করোনাযুদ্ধে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের অনুপ্রেরণা

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে সৈন্যরা যখন যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে রোগে ভুগে বেশি মারা যাচ্ছিল সে সময় তাদের জন্য আশা হয়ে সামনে এসেছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। মানবসেবায় জীবন উৎসর্গকারী এ নারী ব্যক্তিগত জীবনে সংসারী হননি। সৈন্যদের সেবা করে তিনিও আক্রান্ত হয়েছিলেন ক্রিমিয়ার জ্বরে। নিজেকে কোয়ারেন্টাইন করেও সেবার হাতকে তিনি প্রসারিত রেখেছিলেন। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট অবলম্বনে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

সৈন্যদের সেবায় নাইটিঙ্গেল

১৮৫৩ সালের অক্টোবর মাস। তুরস্কের নিয়ন্ত্রিত দারদানেলিস প্রণালী দিয়ে যুদ্ধজাহাজ চলাচলের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তুরস্কের খ্রিস্টানদের রক্ষার অজুহাতে অটোমান সাম্রাজ্যের তুর্কি এলাকায় রাশিয়ার আক্রামণের মাধ্যমে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সূচনা হয়। তুরস্ককে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। যুদ্ধের চেয়ে রোগে ভুগেই সৈন্যরা বেশি বিপর্যস্ত হয়। ১৮৫৪ সাল নাগাদ ১৮ হাজারেরও বেশি সৈন্য মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি হয়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের এই যুদ্ধে বিপনড়ব সৈন্যদের অবস্থা নিজের চোখে দেখে এসে বর্ণনা করেন টাইমস ম্যাগাজিনের একজন সাংবাদিক। হাসপাতালগুলোতে অসুস্থ সৈন্যরা চরম নিগ্রহের মধ্যে থাকত। না ছিল তাদের জন্য কোনো নার্সের ব্যবস্থা, না ছিল প্রয়োজনীয় ওষুধসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের যথেষ্ট বরাদ্দ। যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে বেশিরভাগ সৈন্যের মৃত্যু হচ্ছিল ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিণ্ণ ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে। সংবাদপত্রের প্রকাশিত খবরে দেশজুড়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হলো। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বিচলিত হয়ে উঠলেন। এই সমস্যার সমাধান মেলানো যেন দিনকে দিন দুরূহ হয়ে উঠছিল। সে সময় প্রতিরক্ষা দপ্তরের সেক্রেটারি সিডনি হার্বাটের ভাবনায় এলো মহীয়সী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কথা। তিনি ছিলেন নাইটিঙ্গেলের খুব কাছের একজন বন্ধু ও পরামর্শদাতা। হার্বাট তাকে লিখে পাঠালেন, ‘যুদ্ধের এই করুণ ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় আহত সৈন্যদের দেখভাল করার জন্য একজন উপযুক্ত ব্যক্তিও নেই। যদি আপনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন দেশ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।’ দেশের এই ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি নাইটিঙ্গেল। নিজ উদ্যোগে ৩৮ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে নার্সিংয়ের দল গঠন করে স্কুটারিতে (ইস্তানবুলের একটি জায়গার নাম) যেখানে আহত ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য গড়ে উঠেছে অস্থায়ী হাসপাতাল, সেখানে রওনা দেন।

দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নাইটিঙ্গেল তার দল নিয়ে স্কুটারির প্রান্তে এসে পৌঁছালে, ক্লান্তির চেয়ে সেখানকার পরিস্থিতি দেখে সবাই অবসাদে দুর্বল হয়ে পড়লেন। সুষম খাবার থেকে শুরু করে ওষুধ, রোগীর পরনের পরিষ্কার কাপড়, এমনকি পানযোগ্য বিশুদ্ধ পানি কিছুই সেখানে ছিল না। করুণ এ দৃশ্য দেখে নাইটিঙ্গেল মানসিকভাবে বিধ্বস্ত না হয়ে নিজেকে শক্ত করলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তিনি ভেঙে পড়লে কোনো কাজই সহজভাবে করা যাবে না। বাকিদের রেখে এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি চলে গেলেন হাসপাতালের অবস্থা দেখতে। সেখানে ভারপ্রাপ্ত অফিসার তাকে বলেছিলেন, হাসপাতালে কোনো কিছুর অভাব নেই। সব কিছুর পর্যাপ্ত মজুদ আছে। কিন্তু নাইটিঙ্গেল দেখলেন ভিনড়ব চিত্র। যেদিকে চোখ যাচ্ছে শুধু অভাব আর অভাব। সামরিক ভান্ডারে প্রয়োজনীয় জিনিস থাকা সত্ত্বেও নানা বিধিনিষেধের কারণে কিছুই পেলেন না। দমে যাওয়ার পাত্র নন নাইটিঙ্গেল। সেবার যে পণ নিয়ে তিনি এখানে এসেছেন, সেটা যেভাবেই হোক পূর্ণ করবেন তিনি।

