করোনাভাইরাস মোকাবিলায় গত তিন মাস ধরে দিনরাত কাজ করে শরীর ও মন ক্লান্ত হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। গতকাল রবিবার করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত অনলাইনে ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা গত তিন মাস ধরে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি। শরীর ও মন ক্লান্ত হয়ে গেছে। আমাদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।’
গত ৯ জানুয়ারি চীনের উহানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে প্রথম মৃত্যু হয়। তখন থেকেই বাংলাদেশে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে নানা ঘাটতি নিয়ে তাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা চাই জীবনকে তুচ্ছ করে জাতির পাশে দাঁড়াব, ক্লান্তি অনুভব করব না। কিন্তু এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘকাল হয়, তাহলে কীভাবে এটা চালিয়ে যাব, কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করব, সে বিষয়ে নিজেদের প্রস্তুত করছি। তাই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। তাহলেই দেশকে এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে পারব।’
স্বাস্থ্য ডিজি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি পরীক্ষার সংখ্যার বাড়িয়ে দিতে। সারা পৃথিবীতে যেসব পরীক্ষা হচ্ছে, সেগুলো বাংলাদেশে দ্রুততম সময়ে করা যায় কি না, সে বিষয়েও অধিদপ্তর কাজ করছে। পরীক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি পরীক্ষার বিকল্প পদ্ধতি প্রবর্তন করা যায় কি না সে বিষয়েও কাজ করছে অধিদপ্তর। তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, তাদের কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। তারা আমাদের অনলাইন ড্যাশবোর্ডে ঠিকভাবে তথ্য দিতে পারছেন না। এই সমস্যা নিরসনে তাদের আবার প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এছাড়া তাদের নির্দেশনা দিয়েছি, যাতে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়।
এই মুহূর্তে প্রত্যেককে নিজের এবং অন্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে যিনি নিজেকে সুস্থ মনে করছেন, তার ভেতরে ভাইরাসটি রয়েছে কি না আমরা জানি না। কাজেই প্রত্যেককে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। নিজের মধ্যে ভাইরাস থেকে থাকলে তা দ্বারা অন্যকে যেন সংক্রমিত না করি। ভাইরাসটি যাতে না ছড়াই। আমাদের সেই সচেতনতা সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
গার্মেন্ট কর্মীদের দলবেঁধে ঢাকায় ফেরার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘ট্রাকে গাদাগাদি করে মানুষ আনা হলো। তাদের কতজনের মুখে মাস্ক ছিল, সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কাজেই যারা এই মানুষগুলোকে ট্রাকে তুলে আনলেন, তাদের দায়িত্ব ছিল এই এ বিষয়গুলো খেয়াল করা। প্রতিটি ঘটনাই আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে হবে। তিনি বলেন, আবার এই মানুষগুলো কাজ না পেলে কী খাবে, কীভাবে চলবে, এই বিষয়গুলোও ভাবতে হবে। তাই যেকোনো বিষয় আগে থেকে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে তা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে কি নাÑ এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক এখনো বলছেন এই ভাইরাসটি আমাদের কাছে নতুন। ভাইরাসটির বিষয়ে প্রতিদিন আমরা নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছি এবং বুঝতে পারছি কী কী করা দরকার। তিন মাস আগে আরও কী কী করা দরকার ছিল। এক সপ্তাহ পর হয়তো আরও নতুন জ্ঞান হবে। তিনি বলেন, সামাজিক দূরত্বের বিষয়ে যদি আমরা সঠিকভাবে কাজ করতে না পারি। সারা দেশের মানুষ যদি এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আমাদের প্রস্তুতি দিয়ে আমরা তা মোকাবিলা করতে পারব না। তবে আমরা যে প্রস্তুতি নিয়েছি এবং নিচ্ছি, সেটা সব জায়গা থেকে ঠিকভাবে পালন হলে অবশ্যই আমরা এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারব।
প্রস্তুতি নিয়ে আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, চাইলেই রাতারাতি সবকিছু করা যায় না। প্রত্যেকটা দেশের জন্যই এটা নতুন অভিজ্ঞতা। রাতারাতি যদি করা যেতে, তাহলে উন্নত দেশগুলো, যাদের কাছ থেকে চিকিৎসা যন্ত্রগুলো সংগ্রহ করতাম, তাদের এতটা হিমশিম খেতে হতো না। বাস্তবতা মনে রেখে আমাদের সকলের জায়গা থেকে যা যা করা দরকার তা যেন করি। আরেক প্রশ্নের জবাবে ডা. আজাদ জানান, দেশে মোট ৫টি ক্লাস্টার রয়েছে। যেই স্থানগুলোতে গুচ্ছভাবে আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। সেই ৫টি স্থানের মধ্যে দুটি হলো রাজধানীর বাসাবো ও টোলারবাগ। অন্য তিনটি হলো নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাইবান্ধা। ব্রিফিংয়ের শুরুতে তিনি জানান, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। মজুদ আছে ৫৮ হাজার ১৬৩টি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন মোট ৮৪ জন। ২৪ ঘণ্টায় কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে ১ হাজার ১২০ জনকে। বর্তমানে ১২ হাজার ৬৫৯ জন কোয়ারেন্টাইনে আছেন। ২৪ ঘণ্টায় স্থল, নৌ ও আকাশপথে দেশে প্রবেশ করেছেন মোট ২১৯ জন। তাদের প্রত্যেককেই স্ক্রিনিং করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় স্বাস্থ্য বাতায়ন-১৬২৬৩, ৩৩৩ ও আইইডিসিআরের হটলাইনে কল এসেছে মোট ৯৭ হাজার ৯৪৮টি।