করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী শ্রমঘণ্টা নষ্ট করছে, বন্ধ করে দিচ্ছে শ্রমিকের আয়-রোজগারের পথ। বিশ্বজুড়ে মহামারী হয়ে দেখা দেওয়া এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বের মোট জনশক্তির শ্রমঘণ্টার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ অপচয় হচ্ছে, যা ১৯ কোটি ৫০ লাখ ফুলটাইম বা পূর্ণ সময় কাজ করা শ্রমিকের কর্মঘণ্টার সমান। গতকাল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে।
সংস্থাটি বলেছে, করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি বেকার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। আরব দেশগুলোর মোট শ্রমঘণ্টার ৮ দশমিক ১ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় ৫০ লাখ ফুলটাইম শ্রমিকের কর্মঘণ্টার সমান। অর্থাৎ, আরব বিশ্বে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক বেকার হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বড় উৎস। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত শ্রমিকরাও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাদের অনেককে দেশগুলোর তরফ থেকে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা চলছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো। ইউরোপের শ্রমিকদের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বা ১ কোটি ২০ লাখ ফুলটাইম শ্রমিক বেকার হচ্ছেন। আর এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর মোট শ্রমঘণ্টার ৭ দশমিক ২ শতাংশ বা ১২ কোটি ৫০ লাখ ফুলটাইম শ্রমিক বেকার হচ্ছেন।
করোনাভাইরাসে শ্রমিকরা বেকার হওয়ায় বিভিন্ন দেশ বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। এর মধ্যে উচ্চ-মধ্যম দেশগুলোর আয়ের পরিমাণ কমেছে ৭ শতাংশ। এটি ১০ কোটি ফুলটাইম শ্রমিকের আয়ের সমান। এটি ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বিশ্বজুড়ে দেখা দেওয়া অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষতির চেয়েও বেশি।
করোনাভাইরাসে খাতওয়ারি ক্ষতির বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে হোটেল ও খাদ্যসেবা, শিল্প ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।
বিপুল শ্রমিক বেকার হওয়া সত্ত্বেও ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে বেকারত্বের চিত্র কেমন হবে তা এখনই বলছে না আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা। তারা বলছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলাকালীন সময় ও তার পরে বিভিন্ন দেশ কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন ভাবনা নির্ধারণ করে, তার ওপর বেকারত্বের চিত্র নির্ভর করবে। আইএলও মার্চে আড়াই কোটি শ্রমিকের বেকার হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছিল। গতকাল সংস্থাটি বলেছে, বছর শেষে প্রকৃত সংখ্যা এটি ছাড়িয়ে যাবে।
আইএলও বলছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনেরও বেশি শ্রমিক করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শতকরা হিসেবে বিশ্বের মোট শ্রমশক্তির ৮১ শতাংশই করোনার কবলে কাবু হয়ে পড়েছে। পূর্ণ বা আংশিক বন্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে ৩৩০ কোটি শ্রমিক আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমিক-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে জানিয়ে আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেন, আমাদেরকে একত্রিত হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে দ্রুত এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে। শুধু দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াই টিকে থাকা ও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান শ্রম পরিস্থিতিকে ভয়ংকরতম উল্লেখ করে আইএলও বলেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে এত বড় সংকট আর দেখা যায়নি।
আইএলওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা এমন কিছু শিল্প ও খাত চিহ্নিত করেছে, ওইসব খাত ও শিল্প বন্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও মজুরি কমিয়েছে। এতে ১২৫ কোটি শ্রমিক মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই কম দক্ষ ও অল্প মজুরির কাজ করত। হঠাৎ করে কাজ হারিয়ে চরম সংকটে তারা।
আঞ্চলিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ১২৫ কোটি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকের মধ্যে ৪৩ শতাংশই উত্তর আমেরিকায়, ২৬ শতাংশ আফ্রিকায়। এর মধ্যে আফ্রিকার দেশগুলোতে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল, জনসংখ্যার অধিক ঘনত্ব ও সরকারগুলোর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নেই। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাদের বড় অংশই উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে।
আইএলও বলেছে, বৃহৎ পরিসরে সমন্বিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে চারটি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা, আয় ও কর্মসংস্থানে সহায়তা করা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রণোদনা দেওয়া এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সরকারগুলো শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে।
রাইডার বলেন, গত ৭৫ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি মুহূর্ত। যদি একটি দেশ ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা সবাই ব্যর্থ হব। আমাদের অবশ্যই এমন একটি উপায় বের করতে হবে যাতে বিশ্ব সমাজ, বিশেষ করে যারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অক্ষম তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্তই বিশ্বকে এই সংকট থেকে বের করাসহ শতকোটি মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে। সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই আমরা করোনার প্রভাব কমাতে পারি।