হাসপাতালকে সেবাযোগ্য করে তোলা

রোগী শুধু সেবা পেলেই ভালো হয়ে উঠবে, তা নয়। তাকে সুস্থ হতে হলে তার আশপাশও পরিচ্ছনড়ব ও জীবাণুমুক্ত থাকা চাই। নাইটিঙ্গেল বুঝতে পেরেছিলেন, হাসপাতালকে সেবাযোগ্য করে না তুললে কোনোভাবেই রোগীদের বাঁচানো সম্ভব নয়। তাই শুরুতেই তিনি হাত দেন হাসপাতাল পরিষ্কারে। হাসপাতাল চত্বর পরিচ্ছনড়ব রাখার জন্য যে ঝাড়ু বা কাপড়ের প্রয়োজন হতো, সেটিও তখন ছিল না। কর্তৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষা না করে নাইটিঙ্গেল নিজে তদারকি করে সব ব্যবস্থা করেন। এমনকি রোগীদের পরিষ্কার কাপড়ের ব্যবস্থা করার জন্য নিজেই লন্ড্রি খোলেন। হাসপাতালের অপেক্ষা না করে নাইটিঙ্গেল অন্যভাবে সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করেন। সুপরিচিত সংবাদপত্র ‘দ্য টাইমস’ এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য আবেদন করেন। ধীরে ধীরে পরিচ্ছনড়ব পোশাক, তোয়ালে আসা শুরু হয়। তার নির্দেশে কোনো পার্সেল আসা মাত্রই সেটি খুলে কাজ শুরু করা হতো।

হাসপাতালের পরিচালনা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনলেন নাইটিঙ্গেল। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না বা সেবা প্রদানে উপযুক্ত নয়, এমন কর্মচারীদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিলেন। নিয়ম পালনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠিন প্রকৃতির। শুধু হাসপাতালের পরিচ্ছনড়বতা নয়, নাইটিঙ্গেল জোর দিয়েছিলেন হাত ধোয়াসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাস চালু করতে। সঠিকভাবে হাত ধোয়ার মাধ্যমে যে জীবন বাঁচে এ তথ্য সর্বপ্রম ১৮৪০ এর দশকে জানিয়েছিলেন হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক ইগনাজ সেমেলওয়েজ। প্রসূতি বিভাগে শুধুমাত্র হাত ধোয়ার কারণে মাতৃমৃত্যুহার কমে এসেছিল অনেকাংশে। এ পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন নাইটিঙ্গেল নিজেও। নাইটিঙ্গেল হাসপাতালের সবাইকে পরামর্শ দিয়েছিলেন কক্ষের জানালা খুলে রেখে এবং ভেন্টিলেশনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে ঘরের বদ্ধভাব, দুর্গন্ধ আর দূষিত ভাব থাকবে না। কলেরা এবং টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগ যেন না ছড়ায় সেজন্য পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থারও উণ্ণতি করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের কাঠামো পরিবর্তন করতে সফল হন। সেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টার কারণে সৈন্যদের মৃত্যুর হার ৪২ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নেমে আসে। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সব কিছু পরিচ্ছনড়ব রাখার নির্দেশ দেন তিনি। ময়লা কার্পেট এবং অপরিচ্ছণ্ণতা আসবাব নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এগুলো বাতাসকে ঠিক ততটাই নোংরা করে যতটা বেসমেন্টে গোবরের স্তূপ জমা করে রাখলে হয়।’ শুধু পরিষ্কার, পরিচ্ছণ্ণতা নিয়ে যে নাইটিঙ্গেল সচেতন ছিলেন, তাই নয়। তিনি রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিশেষভাবে জোর দেন। তিনি সৈন্যদের পড়তে, লিখতে এবং সামাজিক নানা বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেন যেন তারা একঘেয়েমি অথবা মদ্যপানে ডুবে না যায়। নিরলসভাবে সেবা প্রদানের জন্য তিনি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে।

