পারলেন না বার্নি স্যান্ডার্স। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রোটিক পার্টির মনোনয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন তিনি। দুই দফা চেষ্টা করেও পরাস্ত হলেন। তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে কল্পনা করা আর সম্ভব নয়। নির্বাচনী যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বার্নি অধ্যায়ের কি এখানেই সমাপ্তি?
ডেমোμেটিক এস্টাবলিশমেন্ট পুরোটা বিরুদ্ধে থাকলেও এবারের মনোনয়ন দ্বৈরথের শুরুর দিকে বার্নির অবস্থান মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ বাইডেনের চেয়ে বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। অনেকগুলো স্টেটে এগিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু গত মাসে সুপার টুইসডের ফলাফলে এগিয়ে যান বাইডেন। বাইডেন কি জিততে পারবেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে? সেই আলাপে যাওয়ার আগে জেনে নেই বার্নির শক্তির জায়গাটা কোথায়? তার পক্ষে কি নির্বাচনী মঞ্চ থেকে নেমে গিয়েও আমেরিকার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকা সম্ভব?
২. সাপ্তাহিক টাইম ম্যাগাজিনের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলেনিয়াল’রা (যাদের জন্ম ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬-এর মধ্যে) শিগগিরই দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। এরা প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী, এদের দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক, এরা পরিবেশ-সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা নিয়ে উদ্বিগড়ব। বয়োজ্যেষ্ঠদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এদের কাছে প্রস্নববিদ্ধ, চিরাচরিত গতানুগতিক রাজনীতির ওপর এরা আস্থা হারিয়েছেন।
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনটি আরও জানাচ্ছে, ২০১০ থেকে ২০১৯-এ এসে যুক্তরাষ্ট্রে তরুণসমাজের মধ্যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে ১৫ শতাংশ। ২০১৮ সালের এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, আঠারো থেকে উনত্রিশ বছর বয়সীদের মধ্যে শতকরা ৩৯ জন ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম’ সমর্থন করেন। সমগ্র জনসাধারণের ৫৫ শতাংশ মনে করেন পুঁজিবাদ মূলত অনৈতিক (আনফেয়ার)। ২০১৮ সালে নির্বাচনে মিলেনিয়ালদের ২০ জন ‘প্রতিনিধি’ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন। যার মধ্যে অন্যতম বার্নির সক্রিয় সমর্থক নিউ ইয়র্কের আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। তিনি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ২৮ বছর বয়সে। বার্নি এদের কাছে আশার প্রতীক। বার্নি এদের উদ্দীপ্ত করতে পেরেছেন। তার নির্বাচনী সভাগুলো দেখলেই এটা বোঝা যায়। এই উদ্দীপনা ২০১৬-তেও বার্নির সমর্থকদের মধ্যে দেখা গেছে। কিন্তু হিলারির নির্বাচনী প্রচারণায় এমন দৃশ্য ছিল না। এমনকি এবারেও ২০২০-এর ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বার্নির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাইডেনের সভা-সমাবেশগুলোতেও সেই উদ্দীপনা, সেই তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, সেই প্রাণচাঞ্চল্য সামগ্রিকভাবে অনুপস্থিত।
৩. এই প্রশ্ন তাই তোলাই যায়, বাইডেন কি জিততে পারবেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে? একই ধরনের কৌশল নিয়ে হিলারি হেরেছিলেন। একটু ফিরে দেখা যাক। ২০১৬ সালের নির্বাচনে বার্নি স্যান্ডার্স হিলারিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন ডেমোμেটিক প্রাইমারিতে। হিলারি পেয়েছিলেন ১ কোটি ৬০ লাখের মতো। ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রায় বার্নির সমসংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন রিপাবলিকান প্রাইমারিতে। বার্নির প্রতিপক্ষ ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। আর ট্রাম্পের বিপক্ষে ছিলেন বেশ কয়েকজন ডাকসাইটে প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাদের। সেই তুলনায় বলতে গেলে রাজনীতিতে ট্রাম্পের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না।
