করোনায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে দেখার শিক্ষা

সেই পুরনো গল্প যেন নতুন প্রেক্ষাপটে জীবন্ত হয়ে উঠছে। চৈত্রের রাতে গরিব বাবা আর ছেলে শুয়ে আছে তাদের খড়ে ছাওয়া ঘরে। রাত হয়েছে, কিন্তু ঘুম আসেনি কারও চোখে। একসময় বাবা ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, বাপ, কী দেখছ আর ভাবছ কী? ছেলে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলল, দেখছ, আকাশে কত তারা জ্বলজ্বল করছে, মনে হয় কত ফুল ফুটে আছে। আর ভাবছি, আকাশটা কত বড়! ছেলে পাল্টা প্রশ্ন করল বাবাকে, তুমি কী দেখছ আর কী ভাবছ? বাবা বলল, দেখছি চালের খড় নেই, আর ভাবছি শীত তো কোনোমতে পার করলাম, বর্ষার আগে চাল মেরামত না করলে বৃষ্টি ঠেকানো যাবে না। তখন এই ঘরে থাকব কীভাবে? এই গল্পের শিক্ষা ছিল এই যে, অভিভাবকদের শুধু বর্তমান দেখলে চলে না, ভবিষ্যৎটাও দেখতে হয়। সব মানুষ চোখ দিয়েই দেখে কিন্তু সবার দেখা এক রকম হয় না। কারণ চোখের দেখা বস্তু বা ঘটনাটা সবাই এক ভাবে বিশ্লেষণ করে না। বিশ্লেষণের ভিন্নতা থেকেই মতের ভিন্নতা আসে। ভিন্ন ভিন্ন মতের যাচাই-বাছাই থেকে সত্য বেরিয়ে আসে। করোনা দেখাল আমাদের রাষ্ট্র নামক ঘরের চালে কত ছিদ্র। আর ছিদ্র মেরামতের পদক্ষেপ কী হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। এই করোনা আক্রান্ত বিশ্বে এবং বাংলাদেশেও তাই বিশ্লেষণ চলছে কেন এবং কীভাবে করোনা এলো আর কীভাবেই বা মুক্তি পাবে মানুষ এই মহামারী থেকে।

করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই প্রতিরোধের কথাটা সবাই গুরুত্ব দিয়ে বলে আসছেন। তারা বলেছেন তিনটা ‘টি’-এর কথা। ট্রেস (শনাক্ত করা), টেস্ট (পরীক্ষা করা), ট্রিটমেন্ট ( চিকিৎসা করা) এই তিন পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন তারা। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, টেস্ট, টেস্ট অ্যান্ড টেস্ট। অর্থাৎ পরীক্ষা করতে হবে বারবার। যে কোনো অসতর্কতা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু বাংলাদেশে এই তিন-‘টি’ এর সঙ্গে আরেকটি ‘টি’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তা হলো ‘ট্রাস্ট’ অর্থাৎ আস্থা বা বিশ্বাস। যে শনাক্ত বা পরীক্ষা হচ্ছে তার প্রতি মানুষের আস্থা বা বিশ্বাস দুর্বল। সারা দেশে করোনার শনাক্তের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কোথাও না কোথাও তো আমাদের আস্থা রাখতেই হবে। আমাদের যা সম্পদ আছে তা দিয়েই তো সংকটের মোকাবিলা করতে হবে এটা যেমন সত্যি তেমনি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না সে সম্পর্কে সন্দেহ দূর করাটাও প্রয়োজন।

এখন যেমন অনেক প্রতিষ্ঠান বলছে তারা করোনা টেস্ট করার মতো সক্ষমতা রাখে। এগুলোর বায়ো সেফটি ‘লেভেল-২’ মানের। যেমন, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইয়েরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেক্সাস ডিজিজ, চট্টগ্রাম ভেটেরেনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর), বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্স (সিএআরএস), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাব, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মলিকুলার ল্যাব এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম)-এর ল্যাবেও করোনা পরীক্ষা করা সম্ভব। এ ছাড়াও জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলোকে স্বল্প সময়ে আধুনিকীকরণ করে বায়ো সেফটি ‘লেভেল-২’-তে উন্নীত করা যায়। তখনই তো প্রশ্ন জাগে এই সব প্রতিষ্ঠানকে শুরু থেকেই কাজে লাগানো হয়নি কেন? কেন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরে পরীক্ষার সংখ্যা কিছুটা বাড়তে শুরু করল?

