সারা দেশ একদিকে করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় যুদ্ধ করতে ব্যস্ত, অন্যদিকে কিছু জনপ্রতিনিধি ও ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) ডিলার ব্যস্ত অসহায় মানুষের খাদ্য সহায়তার চাল চুরিতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানের মধ্যেও থামছে না সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল চুরির ঘটনা। চুরির চাল অন্য জায়গায় বিক্রির পাশাপাশি মাটির নিচে লুকিয়ে রাখার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছেন এই ‘চাল চোররা’। দেশ রূপান্তরের হিসাবে ১৩ দিনে অন্তত ২৬ উপজেলার ৩০টি চাল চুরির ঘটনা ধরা পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। উদ্ধার করা হয়েছে লক্ষাধিক কেজি চাল।
এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্তত ১৩ জনপ্রতিনিধিসহ ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জনপ্রতিনিধি ছাড়া বাকিদের অনেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে এক ইউপি চেয়ারম্যান ও দুই সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উনড়বয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।
গতকাল রবিবারও মাদারীপুরের রাজৈর ও কালকিনি; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ও আশুগঞ্জ; চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও ভোলার লালমোহন উপজেলায় সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল উদ্ধার ও আটকের খবর পাঠিয়েছেন দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা। আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার আশুগঞ্জ উপজেলায় ভিজিডির ৯০০ কেজি চালসহ পাঁচজনকে আটক ও বিজয়নগরে ১০ টাকা দরের ৭০ কেজি চাল উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল রবিবার দুপুরে আশুগঞ্জ উপজেলার আড়াইসিধা ইউনিয়নের বিভিনড়ব স্থান থেকে এসব চাল উদ্ধার করা হয়। এ সময় চাতাল মালিক নাজমুল হক, আড়াইসিধা ভবানীপুর এলাকার শাহজাহান মিয়া, শাহাবুদ্দিন, খামার মালিক আল আমিন ও ফারুক মিয়াকে আটক করা হয়। তাদের আশুগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজিমুল হায়দার জানান, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা বাদী হয়ে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করেছেন। এ ছাড়া ভিজিডির কার্ড নিয়ে এভাবে চাল যারা উত্তোলন করে বিক্রিকরে দিচ্ছেন, তাদের খুঁজে বের করে কার্ড বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে সরকারিভাবে হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে বিμির জন্য বরাদ্দ চাল অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার সময় ৫০ কেজির ১৪ বস্তা চাল আটক করেছে স্থানীয়রা। গতকাল রবিবার বেলা ১১টার সময় উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দুলালপুর হালিম চৌমুহনী এলাকায় সড়কের মধ্যে এ চাল আটক করা হয়। এ সময় চাল বহন করা গাড়িচালক জানান, ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি ডিলার শাহিন মিয়া এ চাল বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিনের কাছে রেখে আসতে পাঠিয়েছেন।
দেশ রূপান্তরের ভোলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার লালমোহন উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নে ইউপি মেম্বারের ঘরের মাটি খুঁড়ে সরকারি চাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার জুয়েল খাটের নিচে মাটি খুঁড়ে চাল লুকিয়ে রাখেন। স্থানীয়রা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে জানালে অভিযানে যায় পুলিশ। এ ছাড়া ওই ওয়ার্ডের চৌকিদার শাহ আলমের ঘর থেকে আরও ৬ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। জুয়েল আত্মগোপন করলে তার বাবা সাবেক মেম্বার নানড়বুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আটক করেছে। লালমোহন থানার ওসি খাইরুল ইসলাম জানান, এ ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সদর উপজেলার মহারাজপুরের জোড়া বকুলতলা এলাকার একটি বাড়ি থেকে ২২৬ বস্তা চালসহ দুজনকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। রবিবার দুপুরে তাদের আটক করা হয়। আটকরা হলেন সদর উপজেলার ঝিলিম এলাকার ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে মেসবাহুল হক ও গণকা গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল মহারাজপুর জোড়া বকুলতলার আমবাগানের ভেতর নির্জন একটি বাড়িতে অভিযান চালায়। এ সময় সরকারি খাদ্য কর্মসূচির ২২৬ বস্তা চাল জব্দ করা হয়। প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি করে চাল ছিল।
মাদারীপুর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, জেলার কালকিনি উপজেলার ডাসার থানা এলাকা থেকে ১০ টাকা দরের ১৫ বস্তা চাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব চাল আত্মসাতে জড়িত থাকায় উত্তম বিশ্বাস নামে এক ইউপি সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজৈর থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১১ বস্তা চালসহ তিনজনকে আটক করেছে রাজৈর থানার পুলিশ। রবিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার নয়াকান্দি স্লুইসগেট এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। আটকরা হলেন চাল ব্যবসায়ী হায়দার শেখ, মিল কর্মচারী বিদ্যুৎ শেখ ও ভ্যানচালক সাইদুল শেখ। আটক তিনজনের বাড়িই উপজেলার পশ্চিম সরমঙ্গল গ্রামে । এদিকে ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে ১ ইউপি চেয়ারম্যান ও ২ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উনড়বয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। গতকাল এ-সংক্রান্ত তিনটি পৃক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উনড়বয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম ইতিপূর্বে ত্রাণ বিতরণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে অফিস আদেশ জারি করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার ৩ নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আফসারের বিরুদ্ধে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বরাদ্দ ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্তকর্তা, হাটহাজারী কর্তৃক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. শাহিন শাহ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে নিমড়ব আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দ ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণ না করে অন্যত্র বিμির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে রয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কবির হোসেন করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ত্রাণ বিতরণ না করে আত্মসাৎ এবং গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণড়ব করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। একই সময় পৃক আদেশে কেন চূড়ান্তভাবে তাদের পদ থেকে অপসারণ করা হবে না তার জবাব পত্র প্রাপ্তির ১০ কার্যদিবসের মধ্যে নিজ নিজ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়।