প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কভিড-১৯ এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি সারের ভর্তুকি হিসেবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন সরকারপ্রধান। গতকাল রবিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এই ঘোষণা দেন। এই সময় তিনি ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে সতর্ক করে বলেন, ‘যদি প্রয়োজন হয় সেখানে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। বিচার পরে দেখা যাবে।’
প্রধানমন্ত্রী কৃষির প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে বলেন, কৃষি খাতে চলতি মূলধন সরবরাহে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করবে। এখান থেকে শুধু কৃষি খাতে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ দেওয়া হবে। যার সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৫ শতাংশ। তিনি বলেন, এই তহবিল থেকে গ্রাম অঞ্চলে যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি তাদের জন্য ঋণ দেওয়া হবে। কৃষি, ফুল, ফল, মৎস্য, পোলট্রি, ডেইরি ফার্ম ইত্যাদি সব কর্মকাণ্ডে এখান থেকে সহায়তা পাবেন। তিনি বলেন, কৃষি মানে গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি। কারণ আমাদের দেশের কৃষক শ্রমিক দিনমজুর থেকে শুরু করে কামার-কুমার তাঁতি জেলে সবার জন্য সাহায্য করতে আমরা প্রস্তুত।
শেখ হাসিনা বলেন, ইতিমধ্যে শিল্প খাতের জন্য ৭২ হাজার কোটি টাকার বেশি কয়েকটা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে বোরো ফসল উঠবে। কৃষক যেন সঠিক মূল্য পায় বিষয়টি লক্ষ্য রেখে খাদ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি ধান-চাল ক্রয় করবে। অর্থাৎ দুই লাখ টন চাল বেশিয় করবে, সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ধান কাটা ও মাড়াই যান্ত্রিকীকরণের জন্য ইতিমধ্যে কৃ ষি মন্ত্রণালয়কে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া বীজ, চারা রোপণের জন্য আরও দেড়শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কেউ পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ মসলা জাতীয় কিছু উৎপাদন করলে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার আরেকটি উদ্যোগ বর্তমানে চলমান রয়েছে। আগেই চালু এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
শেখ হাসিনা বলেন, করোনাভাইরাসের ক্ষতি মোকাবিলায় বেশকিছু প্রণোদনা দিয়েছি। শিল্প-কৃষি সব ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে অনেক উনড়বয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় কথা মানুষ বাঁচানো। মানুষের জীবনযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া।
করোনাভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বব্যাপী মারাত্মক খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি নিজেরা উৎপাদন ঠিক রাখি, তাহলে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারব। এজন্য আমাদের উৎপাদন বাড়াতে হবে, যাতে আমার দেশের মানুষ কষ্ট না পায়। পাশাপাশি আমরা অনেক দেশকে সহযোগিতা করতে পারি, রপ্তানি করতে পারি সেই বিষয়টা মাথায় রেখেই আপনারা উৎপাদন বাড়াবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারও এতটুকু জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। আপনারা বাড়ির পাশে এবং ছাদে টবের মধ্যেও গাছ লাগান। যেটাই উৎপাদন করবেন সেটাই কাজে লাগবে।
করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণ বিতরণে কেউ দুর্নীতি করলে তাকে ক্ষমা করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, একটা দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা চলছে। এই সময়ে মানুষকে সাহায্য দেওয়ার জন্য আমরা যেই খাদ্য দ্রব্য দিচ্ছি, চাল বা যা আমরা দিচ্ছি সেখান থেকে কেউ যদি দুর্নীতির চেষ্টা করে তাহলে এটা কোনোদিন ক্ষমার যোগ্য না এবং এটা আমরা ক্ষমা করব না।
শেখ হাসিনা বলেন, যাদের আমরা দায়িত্ব দিয়েছি তারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তার মধ্যে এই সামান্য দুই-একটা ঘটনা আমাদের অত্যন্ত কষ্ট দেয়। এটা খুবই একটা ঘৃণ্য কাজ। কাজেই কেউ এটা করবেন না। এ ধরনের দুর্নীতি আমরা কোনোদিন বরদাশত করব না।
