পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক নববর্ষ উৎসব

স্বাধীনতার আগে ষাটের দশকের শেষ দিকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে জন্ম নিয়েছিল ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন। রাজধানী ঢাকার রমনা উদ্যানের বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রথম নাগরিক অনুষ্ঠান। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া বিগত অর্ধ শতাব্দীতে কখনোই রমনায় ছায়ানটের এই অনুষ্ঠান বন্ধ থাকেনি। এবার করোনাভাইরাস মহামারীর দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বন্ধ থাকছে ছায়ানটের বর্ষবরণের এই প্রভাতি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। নাগরিক পরিসরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রেক্ষাপট এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক ও চিকিৎসক ডা. সারওয়ার আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এবার অন্য সবকিছুর সঙ্গে বাংলা নববর্ষের উৎসব উদযাপনও সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু পহেলা বৈশাখের এই বর্ষবরণ উৎসব এখন বাঙালির সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। আজকের বাস্তবতায় আমরা একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে চাই। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বাংলা নববর্ষের আয়োজন শুরুর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই।

সারওয়ার আলী : পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে। তারা আমাদের বাঙালি পরিচয় মুছে দিয়ে আমাদের ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত করাতে চেয়েছিল। সেই পটভূমিতে মূল আঘাতটা আসে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। তার বিরুদ্ধে যে আন্দোলনটা সংঘটিত হয়েছিল, সেটি জাতীয়তাবাদী চরিত্রের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিচালিত হয়, সেখানে নববর্ষের অনুষ্ঠান একটা নতুন মাত্রা যোগ করে।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ছায়ানটের জন্ম হয়। পরে লক্ষ করা গেল যে শিল্পীদের বড় অভাব। সেজন্য ১৯৬৩ সালে ‘ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে চিন্তা করা হয় বাঙালির একটা মিলনমেলার আয়োজন করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই ১৯৬৭ সালে সংগীতের আবহে সবাই যেন মিলনমেলায় যুক্ত হতে পারে, সেজন্যই বাংলা নববর্ষের আয়োজন। এর আগেও গ্রামাঞ্চলে নববর্ষের আয়োজন হয়েছে বটে, তবে নগরে অর্থাৎ রাজধানীতে নববর্ষ আয়োজনের প্রথম উদ্যোগ ছায়ানটের। এটাও লক্ষ করা গেছে যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যতটা বেগবান হয়েছে, রমনার বটমূলে লোকসমাগম ততটাই বেড়েছে। কাজেই এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সমান্তরাল অবস্থান আমরা লক্ষ করব। বাংলা নববর্ষের আয়োজন এক্ষেত্রে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

ছায়ানটের এই অনুষ্ঠানে যেমন সংগীত বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থীরা ছিলেন, তেমনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাও ছিলেন। সংগীতানুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কিছু পাঠ ও আবৃত্তি। কিন্তু এই দুস্তর পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ছায়ানট বিদ্যাপীঠের বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। কারণ পাকিস্তানের যারা শাসকগোষ্ঠী ছিলেন, তারা এ বিষয়টি পছন্দ করেননি। এরকম পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন একটা চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহণ করে এবং তা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পরিণতি লাভ করে। কাজেই ১৯৭১ সালে নববর্ষের এ আয়োজনটি আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত ওই একবারই আমরা নববর্ষের এই প্রভাতী মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আয়োজনটি করতে পারিনি।

ছায়ানট যে নববর্ষের আয়োজন করে, সেখানে দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতিকে গভীর বিবেচনায় নেওয়া হয়। আমরা যে গানগুলো বাছাই করি, যে পাঠগুলো বাছাই করি, সেগুলোর সঙ্গে সমসাময়িক পরিস্থিতির একটা সংযোগ থাকে। এটা সবসময়েই ছিল। আমরা যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের গান গেয়েছি, তেমনি লোকগীতিও গেয়েছি। বাংলাদেশের লোকগীতির যে ধারাগুলো রয়েছে, তার সবগুলোকেই ধারণ করার চেষ্টা করেছি। এখানে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও অংশগ্রহণ করেছে। এবং সবশেষে ছায়ানটের যিনি সভাপ্রধান, তিনি সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে একটা বাণী দিয়ে থাকেন। প্রতি বছরই এ ধারা অব্যাহত ছিল।

একটা উল্লেখ করার মতো বিষয় এই যে, পৃথিবীব্যাপী যে দিনপঞ্জি রয়েছে, সেটা খ্রিস্টাব্দ হোক আর হিজরি সনই হোক, তার সঙ্গে ধর্মপ্রচারক মহামানবদের জীবনেতিহাস সম্পর্কিত রয়েছে। বঙ্গাব্দ এমন একটি দিনপঞ্জি, যার উৎপত্তি হয়েছে কৃষি অর্থনীতি থেকে। সুতরাং বাঙালির পহেলা বৈশাখে যে আয়োজন, তা সারা বিশ্বের অন্যতম অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন নববর্ষ উৎসব। এখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষই অংশগ্রহণ করে।

