আইজিপি হলেন বেনজীর র‌্যাবের ডিজি চৌধুরী মামুন

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হলেন র‌্যাবের মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি বর্তমান আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর স্থলাভিষিক্ত হবেন। র‌্যাবের ডিজি হয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে এ সংμান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে তাদের নতুন দায়িত্ব পালন করার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বেনজীর আহমেদ সপ্তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেন। দক্ষ, পেশাদার, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক পুলিশ অফিসার বেনজীর তার বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনে র‌্যাবের মহাপরিচালক, ডিএমপির কমিশনার, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে ডিআইজি (প্রশাসন ও অপারেশন্স) ও ডিআইজি (ফিন্যান্স অ্যান্ড বাজেট) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি পুলিশ সুপার হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। বেনজীর ২০১০-২০১৫ মেয়াদে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ডিএমপিতে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার শুরু করেন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ডিজিটালাইজেশন প্রμিয়া সূচনা ও সম্পনড়ব করেন। এর মধ্যে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সিস্টেম, পে-রোল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার সিস্টেম, রেশন স্টোর সফটওয়্যার সিস্টেম, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার, সাসপেক্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ডিএমপির অবকাঠামো উনড়বয়নে এক নতুন যুগের সূত্রপাত হয় তার সময়ে। মিরপুর পিওএম- এর সামগ্রিক আধুনিকায়ন, ডিএমপি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, রাজারবাগ প্রশাসনিক ভবন সম্প্রসারণ, আধুনিক মিডিয়া সেন্টার স্থাপন, মোবাইল কমান্ড সেন্টার, মোবাইল ওয়াচ টাওয়ার, ডগ স্কোয়াড ও ৮টি নতুন থানা স্থাপনে বিশাল ভূমিকা রয়েছে তার। তিনিই প্রম সরকারি কোনো অফিসে মিডিয়া সেন্টার স্থাপনের নজির স্থাপন করেন।

জনগণের সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টি আরও সহজতর ও গতিশীল করার লক্ষ্যে বেনজীর আহমেদ থানার সংখ্যা, জনবল ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের তদারকি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কর্মকালের প্রায় সূচনালগেড়বই তিনি ডিএমপিতে ৪টি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ৫টি যুগ্ম কমিশনার, ৭টি ডিসির পদসহ ৮টি থানার জনবলের পদ সৃজন করেন। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতবিরোধী আন্দোলন সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন এবং ঢাকা শহর তথা দেশকে এক মারাত্মক বিপর্যয় থেকে মুক্ত করেন। ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের রাজনৈতিক অগিড়বসন্ত্রাস ও বোমা সন্ত্রাস অত্যন্ত সাহসিকতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দমন করেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাস ঢাকা মহানগরীর বিভিনড়ব স্থানে রাজনৈতিক বহুসংখ্যক ভয়াবহ অগিড়বসন্ত্রাস, বোমা সন্ত্রাস ও পুলিশকে টার্গেট করে আμমণ অত্যন্ত দক্ষতা, সাহসিকতা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের মাধ্যমে দমন করেন তিনি। নগরবাসীর জন্য ফরমালিনমুক্ত খাদ্যদ্রব্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান শুরু করেন। এ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ব্যবস্থা করেন বেনজীর আহমেদ।

নতুন আইজিপি পুলিশের ইমেজ বৃদ্ধির জন্য নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। গৃহীত উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য ছিল নাগরিকদের অধিকতর সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জনগণকে আরও পুলিশি কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে তিনি বিট পুলিশিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। এছাড়া জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে চালু করেন ডিএমপির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, অফিশিয়াল ফেইসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল। ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করেন, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু বছরের আইন-শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। নারায়ণগঞ্জে ৭ হত্যা মামলাসহ কতিপয় ঘটনার ক্ষেত্রে যখন র‌্যাবের ভূমিকা ও ভাবমূর্তি প্রশড়ববিদ্ধ এবং সদস্যদের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম তখন তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। বেনজীর আহমেদ সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা করার পাশাপাশি জনসম্মুখে র‌্যাবের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০১৬ সালে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা মোকাবিলায় তিনি অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রাখেন। তিনিই প্রম মিডিয়াতে কৌশলী ও সাহসী বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মিডিয়া তাদের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে, যা পরবর্তী সময়ে অপারেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বেনজীর আহমেদ বিভিনড়ব পরীক্ষার প্রশড়বপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনতে কার্যকর ও যুগোপযোগী ভূমিকা রাখেন। প্রশড়বপত্র ফাঁসের ঘটনা এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তার নেতৃত্বে মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের অর্জন অনেক। মাদকবিরোধী অভিযানে দেশের বিভিনড়ব স্থানে অনেক বড় বড় মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে, আবার অনেকে অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশে-বিদেশে সাড়া জাগানো ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে একক নেতৃত্ব দেয় র‌্যাব, যার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। বিভিনড়ব ক্ষেত্রে র‌্যাবের ‘টেকনোলজিক্যাল ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’-এ তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। ঢাকার কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের আধুনিক মিডিয়া সেন্টার তার হাত ধরেই হয়েছে। বেনজীর আহমেদ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই উপমহাদেশের মধ্যে প্রম যিনি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ডিপার্টমেন্ট অব পিস কিপিং অপারেশন্সের অধীনে মিশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট সেকশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি কসোভো মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের কন্টিনজেন্ট কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।

বেনজীর আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে সড়বাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এলএলবি ও এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও তার জ্ঞানস্পৃহা প্রবল। তিনি একজন নিয়মিত পাঠক ও সমসাময়িক বিশ্বে ঘটে যাওয়া বিভিণ্ণ তথ্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত থাকেন। লেখাপড়ার প্রতি তার ঐকান্তিক আকর্ষণের কারণেই তিনি সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টি থেকে ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমিতে পেশাগত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে তিনি রেক্টর’স মেডেল প্রাপ্তির কৃতিত্ব অর্জন করেন। এছাড়া চাকরিজীবনে তিনি বিভিণ্ণ সময়ে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রেকর্ড সংখ্যক সর্বোচ্চ ছয়বার বাংলাদেশ পুলিশ পদকে (বিপিএম) ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তিনবার সভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিন কন্যাসন্তানের জনক তিনি।

সংশোধনী: দেশ রূপান্তরে গতকালের প্রতিবেদনে সিআইডি প্রধান কাকে করা হবে সে আলোচনায় আছেন পুলিশ স্টাফ কোয়ার্টারের রেক্টর শেখ মারুফ হাসান ও অতিরিক্ত আইজিপি ইকবাল বাহার লেখা হয়। শেখ মারুফ হাসান পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর। সম্পাদনা ত্রুটির জন্য আমরা দুঃখিত।