তথ্য অনুসন্ধান

শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায়, নাইটিঙ্গেলের বাবা তাকে পরিসংখ্যানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বিষয়টি তার কাছে ছিল একদম নতুন ছিল। বাবা তার জন্য একজন গণিতের শিক্ষকও রাখেন বাড়িতে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ চলাকালীন এবং তার পরে, বিভিনড়ব মাধ্যমে পাওয়া সুফলগুলো নিয়ে নাইটিঙ্গেল একটি পরিসংখ্যান দাঁড় করান। যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে বিভিণ্ণ রোগে সেনাদের মৃত্যু নিয়ে তিনি একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। ১৮৫৮ সালে লন্ডনের স্ট্যাটিসটিকাল সোসাইটিতে ভর্তি হওয়া তিনিই প্রম নারী ছিলেন। এরপর ভারতের আর্মি স্টেশনে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের মৃত্যুর হার বিষয়ক বেশ কিছু প্রশড়বাবলি তৈরি করেন নাইটিঙ্গেল। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাস্থ্য সমস্যা কেবল তখনই কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যাবে যখন তার মাত্রা সার্বিকভাবে জানা থাকে। ১৮৫৭ সালে, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছর পর, নাইটিঙ্গেল বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় রোগটি সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা না গেলেও, অনেকেই এখন মনে করেন, সেটি ছিল ব্রুসেলোসিস নামে এক ধরনের ফ্লু ইনফেকশন। বাকি জীবন তিনি শারীরিক অনেক কষ্টে কাটান। মাঝেমধ্যে বিছানা থেকে উঠতে বা হাঁটতেও তার অনেক কষ্ট হতো।

নাইটিঙ্গেলের কোয়ারেন্টাইন

ব্যথা এবং ক্লান্তির কারণে বাইরে গিয়ে কাজ না করতে পারায় তিনি বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়িতে থেকেও আপন মানুষদের থেকে দূরে থাকতেন নাইটিঙ্গেল। বলতে গেলে, স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন নির্জনতা এবং পরিবার থেকে দূরত্ব। তিনি চাননি তার কারণে অন্য কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ুক। তার দেখাশোনার জন্য যদিও লোক রাখা ছিল। বাইরের মানুষের সঙ্গে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া দেখা করতেন না। অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে বসে কতটুকুই বা কাজ হবে এমন ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করেছিলেন নাইটিঙ্গেল। দীর্ঘদিন বাড়িতে থেকে তিনি অসাধারণ একটি কাজ করে ফেললেন। ‘নোটস অন নার্সিং’ নামে একটি বই লিখলেন, ক্রিমিয়ার যুদ্ধে চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে ৯০০ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট এবং হাসপাতালের নকশা নিয়ে একটি বই লিখে ফেললেন। বলতে গেলে এগুলো ছিল বড় কোনো কাজের সূচনা। দেশে ফিরে রানীর কাছে তার কাজের সম্মাননা হিসেবে বহুমূল্য একটি ব্রোচসহ সরকারের কাছে থেকে পেয়েছিলেন ২,৫০,০০০ ইউএস ডলার। এছাড়া ‘নাইটিংগেল ফান্ড’- এর মাধ্যমে জোগাড় করেন আরও ৪৫,০০০ ডলারের মতো। পরিচিত বিভিণ্ণ উচ্চপদস্থ মানুষের কাছে থেকে পেলেন সহযোগিতা। সবার প্রচেষ্টায় ১৮৬০ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সদের জন্য নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল খুললেন। ১৮৬১ সালে কিংস কলেজ হাসপাতালে প্রসূতিবিদ্যা নিয়ে ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করেন। বিভিনড়ব হাসপাতালের নকশা নির্মাণেও পরামর্শ দেন। তার কাছে থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নার্সরা বিভিনড়ব জায়গায় ও দেশে ছড়িয়ে গেলেন। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তার কাছে থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণের সাহায্যেই আমেরিকায় উপযুক্ত নার্সিং প্রা চালু করা হয়।

১৮৬০ দশকের শেষের দিকে, সাধারণ হাসপাতালগুলোকে ট্যাক্সের বিনিময়ে বৃহৎ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য আবেদন করেন নাইটিঙ্গেল। এছাড়া ভারতের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়েও তিনি কাজ করেন। এসব কিছুই তিনি করেছিলেন বাড়ি থেকে বের না হয়ে। সরকারি মন্ত্রিরা তার বাড়িতে আলোচনার জন্য বিভিনড়ব সময় আসতেন। তখন এসব বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়। একদিক দিয়ে বলতে গেলে, নাইটিঙ্গেলের বাড়িতে সেলফ আইসোলেশনে থাকায় বেশ উপকারই হয়েছে। বাবার অবস্থা ভালো থাকায় নাইটিঙ্গেলকেও অর্থ-সম্পদ নিয়ে কখনো ভাবতে হয়নি। লন্ডনের বেশ অভিজাত একটি বাড়িতে তিনি থাকতেন। তার দেখাশোনা, বাজার করা, রানড়বার জন্য বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নিয়োজিত ছিলেন। সন্তান ছিল না বলে সে নিয়ে তার অন্য চিন্তাও ছিল না। যতটুকু সময় জেগে থাকতেন তার পুরোটাই কাজে লাগাতেন বই পড়ে এবং লিখে।

