সারা দেশে জ্বর-শ্বাসকষ্টে ৬ জনের মৃত্যু

খুলনার রূপসা উপজেলার নৈহাটী ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামে জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে সালেহা বেগম নামে ষাটোর্ধ্ব এক নারী মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মৃত্যুর পর ওই নারী ও তার নাতির নমুনা পরীক্ষার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের চৌডালা ইউনিয়নে গত সোমবার রাতে জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর ওই ইউনিয়ন লকডাউন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী। এছাড়া কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, করিমগঞ্জ ও পাকুন্দিয়ায় জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত তিন ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে গতকাল ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মো. মুজিবুর রহমান। তাছাড়া নেত্রকোনার পূর্বধলায় সোমবার রাতে জ্বর-সর্দি নিয়ে রমজান আলী (৩৮) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর সাত বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।

অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে জ্বর-সর্দি নিয়ে গতকাল সকালে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তিনটি বাড়ি লকডাউনে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এছাড়া জামালপুরের মেলান্দহে জ্বর-মাথাব্যথায় গতকাল বিকেলে মৃত নারীর নমুনা সংগ্রহ করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

খুলনা : রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আনিসুর রহমান জানান, জ্বর-সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত ওই নারী এক সপ্তাহ আগে তার নাতি রাসেলকে (২২) নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন। তিনি তথ্য গোপন করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। গতকাল সকাল ৬টার দিকে তিনি বাড়িতে মারা যান। তার নাতিকে খুমেক হাসপাতালের আইসোলেশনে পাঠানো হয়েছে।

রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাসরিন আকতার বলেন, ওই নারী একই গ্রামের ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী। তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকা করে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হবে।

সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ জানান, ওই নারী ও তার নাতির নমুনা খুমেকের পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। যতক্ষণ রিপোর্ট পাওয়া না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসনকে ওই এলাকা লকডাউনে রাখতে বলা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী জানিয়েছেন, গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা পূর্ব-সাহেব গ্রামে সোমবার রাতে মারা যাওয়া ওই ব্যক্তি একই দিন মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে বাড়িতে ফিরেছিলেন। সেখানে তিনি ধানকাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বাড়িতে ফেরার পর তিনি আলাদা একটি ঘরে কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। ৪৬ বছর বয়স্ক ওই ব্যক্তির তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট ছিল।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহিদুর রহমান জানান, ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর চৌডালা ইউনিয়ন লকডাউন করা হয়েছে। ওই ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগও সীমিত করা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ : সিভিল সার্জন ডা. মো. মুজিবুর রহমান জানান, বাজিতপুর ও করিমগঞ্জে মৃত দুজনের নমুনা সংগ্রহ করে গতকাল সকালে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। শ্বাসকষ্ট, কাশি ও জ্বর নিয়ে মারা যাওয়া ওই দুজন হলেন বাজিতপুরের দিলালপুর ইউনিয়নের তাতালচর গ্রামের সবুর মিয়ার ছেলে আমরু মিয়া (৫০) ও করিমগঞ্জের মুসলিমপাড়া গ্রামের মৃত আবদুর রাশিদের ছেলে সেলিম মিয়া (৫০)।

উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, পেশায় রিকশাচলক আমরু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন। সোমবার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পর আইসোলেশনে রাখা হয়। গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে মৃত্যুর পর তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেলিম মিয়া ঢাকায় মুদির দোকানি ছিলেন। তিনি কয়েক দিন আগে সর্দি-কাশি-জ্বর নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসেন। কিন্তু অসুস্থতার কথা গোপন করে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় তার চিকিৎসা করান। রবিবার গভীর রাতে তিনি মারা যান। এলাকাবাসীর কাছে খবর পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তার নমুনা সংগ্রহ করেন। দুই পরিবারের সদস্যদেরই হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

এদিকে পাকুন্দিয়ার ইউএনও নাহিদ হাসান জানান, গতকাল দুপুরে আড়াইটার দিকে উপজেলার বুরুদিয়া ইউনিয়নের নামাপুটিয়া গ্রামের আবদুস হাসিবের ছেলে মো. সুমন আকন্দ (৩০) মারা যান। একটি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত ওই তরুণের মৃত্যুর পর নামাপুটিয়া গ্রাম লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, সুমন কয়েক দিন ধরে জ্বর-সর্দি ও কাশিতে ভুগছিলেন। তিনি ৬ দিন আগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়। কিন্তু তা না মেনে সকালে সুমন কটিয়াদী উপজেলায় যান এবং সেখান থেকে ফেরার পথে মারা যান। তার মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

নেত্রকোনা : পুলিশ ও এলাকাবাসী জানিয়েছে, পূর্বধলা উপজেলায় সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে রমজান আলী (৩৮) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। তিনি গোহালাকান্দা ইউনিয়নের কিসমত বারেঙ্গা গ্রামের মৃত আবদুল আজিজের ছেলে।  গত ৩-৪ দিন ধরে তার সর্দি-কাশি ছিল। তবে জ্বর তেমন ছিল না। গত রবিবার তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সোমবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করলে দুপুরে ওই তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আনেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওই ব্যক্তি মারা যান। খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাড়িসহ সাত বাড়ি লকডাউন করে রেখেছে।

পুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুনসী জানান, নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টের পর বলা যাবে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কি না।

লক্ষ্মীপুর :  জ্বর ও সর্দি নিয়ে রামগতি উপজেলার চরসীতা এলাকার বাড়িতে গতকাল সকাল ১১টার দিকে মারা গেছেন ৫৫ বছরের মোহাম্মদ রফিক মেস্তুরি। উপজেলার আবাসিক মেডিকেল অফিসার পরিজাত দও জানান, গত দুদিন আগে থেকে তিনি অসুস্থ ছিলেন। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী তার লাশ দাফন করা হবে। এছাড়া ৩টি বাড়িকে লকডাউনে রাখা হয়েছে।

জামালপুর : মেলান্দহ উপজেলার চরবানিপাকুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহাদাৎ হোসেন ভুট্টু জানান, ৩/৪ দিন আগে আদিপৈত এলাকার ৪০ বছর বয়সী এক নারী ভাবকী ব্যাপারি পাড়ায় তার আত্মীয়র বাড়ি বেড়াতে আসেন। এরপর তার মাথাব্যথা-জ্বর দেখা দেয়। গতকাল বমি শুরুর পর বিকেলে মেলান্দহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামিম আল ইয়ামীন জানান, ওই নারীর করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত ছিলেন কি না তা জানার জন্য নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।  (প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা; চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, লক্ষ্মীপুর ও জামালপুর প্রতিনিধি)