নারায়ণগঞ্জে করোনা প্রতিরোধ

পরস্পরকে দোষারোপ নগর কর্তৃপক্ষ ও সিভিল সার্জনের

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে। এই চরম দুর্দিনে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। করোনার উপসর্গ নিয়ে অসুস্থরা নিজেদের নমুনা সংগ্রহ করার অনুরোধ জানিয়ে সিটি করপোরেশনের হটলাইনে বারবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাচ্ছে না। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে নগরীর সাধারণ মানুষের মাঝে। এ পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দোষ চাপাচ্ছে সিভিল সার্জনের ওপর। তবে সিভিল সার্জন বলছেন, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সিটি করপোরেশন তাদের দায়ী করছে।

নগরীর নিউ চাষাঢ়া জামতলা এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ নাজমা সুলতানা শিমু জানান, ৬ এপ্রিল নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ প্রতিবেদন আসার পর তার স্বামী মেহেদী হাসানকে সিদ্ধিরগঞ্জের সাজেদা হাসপাতালে আইসোলেশনে রাখা হয়। স্বামীর পর একই উপসর্গ তার মধ্যেও দেখা দেয়। জ্বর-কাশি ও গলাব্যথা নিয়ে নিজের নমুনা সংগ্রহে সিটি করপোরেশনের হটলাইনে ৮ এপ্রিল রাতে যোগাযোগ করেন। কিন্তু চিকিৎসক নিজাম আলী তাৎক্ষণিক তার নমুনা সংগ্রহে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরই মধ্যে শিমুর ডায়রিয়া দেখা দেয়।

শিমু বলেন, ‘স্বামীর করোনা পজিটিভ হওয়ার পর আমার মধ্যেও একই উপসর্গ দেখা দিলে আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে বলা হয়, আপনি তো সিটি করপোরেশন এলাকায় আছেন। নমুনা সংগ্রহের জন্য সিটি এলাকার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছে। আপনি সেখানে একটু যোগাযোগ করেন।’

এরপর গত বুধবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল আমিনকে ফোন দেন জানিয়ে শিমু আরও বলেন, ‘আবুল আমিন সব শুনে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক নিজাম আলীর নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে যোগযোগ করতে বলেন। ওই দিন রাত সাড়ে ৮টায় ডা. নিজাম আলীকে ফোন দিয়ে আমার অবস্থা জানাই এবং নমুমা সংগ্রহের অনুরোধ করে কখন আসবেন তা জানতে চাই। ডাক্তার নিজাম আলী বলেন, বৃহস্পতি অথবা শুμবার আসতে পারি। তখন আমি বললাম, আপনাদের উচিত দ্রুত আমার নমুনা সংগ্রহ করা। যেহেতু আমার স্বামী করোনা পজিটিভ হয়ে আইসোলেশনে আছে এবং আমার উপসর্গও একই। আমার প্রচন্ড গলাব্যথা, শরীর ব্যথা, লুজমোশন শুরু হয়ে গেছে। আমার দুইটা বাচ্চা আছে। ওদের সংμমিত করে ফেললে তো সব শেষ। ওদের জন্য আমাকেই খাবার তৈরি করতে হয়। কতক্ষণ গ্লাভস পরে কাজ করব? বাচ্চাদের জন্য সব সময় ভয় কাজ করছে।’ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে শিমু বলেন, ‘স্বামীর করোনা পজিটিভ হওয়ার খবর জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পরিচিত এমনকি আত্মীয়- স্বজনরাও এড়িয়ে চলছে। বাসায় খাবার নেই, ওষুধ নেই। এরই মধ্যে জরুরি সেবায় ফোন করে যদি সেবাই না পাই, তাহলে জরুরি সেবা নাম দিয়ে লাভ কী?’

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ডা. নিজাম আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সিটি এলাকার জন্য ৩টি টিম রয়েছে নমুনা সংগ্রহের কাজে। এর মধ্যে একটি জোনের দায়িত্বে আমি আছি। আর নমুনা সংগ্রহের জন্য মাত্র একজন টেকনিশিয়ান রয়েছে। আমরা যারা চিকিৎসক আছি আমাদের দায়িত্ব হটলাইনে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া।’ সব শুনে শিমু ও তার দুই বাচ্চার নমুনা গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান এই চিকিৎসক।

শিমুর মতো একই অভিযোগ করেন নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি দৈনিক শীতলক্ষ্যা পত্রিকার সম্পাদক আরিফ আলম দিপু। তিনি জানান, স্ত্রী ও তার করোনা উপসর্গ থাকায় নমুনা সংগ্রহের জন্য তিনি সিটি করপোরেশনের মেডিকেল অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, সিরিয়াল আছে। সিরিয়াল অনুযায়ী আসা হবে।

দিপু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তাদের সিরিয়াল আসতে আসতে একজন রোগীর অবস্থা শঙ্কটাপনড়ব হয়ে যাবে। সিটি করপোরেশনের মেয়র করোনা মোকাবিলায় কোনো কাজই করেননি নগরবাসী জন্য। বিষয়টি দুঃখজনক।’ এ ব্যাপারে চেষ্টা করেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে নাসিকের মেডিকেল অফিসার ডা. নিজাম আলী বলেন, ‘পুরো সিটি এলাকার ২৭টি ওয়াডের্র জন্য টেকনিশিয়ান মাত্র দুজন। তাদের একজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় কাজ করছেন মাত্র একজন। আমরা ৫ দিন ধরে সিটি এলাকার করোনা উপসর্গ নিয়ে যেসব রোগী হটলাইনে ফোন দিচ্ছেন তাদের নমুনা সংগ্রহ করে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে আইইসিডিআরে পাঠাচ্ছি। ৫ দিনে ২৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে। আর গড়ে হটলাইনে নমুনা সংগ্রহের জন্য ফোন আসে ২৫ জনের। এ অবস্থায় একজন মাত্র টেকনিশিয়ান দিয়ে কীভাবে কাজ চালানো সম্ভব। বিষয়টি মেয়রকে জানানো হয়েছে। মেয়র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানিয়েছেন।’

অবশ্য ডা. নিজাম আলী করোনা পরীক্ষায় আগ্রহী নগরবাসীর ভোগান্তির জন্য সিভিল সার্জনের অসহযোগিতার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে ৩০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত ও ১৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল রয়েছে। ওই দুটি হাসপাতালের টেকনিশিয়ানদের তিনি (সিভিল সার্জন) সিটি এলাকার বাইরের কাজে দিয়ে রেখেছেন। অথচ হাসপাতাল দুটি সিটি এলাকায় অবস্থিত।’

তবে এই অভিযোগের জবাবে সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব সিটি এলাকায়। আর আমার দায়িত্ব পুরো জেলায়। আমি আমার কাজ করছি। যেখানে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে আমাদের টিম ঠিকই কাজ করছে। প্রকৃতপক্ষে করোনা প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন কার্যত কোনো প্রস্তুতিই নেয়নি। তাই তারা নিজের দোষ অন্যের কাঁধে চাপাতে চাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছি। জেলা প্রশাসকও অসুস্থ। এ ছাড়া জেলার করোনা ফোকাল পারসন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম করোনায় আক্রান্ত হয়েও বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি টেলিফোনে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। আর সেখানে নাসিক কর্তৃপক্ষ কোনো কাজ না করেই অন্যের দোষ খুঁজতে ব্যস্ত। এ সময় এটা ঠিক নয়।’