নববর্ষে বাইরে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না : বাংলা নববর্ষে বাইরে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সব অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। লোকসমাগম করা যাবে না। তবে ডিজিটাল মাধ্যমে বা নিজেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে করতে পারেন। দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ রোগটা বেশ সংক্রমক। কার শরীরে আছে, কার শরীরে ঢুকবে তা বোঝা কঠিন। এটাই ভাইরাসটির কঠিন দিক। তিনি বলেন, একটা অবাক কাণ্ড খেয়াল করবেন। একটা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব স্থবির। সারা বিশ্বের মানুষ ঘরে বন্দি।
‘তুমি ভালো কাজ করছ’ মাশরাফীকে প্রধানমন্ত্রী : নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় μিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তুমি ভালো কাজ করছ, মুক্তিও (কবিরুল হক মুক্তি) ভালো কাজ করছে।’ গতকাল রবিবার সকালে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন মন্তব্য করেন। মাশরাফী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ে ২০-২১ জনের একটা কমিটি করেছি। প্রকৃতই যাদের প্রয়োজন তারাই ত্রাণ পাবে।’ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সারা দেশে পুলিশ নিরলস পরিশ্রম করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে পুলিশবাহিনীকে অভিনন্দন জানান মাশরাফী। নড়াইল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকা উল্লেখ করে মাশরাফী বলেন, ‘আপনার জেলায় আপনি সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যা করার জন্য অনুমোদন দিয়েছেন। কিন্তু এখন কাজ বন্ধ।’ তাই এই সময়ে কিছু আইসিইউ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সংবাদমাধ্যম কর্মীদের হাসিনার ধন্যবাদ : দেশে চলমান করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যম কর্মীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার বরিশাল ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের সময় সংবাদকর্মীদেরসহ বিভিনড়ব পেশাজীবীদের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের পুলিশবাহিনী, প্রশাসনের সব কর্মকর্তা, কর্মচারী, আমাদের সশস্ত্রবাহিনী, আমাদের স্বাস্থ্যের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা- কর্মচারীদের প্রত্যেকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সংবাদমাধ্যম কর্মীরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা, পরিবেশন করাএই কাজগুলো করে যাচ্ছে। তাতে আপনাদের সুরক্ষিত করতে আরও উদ্যোগ নিতে পারছি। সকলকেই আমি আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
এই সংকট মোকাবিলায় সবাইকে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকের একটা আন্তরিকতা থাকতে হবে। বিশেষ করে আমরা যারা রাজনীতি করি আমাদের আরও বেশি দায়িত্ববোধ থাকতে হবে, যারা সরকারি বেতন পাচ্ছেন জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। কাজেই প্রত্যেককেই আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।দূরত্ব নিশ্চিতে বাজারকে মাঠ-খোলা স্থানে নিন
করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে হাট-বাজারগুলোকে মাঠ বা খোলা জায়গায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে হাট-বাজারগুলোকে মাঠ, বড় রাস্তা বা খোলা কোনো জায়গায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজারেও সেই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। যেখানে হাট হয়, হাটগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ না রেখে কোনো বড় মাঠ থেকে সুনির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করে দূরত্ব বজায় রেখে হাটে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে এটা করলে মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত হবে এবং সংক্রমণ ছড়াবে কম।
‘মাঠ বা খোলা জায়গায় দূরত্বটা বজায় রেখে যার যার পণ্য নিয়ে বসবে। সবাই সেখান থেকে কিনে নিয়ে চলে যাবে। কোনো ভিড় যেন না হয়। সে বিষয়ে আপনারা বিশেষভাবে দৃষ্টি দেবেন।’
কৃষি পরিবহন ও কৃষকদের ফসল তুলতে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান শেখ হাসিনা।