অতিমন্দার চোখ রাঙানি ও কৃচ্ছ্রের অঙ্গীকার

না, কোনো লালবাতির নিষেধ ছিল না, তবু ঝড়ের বেগে ধাবমান মানবসভ্যতা অতর্কিতে থেমে গেছে। শিল্প-বাণিজ্য-বিশ্বায়ন, পরিবেশ দূষণের উদ্দাম গতি, সবকিছু থমকে দাঁড়িয়েছে। করোনা-উত্তর পৃথিবীতে মানুষ কবে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে কাজে ফিরবে, স্বাভাবিক জীবন শুরু করবে, তার উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে। আপাতত পুরো পৃথিবী অশ্রুনদী তীরে দাঁড়িয়ে কেবল কফিন সাজাচ্ছে! এদিকে দুনিয়া জুড়ে বিমান চলাচল প্রায় বন্ধ, পর্যটন স্তব্ধ, হোটেল, খাবার দোকান সবকিছুতেই তালা ঝুলছে। এমন চললে মে মাসের শেষের মধ্যে প্রায় সব বিমান সংস্থা দেউলিয়া হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা। পর্যটনশিল্পেও একই কালো মেঘ। শিল্পের যে ক্ষেত্রগুলো কাজ তৈরি করে, তার মধ্যে প্রধানই হলো ভ্রমণ ও পর্যটন পৃথিবীব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের জীবিকার কেন্দ্র। ফলে যে সংখ্যায় মানুষ কাজ হারাতে চলেছে, আগামী এক-দুই মাসে, তার হিসাব আন্দাজ করা যায় না। যে দেশের অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব যত বেশি, সেখানে আঘাতের তীব্রতাও হবে ততটাই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রিসেশন বা অর্থনৈতিক মন্দা নয়, এখন চোখ রাঙাচ্ছে ডিপ্রেশন বা অতিমন্দার আশঙ্কা। দুই পরিস্থিতিতে ফারাক কোথায়? মন্দা যদি খাদ হয়, অতিমন্দা তবে সমুদ্রের অতল। তার শেষ কোথায়, কত দিনে, তা অজানা থাকাই অতিমন্দার ভয়ংকরতম দিক। অতিমন্দার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, কিন্তু জাতীয় আয়ের পরিমাণ অন্তত দশ শতাংশ হ্রাস পেলে তবেই পরিস্থিতিকে অতিমন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিপুল বেকারত্ব, ব্যয়যোগ্য আয় হ্রাস সবই অতিমন্দার অংশ।

আসলে করোনাভাইরাস ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি ভয়াবহ আর্থিক সংকটেরও হাতছানি দিচ্ছে। আর্থিক সংকটের ভিত্তিতে থাকে মূলত দুটি বিষয়, বর্তমান আতঙ্ক এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাজনিত আশঙ্কা। এর ফলে বর্তমানে চাহিদা এবং ভবিষ্যতে জোগান ও কর্মসংস্থান ধাক্কা খায়, মুখ থুবড়ে পড়ে অর্থনীতি। করোনাভাইরাসের প্রকোপের বেলায় তাই-ই ঘটছে। করোনা ক্রমেই পরিণত হচ্ছে ‘কোরো’-না তে। যাতায়াত কোরো-না, বিনিয়োগ কোরো-না, উৎপাদন কোরো-না প্রভৃতি। কোরো-না কারণ আশঙ্কা, আতঙ্ক। আমাদের দেশে ইতিমধ্যে সংকট সৃষ্টি হতে শুরু করেছে।