ট্রাম্প খেপিয়েছিলেন ‘ব্লু কলার ওয়ার্কার্স’ নামে খ্যাত মধ্য যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমজীবী মধ্যবিত্তদের। ন্যায্য পাওনা থেকে তারা বঞ্চিত, তাদের অবস্থা গত কয়েক বছরে খারাপ থেকে খারাপতর হয়েছে। ট্রাম্প এদের শোনালেন আশার বাণী, বললেন গতানুগতিক রাজনীতিই এদের দুর্ভোগের জন্য দায়ী। স্বভাব অনুযায়ী তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের গালাগাল করে বলতে থাকলেন, একমাত্র তিনিই তাদের জন্য নিয়ে আসতে পারেন সুদিন! তার প্রচারণার টার্গেটই ছিল ‘ব্লু কলার’ শ্রেণি। এই শ্রেণির ডেমোক্রেটরা বেশির ভাগই প্রাইমারিতে ভোট দিয়েছিলেন বার্নিকে, হিলারিকে নয়। বার্নিকে ভোট দেওয়া অনেকেই ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন চূড়ান্ত নির্বাচনে। তর্কাতীত না হলেও বলা যেতে পারে, ট্রাম্পের জয়ের পেছনে এটা ছিল অন্যতম প্রধান একটি কারণ।
সারা দেশের হিসাবে ট্রাম্প প্রায় ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েছিলেন হিলারির চেয়ে। কিন্তু জিতেছিলেন ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। যে তিনটি তথাকথিত ‘পার্পল স্টেটসে’ (যাদের ডেমোক্রেটিক বা রিপাবলিকান যেকোনো দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে) ট্রাম্প হিলারির চেয়ে বেশি ভোট পান, সেগুলো হচ্ছে মিশিগান, উইস্কনসিন আর পেনসিলভানিয়া। এই তিনটি স্টেট মিলিয়ে দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান ছিল ৭৮ হাজারের কিছু কম, যা কি না স্টেট তিনটির মোট ভোটের তুলনায় এক শতাংশও নয়। এই তিনটিতে আছে ৪৬টি ইলেক্টোরাল ভোট। এই ৪৬টি ভোট ট্রাম্পকে এনে দেয় ৩০৪টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট। জয়ের জন্য দরকার ছিল ২৭০টির।
দেখা দরকার এই তিনটি স্টেটের ভোটার কারা। তাদের বেশির ভাগই হচ্ছেন তথাকথিত ‘সুইং’ ভোটার, এদিকেও যেতে পারেন, ওদিকেও যেতে পারেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তারাই হচ্ছেন বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রান্তিক মধ্যবিত্তরা, যারা নিমড়বমধ্যবিত্তে পরিণত হয়েছেন গত দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে। আয়-উপার্জন কমে গেছে, কর্মহীন বেকার অনেকেই, তাদের আর সেই সুদিন নেই। অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো আগের চেয়ে আরও বেশি প্রকট। পুঁজিবাদ একসময় এই ব্লু কলার জনগোষ্ঠীকে কায়িক পরিশ্রমের বিনিময়ে মধ্যবিত্তের আয় দিতে পারত। পুঁজিবাদের সেই দিন ফুরিয়েছে, গ্লোবালাইজেশন আর অটোমেশন পুঁজিবাদকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ক্লিনটন-বুশ-ওবামা আমলের বাণিজ্যচুক্তির ফলে, সস্তাশ্রমের জন্য তৃতীয় বিশ্বে কলকারখানা স্থানান্তর, অটোমেশন ইত্যাদির কারণে তাদের অবস্থা শোচনীয়। অনেকের কাজ নেই, অনেকেই দু-তিনটি পার্টটাইম কাজ করেন। তাদের ছেলেমেয়েদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
প্রশ্ন হচ্ছে তারা হিলারিকে ভোট না দিয়ে ট্রাম্পকে কেন ভোট দিলেন? আরও লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, তাদের অনেকেই ওবামাকে দু-দুবার (২০০৮ আর ২০১২) ভোট দিয়েছিলেন এবং এই তিনটি স্টেটের সব কটি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পাইয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ওহাইও, ফ্লোরিডা, আইওয়াতেও ওবামা দু-দুবার জিতেছিলেন, হিলারি ক্লিনটন সেগুলো পেলেন না কেন? নর্থ ক্যারোলিনাও একবার ওবামা পেয়েছিলেন, হিলারি পাননি। আর মিনেসোটার মতো ‘ব্লু স্টেটে’ও হিলারি প্রায় হারতেই বসেছিলেন।
৪. কারণটা বোঝা খুব একটা কঠিন নয়। হিলারির রাজনীতি এস্টাবলিশমেন্টঘেঁষা। তিনি প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী, ওবামার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে ছিলেন সিনেটর। হিলারিকে তারা আর সুযোগ দিতে রাজি নন। গত নির্বাচনের (২০১৬) এই বিশেষ দিকটিকে ধর্তব্যে না নিলে এবারের নির্বাচনের (২০২০) অনেক কিছুই সঠিকভাবে বোঝা যাবে না। তাই ২০১৬ সালে ট্রাম্প শুধু উগ্র বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের ভোটেই প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, এই ধারণা অতি সরলীকৃত এবং বাস্তবসম্মত বিশেশ্লষণের সহায়ক নয়। যদিও এটা সত্য যে, এই বিশেষ গোষ্ঠী তথা চরম ডানপন্থি, ধর্মীয় রক্ষণশীল, অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিদ্বেষী গোষ্ঠী একচেটিয়া ভোট ট্রাম্প পেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের জয় নিশ্চিত করার জন্য সংখ্যার বিচারে তাদের ভোট মোটেও যথেষ্ট ছিল না।