একটা বিষয় সবাই উল্লেখ করছেন যে মানুষ সচেতন হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সংক্রমণের সংখ্যা দেখেও মানুষ সতর্ক হচ্ছেন না কেন, এ প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে অনেককেই। ব্যক্তিগতভাবে যে দূরত্ব রক্ষা করে চলা দরকার তা রক্ষা করছেন না অনেকেই। মানুষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাচ্ছেন, ভিড় করছেন যা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। করোনার ভয়াবহতা দেখেও কি মানুষ তাহলে ভয় পাচ্ছেন না? কিন্তু বিষয়টাকে অন্য ভাবেও ভাবা যায়। মানুষ ভয় পেয়ে আর কোথাও আস্থা রাখতে না পেরে ভরসা পাওয়ার জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন কি না সেটাও ভাবা দরকার। মানুষের পেটে যখন টান পড়ছে তখন করোনার দূরবর্তী বিপদের চাইতে নিকটবর্তী অনাহারের দুশ্চিন্তা তাকে ঘরের বাইরে টেনে আনছে কি না সেটাও ভাবতে হবে। যে মুহূর্তে ডাক্তার নার্সের সঙ্গে প্রচুর ভলান্টিয়ার দরকার ছিল, যে সময় মুষ্টিমেয় কিছু তরুণ-তরুণী প্রাণপাত করে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, সে সময় প্রচুর যুবক নাকি বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগছে না বলে বাইরে আড্ডা দিতে বের হচ্ছে। যারা সমাজ নিয়ে ভাবেন তাদের এই ভয়ে যুক্তি হারানো বা দায়হীন সময় কাটানোর মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। করোনা দেখাল কৃষির প্রয়োজনীয়তা কত বেশি। রোগের ভয় এবং ক্ষুধার যন্ত্রণা দুটোই মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, বিভিন্ন রকম ফল ও সবজি, মাছ ও মাংসের উৎপাদন অব্যাহত রাখাই শুধু নয় তা বাড়ানো এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। কিছুদিন মানে ৩ মাস আগে যখন আমন ধান উঠল চাষির গোলায় তখন ধান বিক্রি করতে গিয়ে সে ন্যায্য দাম পায়নি এমনকি উৎপাদন খরচ তুলতে পারেনি। সরকার বলেছিল, খাদ্য গুদাম উপচে উঠেছে, ধান কিনে রাখার জায়গা নেই। সরকারের গুদামে ১৭ লাখ টন খাদ্য মজুদ আছে। আর এক মাসের মধ্যেই বোরো ধান উঠবে। তাহলে চালের দাম বাড়ছে কেন, বাড়াচ্ছে কারা?