যেসব দেশে আর্থিক পরিস্থিতি আগে থেকেই টলমল; যে অর্থব্যবস্থার সিংহভাগ জুড়ে আছে অসংগঠিত ক্ষেত্র; যে দেশের নীতিনির্ধারকরা অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত, সেসব দেশের জন্য সামনের দিনগুলো অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। করোনা মোকাবিলায় ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করে সামাজিক দূরত্ব রক্ষাই হোক আর ঘরে থাকাই হোক, এই সিদ্ধান্ত অসংগঠিত ক্ষেত্রে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। প্রভাবটি আরও মারাত্মক হয়ে উঠছে অর্থনৈতিক অসাম্যের কারণে। বাংলাদেশে আর্থিক অসাম্য ক্রমবর্ধমান। ফলে, জনসংখ্যার সিংহভাগের ক্রয়ক্ষমতা অতি সীমিত। করোনার কারণে যদি তাদের আয় আরও কমে বা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে সেই ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে। প্রভাব পড়বে তাদের পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যের ওপরও, ফলে ভবিষ্যতেও আয়-সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। জনসংখ্যার সিংহভাগের চাহিদা যদি তলানিতে ঠেকে, তবে বাজারের ওপর তার প্রভাব ভয়ংকর। করোনাভাইরাস বিদায় নিলেও বাজারের স্বাস্থ্য ফেরানোর আশা কম।

আমরা ভবিষ্যতে কী ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি, সেটা বহুলাংশে নির্ভর করছে করোনার স্থায়িত্ব ও দেশের নীতিনির্ধারকদের কুশলতার ওপর। সরকার এখন পর্যন্ত রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রণোদনার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা ছাড়া তেমন কোনো আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়, আমাদের অর্থব্যবস্থার সিংহভাগ জুড়ে যে অসংগঠিত ক্ষেত্র ও অদক্ষ শ্রমিকরা রয়েছেন, সরকার এখনো তাদের কথা ভেবে উঠতে পারেনি। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। চলমান সাধারণ ছুটির ফলে যারা রুজি-রুটি হারাচ্ছেন, তাদের ভবিষ্যৎ কী, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট চিন্তা নেই। ফলে, করোনাভাইরাসের সুতীব্র বিপদটি বেশ কয়েকটি পথে আমাদের অর্থব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এক, চাহিদার সমস্যা কারণ, জনসংখ্যার সিংহভাগের আয় যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে চাহিদা মার খেতে বাধ্য। দুই, শ্রমের সমস্যা বর্তমান বিপন্নতায় শঙ্কিত হয়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা যদি গ্রাম ছাড়তে ভয় পায়, তবে শিল্পক্ষেত্রে শ্রমের অভাব ঘটবে, ফলে জোগানের সমস্যা হবে। তিন, মূল্যস্ফীতি বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার কমানোর পর, অত্যাবশ্যক সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ঘটতে পারে। এগুলোর কোনোটিই সুসংবাদ নয়।

সরকারকে এখনই সজাগ, সচেতন ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। মনে রাখতে হবে করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রতিরোধ করার দায়িত্বটা সরকারেরই। সরকারের প্রথম করণীয় হলো চাকরি এবং মজুরি/বেতন অক্ষুণœ রাখা বা তার নিশ্চয়তা দেওয়া। সরকারকে দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে কোন কোন ক্ষেত্রের চাকরি নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। এরপর ওই চাকরি ও মজুরি/বেতন যাতে বজায় থাকে, সেইমতো পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই পদক্ষেপ সমস্ত নিবন্ধীকৃত নিয়োগকর্তার ওপর প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অন্যদিকে, নিয়োগকর্তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও ভাবতে হবে সরকারকে। আর এই সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব করছাড় (ট্যাক্স ক্রেডিট), বিলম্বিত সুদ গ্রহণ অথবা প্রত্যক্ষ অনুদান ব্যবস্থার মাধ্যমে।

এরপরের ধাপে ভাবতে হবে অসংগঠিত ক্ষেত্র নিয়ে। লাখ লাখ মানুষের জীবিকার সংস্থান হয় নির্মাণশিল্প, পরিষেবাসহ আরও নানা খাত থেকে। পরিষেবা ক্ষেত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পরিবহন, পর্যটন, রক্ষণাবেক্ষণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হোম ডেলিভারি প্রভৃতি। কম সুদে ঋণদান, ট্যাক্স ক্রেডিট এবং অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে এই শ্রেণির পাশে সরকার দাঁড়াতে পারে।

