সারা দেশে জ্বর-শ্বাসকষ্টে আরও ১৩ জনের মৃত্যু

জ্বর, শ্বাসকষ্ট নিয়ে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিনড়ব স্থানে গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের আইসোলেশনে গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে রাফাত (৬) নামে এক শিশু মারা গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য খুমেকের ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গতকাল ভোরে এক বৃদ্ধ ও মাসদাইর এলাকায় গত শুμবার সন্ধ্যায় শারীরিক প্রতিবন্ধী এক তরুণ মারা গেছেন। গত শুক্রবার রাতে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক নারী (৫২), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ও কমলনগরে দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। একই দিন বিকেলে কুষ্টিয়া সদরে এক আনসার সদস্য ও দুপুরে ভোলার লালমোহনে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। এ ছাড়া গতকাল সকালে ফেনীর পরশুরামে এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে এক নারী (৩৫), নওগাঁর পতড়বীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক নারী (২৫) ও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে মানিকগঞ্জ সদরে মারা গেছেন কোয়ারেন্টাইনে থাকা এক ব্যক্তি (৬০)। অন্যদিকে এক সপ্তাহে একই উপসর্গ নিয়ে দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী দেশের বিভিণ্ণ স্থানে আরও ৫৪ জন মারা গেছে।

খুলনা : খুমেক হাসপাতালের মেডিসিন চিকিৎসক ও করোনা আইসোলেশন ইউনিটের মুখপাত্র ডা. শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, রাফাতকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায় শুক্রবার বিকেল ৩টায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনায় করোনা সন্দেহ হয়। পরে বিকেল ৫টার দিকে তাকে করোনা আইসোলেশন ইউনিটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১২টার দিকে সে মারা যায়। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য খুমেকের ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে শিশুটির জ্বর, সর্দি ও কাশি ছিল।

নারায়ণগঞ্জ : গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে শহরের মাসদাইর এলাকায় জ্বর-সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে রুম্মন বাবু (৩২) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। তিনি ওই এলাকার এনএস টাওয়ারের আনোয়ারুল ইসলামের ছেলে। ওই তরুণের দাফনের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। খবর পেয়ে কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ মরদেহ দাফনের উদ্যোগ নেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী ওই তরুণ ৩-৪ দিন ধরে জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করা হবে কি না জানতে চাইলে ওই কাউন্সিলর আরও বলেন, ‘ওই তরুণ মারা যাওয়ার প্রায় তিন ঘণ্টা পর আমরা জেনেছি। তিন ঘণ্টা পর নমুনা সংগ্রহ করে কোনো লাভ নেই। তাই নমুনা নেওয়া হবে না।’

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) : উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাঈদ আলম মামুন জানান, গতকাল ভোর ৫টার দিকে উপজেলার রূপসী প্রধান বাড়ি এলাকায় জলিল প্রধান (৬৫) মারা গেছেন। তিনি একই এলাকার মৃত কুদরত আলীর ছেলে। ওই বৃদ্ধ কয়েক দিন ধরে জ্বর, ঠাণ্ডা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা যাওয়ার আগেই লাশ দাফন করে ফেলায় তার মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। ওই পরিবারের সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। রবিবার তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হবে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এক নারী ও শুক্রবার সকালে এক ব্যক্তি জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি ও শ্বাসসকষ্ট নিয়ে মারা যান।

মাদারীপুর : কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আল-বিধান মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, উপজেলার রমজানপুর ইউনিয়নের চড়াইলকান্দি গ্রাম থেকে শুক্রবার বিকেলে এক নারী (৫২) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। পরে রাত ১১টার দিকে তিনি মারা যান। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা মেনে সতর্কতার সঙ্গে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লা বলেন, ওই নারীর বাড়িটি লকডাউন করে রাখা হয়েছে এবং আশপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর : কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম জানান, উপজেলার চরফলকন গ্রামের বাড়িতে গত শুক্রবার রাত ১১টায় ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি মারা যান। দুদিন ধরে তার জ¦র ও ডায়রিয়া ছিল। মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই ব্যক্তির বাড়িসহ তিনটি বাড়ি লকডাউনে রাখা হয়েছে।

রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রওশন জামিল বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১টায় উপজেলার শেফালীপাড়া গ্রামের দর্জি বাড়ির জামাল খানের জ¦র-ডায়রিয়ায় মৃত্যুর খবর পেয়ে আমরা নমুনা সংগ্রহ করেছি। আপাতত ৬টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।’

ফেনী : পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল খালেক বলেন, ‘শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার পথে শ্বাসকষ্ট নিয়ে আমান উল্লাহ (১৭) নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তার দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছি।’

