দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই সংক্রমণঝুঁকি নিয়ে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। এ ক্ষেত্রে ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের তুলনায় অঙ্গীভূত আনসার সদস্য ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে। অঙ্গীভূত আনসারদের কেউ কেউ সংক্রমণ রোধে বাহিনীটির পক্ষ থেকে অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম তো দূরে থাক, মাস্ক পর্যন্ত পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। ফুটপাতের দোকান থেকে কেনা নিমড়বমানের মাস্ক পরেই তাদের নিয়মিত ডিউটি করতে হচ্ছে। তবে বাহিনীটির সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন ভিনড়ব কথা। তাদের ভাষ্য, ব্যাটালিয়ন আনসার ও অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের প্রত্যেককেই পর্যাপ্ত হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক দেওয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ হয়তো সেটার সঠিক ব্যবহার করছেন না। আর যেসব হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা হয় এবং সাধারণ হাসপাতালগুলোতে যারা নিরাপত্তায় কাজ করেন তাদের প্রত্যেককে মানসম্মত পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট) দেওয়া হয়েছে এবং তারা সেটা নিয়মিত ব্যবহার করছেন। রাজধানীর রমনা পার্কে ডিউটি করেন আনসার সদস্য তালেব। পার্ক বন্ধ থাকলেও প্রতিদিন তাদের অস্ত্র হাতে টহল দিতে হয়। জানতে চাইলে তালেব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পার্ক বন্ধ হওয়ার আগে প্রাতঃভ্রমণে আসা এক ব্যক্তি একটি মাস্ক দিয়েছিলেন। সেটি ধুয়ে কয়েক দিন ব্যবহার করেছি। পরে সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কাকরাইল মসজিদের পাশের ফুটপাত থেকে ২০ টাকা দামের কাপড়ের মাস্ক কিনে ব্যবহার করছি। পরে সরকারিভাবে আমাদের ফাঁড়িতে কিছু মাস্ক ও গ্লাভস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত নয়।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের ফটকে কর্তব্যরত আনসার সদস্য রবিউল হোসেন বলেন, ‘বাহিনী থেকে মাঝে মাঝে মাস্ক দেওয়া হয়। তবে কোনো গ্লাভস বা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। তাই শুধু নিজের ড্রেস পরেই ডিউটি করতে হয়। ঝুঁকি আছে জানি, কিন্তু তারপরও কিছু করার নেই। ডিউটি তো করতে হবে।’ এ হাসপাতালটির বিভিনড়ব ওয়ার্ডে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের অনেকেরই পরনে পিপিই দেখতে পাননি এই প্রতিবেদক। তারা সাধারণ মাস্ক পরেই ডিউটি করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাহিনীটির প্রায় ৩০০ সদস্য হাসপাতালের ওয়ার্ড, ফটক, জরুরি বিভাগসহ বিভিনড়ব জায়গায় কাজ করেন। তাদের মধ্যে শুধু জরুরি বিভাগ ও আইসোলেশন ইউনিটে দায়িত্বরতদের পিপিই দেওয়া হয়েছে। তবে সেটাও পর্যাপ্ত নয়। এ পরিস্থিতিতে এক পিপিই পরেই একাধিক আনসার সদস্যকে পালাক্রমে ডিউটি করতে হয়। তা ছাড়া হাসপাতালটির বিভিনড়ব ওয়ার্ড ও ফটকে পিপিই ছাড়াই শুধু মাস্ক পরে ডিউটি করছেন আনসার সদস্যরা। তবে তাদের মধ্যেও আবার কেউ কেউ মাস্ক না পরেই ডিউটি করছেন। আনসার সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনারও কাজ করেন। এ ছাড়া বিভিনড়ব সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, বাড়ির নিরাপত্তা, হাসপাতালসহ নানা স্পর্শকাতর জায়গায় তাদের ডিউটি করতে হয়। পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণঝুঁকির মধ্যেই কাজ করছেন এসব আনসার সদস্য।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাহিনীটির তিনটি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি ব্যাটালিয়নে রয়েছেন ১৮ হাজার সদস্য, যারা ব্যাটালিয়ন আনসার নামে পরিচিত। আর অঙ্গীভূত আনসার সদস্য আছেন প্রায় ৫০ হাজার। এর বাইরে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য আছেন প্রায় ৬১ লাখ। ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যরা র্যাব বা বিজিবির মতোই একটি প্যারামিলিটারি ফোর্স। ব্যাটালিয়ন আনসাররা সরকারি- বেসরকারি বিভিনড়ব সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।
আনসার-ভিডিপি সদস্যদের করোনা সংক্রমণঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন) ড. মোহাম্মদ সাইফুর রহমান গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ব্যাটালিয়ন ও অঙ্গীভূত প্রত্যেক আনসার সদস্যকে পর্যাপ্ত হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক দেওয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ তা না পরে থাকলে সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু আমরা পর্যাপ্ত সরবরাহ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও সোহরাওয়ারর্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় হাসপাতালে ও ওয়ার্ডের সামনে যারা ডিউটি করেন তাদের প্রত্যেককে পিপিই দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ নিজেই মনিটরিং করছেন। আমাদের নিজস্ব অনলাইন গ্রুপে সেটা তদারকি করা হচ্ছে। কেউ নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে ডিউটি করতে পারছেন না, এমনটা হওয়ার কথা নয়।’ পরিচালক প্রশাসনের ভাষ্য, ব্যাটালিয়ন আনসার কমান্ডারের পাশাপাশি প্রতি জেলায় জেলা কমান্ডার, উপজেলায় উপজেলা কমান্ডার, ইউনিয়ন আনসার কমান্ডার, প্রতি গ্রামে ভিডিপি (গ্রাম প্রতিরক্ষা) লিডার আছেন। তাদেরও সুরক্ষা সরঞ্জাম হিসেবে মাস্ক ও গ্লাভস দেওয়া হয়েছে।