এ কারণেই বার্নি ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হলে ট্রাম্পকে হারাতে পারতেন, বার্নি সমর্থকদের এই যুক্তি সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু এখন উল্টো বার্নিবিরোধী ডেমোক্রেটিক এস্টাবলিশমেন্ট প্রচারে নেমেছে এই বলে যে বার্নির সমর্থকরা ২০১৬-তে হয় ঘরে বসেছিলেন, নয় তো ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তাই হিলারির হারার কারণও তারা। এবারও তারা তাই করবে এবং প্রকারান্তরে ট্রাম্পকে জিততে সহায়তা করবে। বাইডেন নির্বাচনে হেরে গেলে বার্নিকে এই অপবাদ আবার দেওয়া হবে। আগে থেকেই বার্নিকে তারা নন্দঘোষ বানিয়ে রেখেছেন। তবে এটাও ঠিক, সেই যে মিলেনিয়ালদের কথা বলছিলাম, যাদের বয়স চল্লিশের নিচে, বাইডেন প্রার্থী হওয়ায় তাদের অনেকেই হয়তো বসে থাকবেন, ভোট কেন্দ্রেই যাবেন না।
৫. বাইডেন-ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল এস্টাবলিশমেন্টের চাওয়া। যেই জিতুক, তাদের খুব একটা ক্ষতি নেই। এস্টাবলিশমেন্ট মরিয়া, কারণ বার্নি তাদের যথেষ্ট ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। এখন নির্বাচনী প্রচারণা ট্রাম্পকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। অভিশংসিত ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজ থেকে অপসারণই হবে ডেমোক্রেটিক পার্টির মূল লক্ষ্য। তবে যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা হতো বার্নি আর ট্রাম্পের মধ্যে, তাহলে নির্বাচনটা শুধু ট্রাম্পকে ঘিরে আবর্তিত হতো না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। ধনিক শ্রেণির সঙ্গে মধ্যবিত্তের, শ্রমজীবী মানুষের। সেটা আর সম্ভব হলো না। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চপর্যায়ের রাজনীতিতে লড়াইটাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বার্নি। কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়ায় সেই সুযোগটা তিনি আর পাচ্ছেন না।
বার্নি মনোনয়ন না পেলেও, প্রেসিডেন্ট হতে না পারলেও এখানেই তার সফলতা যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক জনগণের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তিনি এই বোধটাকে জাগাতে পেরেছেন, ‘ট্রাম্পকে হটালেই সমস্যার সমাধান হবে না, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর ঘটাতে না পারলে’। এ কারণেই বার্নি স্যান্ডার্স ২০২০-এর পরও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অনেক বছর ধরে প্রাসঙ্গিক থাকবেন। বিদায়ী বার্তায় বার্নি বলেছেন, আবার দেখা হবে। বাইডেনও ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে প্রশংসা করে বলেছেন, শুধু একটা নির্বাচনী প্রচারণাই নয়, বার্নি একটা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন। বার্নিও বলেছেন, তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও আন্দোলন থেমে যাচ্ছে না।
২০২০-এর ৩ নভেম্বর কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন, বাইডেন না ট্রাম্প, এখনই বলা সম্ভব নয়। এর মধ্যে করোনাভাইরাস সংকটের কারণে অর্থনীতি ও সমাজে যে প্রভাব পড়ছে, তা থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি। সংগত কারণেই নির্বাচনের ওপরও প্রভাব রাখবে এই সংকট। কোনো জ্যোতিষীর সাধ্য নেই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়ার। তবে এ কথাটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি পাল্টে গেছে আমূল। ‘মিলেনিয়াল’রাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন নিকট ভবিষ্যতে। তাদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যানধারণা যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত রাজনীতির সঙ্গে আর খাপ খাচ্ছে না। তারা যখন এগোবেন, তখন সেটা হবে বার্নিরই এগিয়ে যাওয়া।