ব্যক্তিগত জীবন

১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। বাবা উইলিয়াম অ্যাডওয়ার্ড নাইটিংগেল ও মা ফ্রান্সিস নাইটিংগেলের পরিবার ছিল বেশ ধনী এবং সম্ভ্রান্ত। শহরের নামের সঙ্গে মিল রেখে মেয়ের নাম রাখেন বাবা। ১৮২১ সালে পুরো পরিবার চলে আসে ইংল্যান্ডে। সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ পরিবার হওয়ায় সমাজের উঁচু স্তরের মানুষদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাদের বাড়িতে। মা ও বোনদের অভিজাত এই মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় বিপুল আগ্রহ থাকলেও একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন নাইটিঙ্গেল। তিনি এ ধরনের সামাজিকতাকে বরং কিছুটা এড়িয়েই চলতেন। তবে পরবর্তী সময়ে এই যোগাযোগকে তিনি তার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও সাহায্য পেতে কাজে লাগিয়েছেন।

নাইটিঙ্গেলের বাবা ছিলেন দুটো স্টেটের মালিক। অর্থের প্রাচুর্য বলতে যা বোঝায় তার সবই উইলিয়াম এডলারের ছিল। সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে তিনি বরাবরই সচেতন ছিলেন। ছোটবেলাতেই গণিত, সংগীত, জার্মান, ফারসি, ইতালিয়ান ভাষাসহ বিভিনড়ব ক্ষেত্রে ভিত্তিমূলক শিক্ষা অর্জন করেন নাইটিঙ্গেল। তিনি যখন সবে যৌবনে পা দিয়েছেন, তখন বাবা উইলিয়াম পুরো পরিবারকে নিয়ে ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। বলা যায়, এই ভ্রমণের কারণেই নাইটিঙ্গেলের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ভ্রমণে ম্যারি ক্লার্ক নামে একজন ইংরেজ বংশোদ্ভূত ফরাসি মধ্যবয়স্ক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২৭ বছরের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদের বন্ধুত্ব আজীবন রয়ে যায়। ম্যারি মিশতেন বুদ্ধিদীপ্ত পুরুষদের সঙ্গে। তার সঙ্গে মিশে ফ্লোরেন্স বুঝতে পারেন মেয়েরাও চাইলে ছেলেদের মতো উপযুক্ত হতে পারে।

১৭ বছর বয়সে লন্ডনে থাকাকালীন নাইটিঙ্গেল মানবসেবার প্রতি প্রম আগ্রহ অনুধাবন করেন। এই টানকে পরবর্তী সময়ে ‘ঈশ্বরের ডাক’ বলে অভিহিত করেছিলেন তিনি। কিন্তু নার্সিং সেবায় যুক্ত হতে চাইলে শুরুতেই বাধা আসে পরিবার থেকে। কারণ তখন সমাজে নার্সিং ছিল নিমড়ববিত্ত, অসহায়, বিধবা মহিলাদের পেশা। সব প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হয় তার প্রবল ইচ্ছাশক্তির। বিভিনড়ব দেশে ভ্রমণ করে সেসব দেশের সেবা ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন উনড়বত ব্যবস্থাতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মানির ক্যাথলিক কনভেন্ট পরিদর্শন ও তাদের নার্সিং স্কুলে ট্রেনিং ও আলেকজান্দ্রিয়ায় সেন্ট ভিনসেন্ট সোসাইটির বৃহৎ হাসপাতালে ট্রেনিং। ১৮৫৩ সালের ২২ আগস্ট লন্ডনে মেয়েদের একটি হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পান নাইটিঙ্গেল। বাবার দেওয়া বার্ষিক ৫০০ ডলার (বর্তমানে প্রায় ৬৫,০০০ ইউএস ডলার) তার স্বাধীন ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনধারণের পথ করে দেয়। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি তাকে। এগিয়ে গিয়েছেন নিজ লক্ষ্য পূরণে।

ব্যক্তিগত জীবনে ফ্লোরেন্স বিয়ে করেননি। তিনি ভেবেছিলেন, সেদিকে মনোযোগ দিলে জীবনের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন না। তাই সুন্দরী তরুণী সে সময় সমাজের সবচেয়ে ধনী ও যোগ্য অনেক পাত্রের লোভনীয় বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। নাইটিঙ্গেল সে সময়ের নারী অধিকার আন্দোলনের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘মেয়েরা সহানুভূতির আশা করে, কিন্তু নিজেদের পুরুষের মতো যোগ্য করে তোলে না।’ মানবসেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া মানুষটি একদিন নিভৃতে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থেকে ১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার পরিবার সরকার থেকে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠান প্রত্যাখ্যান করে খুবই সাধারণভাবে চার্চের পাশে নাইটিঙ্গেলকে সমাধিস্থ করা হয়।