আইজিপি হচ্ছেন বেনজীর মামুন র‌্যাবপ্রধান

পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) ড. বেনজীর আহমেদ। বর্তমান আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি। বর্তমান আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত করা হচ্ছে। এছাড়া পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে র‌্যাব ডিজি হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে দু-এক দিনের মধ্যেই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হবে। বেনজীর আহমেদ হবেন দেশের ৩০তম আইজিপি। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, চলতি মাসের ১৩ তারিখে

বর্তমান আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী অবসরে যাবেন। তার পদে কে আসছেন তা নিয়ে পুলিশের মধ্যে আলোচনা চলে আসছিল। আইজিপি হিসেবে যাদের নাম আলোচনায় আসছিল তাদের মধ্যে ছিলেন সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল নজিবুর রহমান, র‌্যাব ডিজি বেনজীর আহমেদ ও অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মইনুর রহমান চৌধুরী। এই তিনজনের মধ্যে নজিবুর রহমান ও বেনজীর আহমেদের বাড়ি গোপালগঞ্জ। মইনুর রহমান চৌধুরীর বাড়ি সাতক্ষীরা। আলোচনায় বেনজীর আহমেদই এগিয়ে ছিলেন। মেধাবী, সৎ ও চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি বাহিনীর সবার কাছে পরিচিত। সেই কারণে সরকারপ্রধানসহ সবার গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন বেনজীর আহমেদ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বেনজীর আহমেদ আইজিপি হিসেবে নিয়োগ পেলে র‌্যাব ডিজির পদ খালি হবে। সেখানে কাকে নিয়োগ দেওয়া যায় তা নিয়েও সরকারের শীর্ষ মহলে আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের নাম উঠে আসে। পুলিশ মহলে চৌধুরী মামুন অত্যন্ত সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবেই পরিচিত। এই কারণে তাকে র‌্যাব ডিজি হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। তবে সিআইডি প্রধান কাকে করা হবে সে সিদ্ধান্ত গতকাল এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনায় আছেন পুলিশ স্টাফ কোয়ার্টারের রেক্টর শেখ মারুফ হাসান ও অতিরিক্ত আইজিপি ইকবাল বাহার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর চাকরির মেয়াদ শেষ না হলে এখন আইজিপি পরিবর্তন না হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ তিনি আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। বিশেষ করে পুলিশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখান এবং সফলতাও লাভ করেন তিনি। দুটি কনস্টেবল ও সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির তেমন কোনো অভিযোগ ওঠেনি। আর এসব কারণে সর্বমহলে প্রশংসিত হন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তাকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, মঙ্গলবার আইজিপি হিসেবে বেনজীর আহমেদ ও র‌্যাব ডিজি হিসেবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের নাম চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তিনি বলেন, বর্তমান আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া না হলেও তার ভালো কাজের উপহার হিসেবে তাকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত করা হচ্ছে। ওই দেশের বর্তমান রাষ্ট্রদূত রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। আইজিপির পদটিতে এখনো কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আর এই  কারণে তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে সরকারপ্রধান তাকে সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন।

২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাবেদ পাটোয়ারী। আগে থেকেই সৎ, মেধাবী ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। আইজিপি হওয়ার পর পুলিশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তার সাহসী নেতৃত্বে পুলিশের দুর্নীতি অনেকটাই কমে এসেছে। পুলিশের বদলি-নিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন তিনি। বিশেষ করে ঘুষ ছাড়া পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করেন, যেটি সব মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আইজিপিকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদও জানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে পেশাগত দক্ষতা, মেধার গুরুত্ব দেন জাবেদ পাটোয়ারী। অপরাধ করলে যথাযথ শাস্তির মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা নিশ্চিতে কাজ করেছেন তিনি।

আইজিপি হওয়ার আগে জাবেদ পাটোয়ারী পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান ছিলেন। পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮৪ সালে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেন চাঁদপুরের ছেলে জাবেদ পাটোয়ারী।

বেনজীর আহমেদ ১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর গোপালগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র বেনজীর ১৯৮৮ সালে সপ্তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। র‌্যাব ডিজির দায়িত্ব পালনের আগে প্রায় সাড়ে চার বছর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন তিনি। ওই সময় হেফাজত ইসলামের তা-ব শক্তভাবে দমন করেন বেনজীর আহমেদ। পরে তাকে র‌্যাব ডিজি করা হয়। গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন তিনি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বিভাগে চিফ অব মিশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট সার্ভিসেস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন বেনজীর আহমেদ। কর্মদক্ষতার জন্য তিনবার জাতিসংঘ শান্তি পদক অর্জন করেন তিনি। এছাড়া পুলিশের পেশাগত সর্বোচ্চ পদক বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) অর্জন করেন।