্তু এটাকে আমি ত্রাণ সহায়তা বলব না। আমি বলতে চাই তাদের পাশে আছি আমরা।’

তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যেই আমাদের ক্ষতি শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ, শুটিং বন্ধ, প্রোডাকশন বন্ধ। লকডাউনের কারণে সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু যে লকডাউনের সময় থেকে এই ক্ষতি হচ্ছে তা কিন্তু নয়। চীনে যখন প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে তখন থেকেই প্রেক্ষাগৃহে লোক কমে যায়। জনসমাগম এড়িয়ে চলার নির্দেশ রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের। সে কারণে সচেতন দর্শকরা অনেক আগে থেকেই প্রেক্ষাগৃহ বর্জন করেন। এ কারণে ফেব্রুয়ারি থেকেই প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা শোচনীয় পর্যায়ে নেমে আসে। এর মধ্যে যে কয়টা সিনেমা মুক্তি পেয়েছে সব কয়টা ফ্লপ করেছে। এমনকি শাকিব খানের সিনেমাও ফ্লপ হয়েছে। গত ১৮ মার্চ থেকে আমাদের সব প্রেক্ষাগৃহ তো বন্ধ। ফলে এই ক্ষতির পরিমাণ অনেক। আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবসের মতো উৎসবগুলো মিস করেছি। সামনে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষেও কিছু সিনেমা মুক্তির কথা ছিল। এগুলো এখন আর মুক্তি পাচ্ছে না। সামনের ঈদেও যে খুব একটা ব্যবসা হবে তা-ও কিন্তু বলা যাচ্ছে না। কারণ সবাই অলরেডি আতঙ্কের মধ্যে আছেন। সবাই কিন্তু জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন। ইতিমধ্যেই শতকোটি টাকার ক্ষতি প্রযোজকরা গুনছেন আরও কত ক্ষতি হবে তা হিসাব করা যাচ্ছে না।’

উত্তরণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রযোজক সমিতির এই সভাপতি বলেন, ‘করোনার ধাক্কা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলবে। কারণ আজ এই মুহূর্তেও যদি সরকার ঘোষণা দেয় যে করোনা নেই বা করোনা উধাও হয়ে গেছে, তারপরও প্রেক্ষাগৃহে মানুষ যাবে না। মূলত জনসমাগম এড়িয়ে চলার যে সচেতনতা এত দিন তৈরি হয়েছে, সেই সচেতনতা থেকেই লোকজন প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করবে না। এটা শুধু এখন নয়, সারা বছরই এর প্রভাব ফেলবে। এই মুহূর্তে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছি না। আর কীভাবে এই শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব, সেটাও গবেষণার বিষয়।’