তারপর ভাবতে হবে কৃষিক্ষেত্রের কথা। সৌভাগ্য এই যে, করোনাভাইরাসে স্থবিরতার প্রভাব কৃষিতে খুব একটা পড়ার কথা নয়। কৃষকরা চাষাবাদ আগের মতোই করতে পারবেন। কেবল তাদের সার, বীজ, তেল, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে সরকারের সব সুবিধা আবর্তিত যেসব কৃষকের জমির মালিকানা আছে, তাদের ঘিরে। এখন বর্গাচাষিদের আর্থিক প্রণোদনা, সহজ ঋণসুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ভাবতে হবে ক্ষেতমজুরদের সুরক্ষার বিষয়টি।

কৃষিক্ষেত্রের বাইরেও রয়েছে অসংখ্য দিনমজুর। শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তাদের প্রত্যেকের নাম নথিভুক্ত করার জন্য দেশের প্রতিটি ব্লকে রেজিস্ট্রার মেনটেইন করা কর্তব্য। এর ভিত্তিতে সবাইকেই মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘বোঝা’ মনে হলেও সরকারকে এটি অবশ্যই স্বেচ্ছায় বহন করতে হবে।

স্বভাবতই এসবের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এ অর্থের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে যদি সরকার নিচের পদক্ষেপ করতে পারে

১. আগামী এক বছরের জন্য রাষ্ট্রীয় সব ধরনের অপব্যয় বন্ধ করতে হবে। আপ্যায়ন, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, পরিবহন ব্যয় কমাতে হবে। মন্ত্রীদের অকারণ ঘোরাফেরা, ফিতা কাটা, বক্তৃতাবাজির অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। মন্ত্রীরা দপ্তর থেকে ভিডিওকলের মাধ্যমে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালন করবেন।

২. সংসদ অধিবেশন কতটা সীমিত করে আনা যায়, সেটা ভাবতে হবে। সংসদ অধিবেশন চালানোর ব্যয়টা সাশ্রয় হোক।

২. আমলাদের সব ধরনের ট্রেনিং, এক্সপোজার, অভিজ্ঞতা বিনিময়, সভা, সেমিনার, কনফারেন্স, হাঁচি-কাশির চিকিৎসা ইত্যাদি কারণে বিদেশ সফর বন্ধ করতে হবে। জরুরি কূটনৈতিক ইস্যু ছাড়া অন্য সব ইস্যুতে আমলাদের বিদেশ ভ্রমণ এক বছরের জন্য বন্ধ করে দিতে হবে।

৩. সেফটি নেটের আওতা যতটা সম্ভব বাড়াতে হবে। প্রকৃত অভাবী ব্যক্তিরা যেন সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি কেউ গরিবের টাকা মেরে খায়, তার জন্য সোজা দশ বছরের জেল বাধ্যতামূলক করে বিশেষ আইন পাস করা হোক।

৪. অপচয়মূলক ব্যয়গুলোকে নির্দয়ভাবে ছেঁটে দিতে হবে এবং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে সব জাঁকজমকপূর্ণ এবং সেসব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের ব্যয়, যেগুলো থেকে কোটি টাকায় নামমাত্র কর্মসংস্থান হয়।

৫. মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড়, বিলম্বিত সুদ গ্রহণ অথবা প্রত্যক্ষ অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. যারা নানা কারসাজি করে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের টাকা নিকট এবং সুদূর অতীতে মেরে দিয়েছেন, বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে সেই টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারকে অন্তত আগামী এক বছরের জন্য কৃচ্ছ্রসাধনের অঙ্গীকার করতে হবে। সরকারকে অপচয়-দুর্নীতিরোধ রোধ করে কৃচ্ছ্রসাধনের শপথ যেমন নিতে হবে, পাশাপাশি দেশবাসীকেও কৃচ্ছ্রসাধনের ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ করতে হবে।

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com