করোনার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দেবে বলে যখন আশঙ্কা করছে সবাই তখন বাংলাদেশের শঙ্কা তো আরও বেশি। দেশের অর্থনীতির প্রধান চারটি খাত ঝুঁকিতে পড়েছে। কৃষি দুর্বল, ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের অবস্থা কাহিল, আর আয়ের প্রধান দুই খাত গার্মেন্টস রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয় দুটোই কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাজ হারানো বেকার মানুষের কাজের এবং খাদ্যের সংস্থান করতে কৃষির ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। দেশের অন্যতম প্রধান খাত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল ও বাণিজ্যিক দশা করোনার ধাক্কায় উন্মোচিত হয়ে গেল। দেশে বিলাসবহুল পাঁচ তারকা মানের হোটেলের মতো হাসপাতাল তৈরি হয়েছে অনেক। সাধারণ মানুষদের সেখানে যাওয়ার উপায় ছিল না। কিন্তু যে অসাধারণ মানুষেরা সেখানে যেতেন, সেখানকার চিকিৎসাও যে কত দুর্বল মানের তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংক্রামক ব্যাধি সামলানোর দায় তো তাদের নেই-ই, এবার দেখা গেল সক্ষমতাও নেই। ১৬ কোটি মানুষের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ২৫,,৭৩২ কোটি টাকা, কৃষিতে বরাদ্দ ছিল ১৪,০৫৩ কোটি টাকা। সামরিক খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২,১০১ কোটি টাকা। টাকা বরাদ্দের পরিমাণ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শাসকদের কাছে কোন খাত বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার সময় এ বিষয়টি যেন গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয়।

করোনা চোখ খুলে দিয়ে বলল, চোখ বুজে যা ভাবা হয় তাতে কল্পনা মেশানো আনন্দ হয়তো থাকে কিন্তু বাস্তবতা থাকে না। দেশটাকে লসঅ্যাঞ্জেলেস বা সিঙ্গাপুর ভাবতে পরামর্শ দিয়েছিল যারা তারা অনেক বড় মাপের মানুষ। কিন্তু সাধারণ মানুষ চোখ খুলে দেখে আরে! এতো আমাদের সেই চেনা দেশ। যা দেখতে গেলে লালমনিরহাটের দরিদ্র চাষি বা সিরাজগঞ্জের তাঁত শ্রমিকদের দুর্দশার দৃশ্য চোখে পড়ে। উন্নয়নের এত ডামাডোলের পর ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা দুর্বল, শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার কথা উঠলে গার্মেন্টস মালিকদের এত শান শওকত এক মাসেই হাওয়া, শ্রমজীবী মানুষ ১৫ দিন কাজ করতে না পারলেই তার চুলায় হাঁড়ি চড়ে না, অসুস্থ হলে চিকিৎসার সুযোগ মেলে না। দেখার এই চোখ খুলে রাখার জরুরি শিক্ষা যেন ভুলে না যাই আমরা। চোখ খুলে যাচ্ছে আরও অনেক ক্ষেত্রে। নোয়াম চমস্কির মতে, করোনার এই আঘাত চাইলেই সামাল দেওয়া যেত। থামানো যেত মৃত্যুর মিছিল। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ও বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে করা জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির ইভেন্ট ২০১ নামে গবেষণার সূত্র ধরে চমস্কি বলেন, এই মহামারীর সম্ভাব্য আবির্ভাবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের স্বার্থ জড়িত ছিল। চমস্কি অভিযোগের সুরে প্রশ্ন তুলে বলেন,‘বিশ্বজুড়ে ল্যাবগুলো করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কাজ করছে। আগে কেন এটা করেনি? মার্কেট ভুল ইঙ্গিত দিয়েছিল। বিশেষ করে ওষুধ কোম্পানিগুলো। আমরা আমাদের ভাগ্যকে স্বৈরশাসকের মতো করপোরেশন নামক প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর হাতে দিয়ে রেখেছি। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের কাছে দায়বদ্ধ নয়। তাদের জন্য ওষুধ তৈরির চেয়ে প্রসাধনী বানানো বেশি লাভজনক।’

আমাদের দেশের অবস্থা এর থেকে ভিন্ন নয়। অসহায় মানুষ তাকিয়ে দেখছে মুনাফার কাছে মানুষ কত তুচ্ছ! এই করোনাকালে মানুষ যেন দেখতে শেখে সমাজ ও রাষ্ট্রকে, চিন্তা করতে শেখে কেমন সমাজ ও পৃথিবী আমরা চাই।লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail.com