স্থানীয়রা জানায়, আমান উপজেলার দক্ষিণ কোলাপাড়া গ্রামের প্রবাসী আবদুস ছাত্তারের ছেলে ও পরশুরাম ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম প্রম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। ছোটবেলা থেকেই তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। শুক্রবার হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে গতকাল সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। কয়েক দিন ধরে সে স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সক্রিয় ছিল।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াছমিন আক্তার জানান, জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : গতকাল সকাল ৭টার দিকে পৌরসভার কাউতলী এলাকায় বাসায় জ্বর, কাশি ও শ্বাসসকষ্ট নিয়ে এক নারী (৩৫) মারা গেছেন। তার স্বামী জানান, গত ৩১ মার্চ প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকায় রেফার্ড করেন। কিন্তু ঢাকা যেতে রাজি না হওয়ায় বাড়িতেই তার চিকিৎসা চলছিল।

সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ জানান, ওই নারীর করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় তাকেও এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে দাফন করা হবে।

ভোলা : সিভিল সার্জন রতন কুমার ঢালী জানান, লালমোহন থেকে ভোলা নেওয়ার পথে শুক্রবার দুপুরে মারা যাওয়া আবু কালাম সরদারের (৫৫) নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তার জ¦র, পাতলা পায়খানা ও শ্বাসকষ্ট ছিল।

স্থানীয়রা জানায়, ওই ব্যক্তি পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নের উত্তর গজারিয়া আবাসন এলাকায় বাসিন্দা ছিলেন। রাত ১১টায় তার লাশ দাফনের পর প্রশাসনকে জানানো হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাবিবুল হাসান রুমির নির্দেশে ওই এলাকার কাশ্মীর গ্রাম, নর্থ গজারিয়া গুচ্ছগ্রাম ও পাশের ফরাজগঞ্জ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডকে ১৪ দিনের জন্য লকডাউন ঘোষণা করেন সিপিপির সহকারী পরিচালক মুন্সী নূর মোহাম্মদ।

নওগাঁ : পতড়বীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল সকাল ৮টার দিকে শাহিন আক্তারের (২৫) মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলার মাটিন্দর ইউনিয়নের বাজকোলা গ্রামের মোক্তাদির হোসেনের স্ত্রী। নওগাঁর ডেপুটি সিভিল সার্জন মনজুর এ মোর্শেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই নারী ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরার পরে তার শ্বাসকষ্ট ছিল। শুক্রবার রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির পর সকালে তিনি মারা যান। পরীক্ষার জন্য তার মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

এলাকাবাসী ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন শাহিন আক্তার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত্যুর পর দাফনের জন্য মরদেহ বাজকোলা গ্রামে নেওয়ার পথে স্থানীয়রা বাধা দেয়। পরে বাবার বাড়ি আকবরপুর ইউনিয়নের বাদাপুর গ্রামে নিয়ে তাকে দাফন করা হয়।

মানিকগঞ্জ : সদর উপজেলার ভাড়ারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য জানিয়েছেন, কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় গতকাল দুপুরে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় এক ব্যক্তি (৬০) মারা গেছেন। করোনাভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে এলাকাবাসী ওই ব্যক্তির দাফনে বাধা দিয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, ডিম ব্যবসায়ী ওই ব্যক্তির কয়েক বছর ধরে শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। ১২ দিন আগে দোকানে তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন।

নেত্রকোনা : মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল সকালে নরউত্তম সরকার (৫৫) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নমুনা সংগ্রহ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, মল্লিকপুর গ্রামের নরউত্তম কয়েক দিন আগে ঢাকা থেকে ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে আসেন। এরপর থেকে তার সর্দি-জ¦র দেখা দেয়। সকালে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নিসহ কয়েকজন তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসক তার নমুনা সংগ্রহ করেন। কিছুক্ষণ পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে একটি কড়ইগাছের নিচে তাকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর মো. শামছুল আলমের নজরে আসার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি বলেন, ‘একজন মানুষকে ফেলে চলে যাওয়াটা খুবই দুঃখজনক। কারণ ওই ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত কি না, তা তো প্রমাণ হয়নি। ওনার স্বজনদের না পেয়ে নিজের গাড়িতেই করে হাসপাতালে নিয়ে রাখি। যেহেতু মারা গেছেন, রেজাল্ট এলে তার স্বজনদের খুঁজে বের করা হবে।’

কুষ্টিয়া : যশোর থেকে ছুটিতে বাড়ি আসার পর শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আশরাফুল ইসলাম (৪৫) নামে এক আনসার সদস্যের শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছে। তিনি সদর উপজেলার মৃত্তিকাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। কুষ্টিয়া জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট সোহেলুর রহমান জানিয়েছেন, আগে থেকেই তিনি হৃদরোগে ভুগছিলেন। সদরের ইউএনও জোবায়ের হোসেন চৌধুরী বলেন, মৃত্তিকাপাড়া গ্রামে মারা যাওয়া আনসার সদস্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ), লক্ষ্মীপুর, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভোলা, নওগাঁ, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কুষ্টিয়া প্রতিনিধি এবং মাদারীপুর সংবাদদাতা]