শাহজাদপুরে ১০ হাজার জেলে-মাঝির দুর্দিন

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতুনি, কৈজুরি, গালা, খুকনি ও জালালপুর ইউনিয়নের প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত যমুনা নদীর পানি শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই শুকিয়ে ধু ধু বালুর চরে পরিণত হয়েছে। যেটুকুতে পানি আছে সেখানে অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠায় তাও মরা খালে পরিণত হয়েছে। এ কারণে এখন আর এ নদীতে আগের মতো নৌকা চলে না। মাছও নেই। ফলে এ চার ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার জেলে ও পাঁচ হাজার মাঝি-মাল্লা কর্মহীন হয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। এদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই আছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা এখন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। এর ওপর করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘর থেকে তারা বাইরে কাজে যেতে না পারায় তাদের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে বানতিয়ার গ্রামের জেলে প্রেমা হালদার, গুরু হালদার, কালু শেখ, লুৎফর রহমান, উজ্জ্বল হোসেন, আবদুল কুদ্দুস বলেন, যমুনা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় নদীতে আর আগের মতো মাছ নেই। ফলে আমরা বেকার জীবনযাপন করছি। এর মধ্যে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘর থেকে বাইরে কাজে যেতে না পারায় ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে খুবই বিপদে পড়েছি।

বানতিয়ার গ্রামের নৌকার মাঝি রজব আলী, আমীর হামজা, ময়নাল প্রাং বলেন, আমাদের জমিজমা নেই। যমুনার ভাঙনে শেষ হয়ে গেছে। এখন নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। এ বছর শুষ্ক মৌসুম শুরু না হতেই নদীতে পানি শুকিয়ে ধু ধু বালু চরে পরিণত হয়েছে। ফলে নৌকা চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষজন হেঁটে চলাচল করছে। এর ওপর করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘর থেকে বাইরে কাজে যেতে না। ফলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছি। অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিন চলছে।

ছোট চানতারা বাজারের মুদি দোকানদার সোলায়মান হোসেন বলেন, নদীতে পানি না থাকায় নৌকা চলে না। দোকানের মালপত্র মাথায় নিয়ে দুপুরের রোদে তপ্ত ধু ধু বালুর চর পাড়ি দিতে খুবই কষ্ট হয়। ঘোড়ার গাড়িতে মাল নিতে গেলে বস্তাপ্রতি তিন-চারগুণ বেশি ভাড়া দিতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বেশি হয়। তখন লাভ তো দূরের কথা, উল্টো আরও লোকসান হয়।

সোনাতুনি গ্রামের পল্লীচিকিৎসক জিয়াউল হক বলেন, যমুনায় পানি না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া খুবই কষ্ট হয়। বিশেষ করে ডেলিভারি রোগীর হয় পথেই ডেলিভারি হয়ে যায় নয়তো মারা যায়। পানি থাকলে কম খরচে দ্রুত এসব রোগী হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়। এজন্য দ্রুত এ নদী ড্রেজিং প্রয়োজন। তিনি অবিলম্বে যমুনা নদীর এ অংশে ড্রেজিং দাবি করেন।

সোনাতুনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মরতুজ আলী বলেন, নাব্য সংকট নিরসনে দ্রুত যমুনা নদীর এ অংশে ড্রেজিং প্রয়োজন। এখানে ড্রেজিংকালে জেলে ও মাঝিরা উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে। সেই সঙ্গে নৌপথ সচল হলে মানুষ স্বল্প খরচে মালামাল পরিবহন ও যাতায়াত করতে পারবে।

সোনাতুনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরে যমুনায় ড্রেজিং না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নদী নাব্য হারায়। আর বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণক্ষমতা না থাকায় বাড়িঘর ভেঙে নদীতে বিলীন হয়। ফলে ইউনিয়নের মানুষ প্রতি বছর সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এতে এই এলাকার মানুষের অভাব নিত্যসঙ্গী হয়ে পড়েছে।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. শামসুজ্জোহা বলেন, মেগা প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীরবন্দর সচল করতে অচিরেই আরিচা থেকে চিলমারীবন্দর পর্যন্ত যমুনা নদীর ড্রেজিং কাজ শুরু হবে। এ কাজ শুরু হলে পর্যায়ক্রমে আমাদের এ অংশেও ড্রেজিং হয়ে যাবে। তখন আর এ সমস্যা থাকবে না।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ডেল্টা প্রকল্পের আওতায় একটি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীরবন্দর সচল করতে অচিরেই আরিচা থেকে চিলমারীরবন্দর পর্যন্ত যমুনা নদীর ড্রেজিং কাজ শুরু হবে। এ কাজ শুরু হলে পর্যায়ক্রমে আমাদের এ অংশের শাখা নদীসহ সম্পূর্ণটাই ড্রেজিং হয়ে যাবে। তখন এলাকার নাব্য সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি আবাদী জমি ও বাড়িঘর ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।