দেশ রূপান্তর : ১৯৬৭ সাল থেকে ২০২০ সাল। অর্ধ শতকেরও বেশি। দীর্ঘ এই সময়ে বাংলা নববর্ষ আর কেবল রাজধানী ঢাকায় সীমিত থাকেনি। এটা ছড়িয়ে গেছে দেশের সব জেলা-উপজেলার শহর-পৌরসভাগুলোতেও। নাগরিক জীবনে বাংলা নববর্ষ উৎসবের এই বিস্তার সম্পর্কে কিছু বলুন।

সারওয়ার আলী : স্বাধীনতার আগে নববর্ষের অনুষ্ঠান শুধু রাজধানী বা নগর-কেন্দ্রিকতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পরে আমরা দেখলাম এর ব্যাপ্তি বেড়েছে। সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এ অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হচ্ছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ছোটখাটো সাংস্কৃতিক সংগঠন, এমনকি স্থানীয় ক্লাবগুলোও এর আয়োজন করেছে। ধীরে ধীরে এটা জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ঈদের পরই নতুন কাপড়চোপড় কেনার ঢলটি নামে বৈশাখে। লোকশিল্প এবং নানারকম ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কেনাবেচারও সবচেয়ে বড় উপলক্ষে পরিণত হয়েছে এখন পহেলা বৈশাখ। তাই অর্থনৈতিকভাবেও এর গুরুত্বের পরিসর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের সরকার যে এখন বাংলা নববর্ষে বোনাস বা উৎসবভাতা প্রবর্তন করেছে, তা খুবই সংগতিপূর্ণ হয়েছে। এখন আমাদের কাছে এটা একটা পরিতৃপ্তির বিষয় যে, আমরা নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু করেছি এবং সর্বসাধারণ এটা গ্রহণ করেছে। অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে এটা বাঙালির একটা বড় প্রাপ্তি।

দেশ রূপান্তর : রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের প্রভাতী অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে বিগত দশকগুলোতে চারুশিল্পীদের আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রাও এখন পহেলা বৈশাখের এক অনন্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। এখন দেশের নানা প্রান্তেই মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

সারওয়ার আলী : মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পী-শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। সেখানে ভাষাসংগ্রামী শিল্পী ইমদাদ হোসেনের একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এই চারুশিল্পী ছায়ানটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে এমদাদ হোসেনের খুবই সুসম্পর্ক ছিল। তারা দুজনেই কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর গ্রামের মানুষ। ১৯৮৯ সালে চারুকলায় প্রথমবার এই আয়োজন হয়। পরের বছর এর নামকরণ হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা নামকরণ নিয়েও শিল্পী ইমদাদ হোসেন ও ওয়াহিদুল হকের মধ্যে কথা হয়। শুরুর দিকে অন্য অনেকের সঙ্গে ছায়ানটও এই উদ্যোগে যুক্ত ছিল। চারুকলার শিল্পীরা একে আরও অনেক এগিয়ে নিয়ে যান। ধীরে ধীরে মঙ্গল শোভাযাত্রার একটা অনন্য উচ্চমূল্য তৈরি হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : করোনাভাইরাস মহামারীর এই দুর্যোগে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবার তাহলে ছায়ানটের কি কোনো বিশেষ আয়োজন থাকছে?

সারওয়ার আলী : এবার বিশ্বব্যাপী এক মহা মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে নববর্ষ পালিত হতে যাচ্ছে। পটভূমিটা সম্পূর্ণই বদলে গেছে। মানুষের মানসিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উৎসবের বিষয়টি আর নেই। একেবারেই নেই। এমনকি যেসব শিল্পী গান গাইবেন, তাদের মানসিক অবস্থা গান গাইবার পর্যায়ে নেই। তদুপরি, প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে, জনসমাগম করে অনুষ্ঠান করবার মতো পরিস্থিতি সারা বিশ্বেই নেই, বাংলাদেশেও নেই। সে কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণটি জনসমাগম করে করা গেল না। করা সম্ভব হলো না স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনও। কাজেই নববর্ষের অনুষ্ঠান জনসমাগম করে উৎসবের আমেজে করার মতো পরিস্থিতি বর্তমানে নেই। সেজন্য ছায়ানট সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে আমরা এবার রমনার বটমূলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করব না। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে ছায়ানট সময়োচিত সিদ্ধান্ত মনে করে।

এখন এরকম মহামারীর মুখে নিজের জীবন ও জীবিকা বাঁচানোর তাগিদে মানুষ যে ঘরে থাকছে, তাতে মানুষের যে একাকিত্ব ও অসহায়ত্ব অনুভূত হচ্ছে, সেখানে সংগীত মানুষের মনে প্রশান্তি তৈরি করতে পারে কি না, সেটাও আমরা গভীরভাবে বিবেচনা করছি। সেজন্য প্রতি বছর ছয়ানটের যে অনুষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশন সম্প্রচার করে থাকে সেখান থেকে কিছু গান ও পাঠ আমরা বাছাই করেছি। মানুষের মনে প্রশান্তি জাগায়, আশাবাদ জাগায় এমন কিছু গান নিয়ে আমরা একটা সংকলন তৈরি করেছি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বিবেচনাটি। সব মিলিয়ে আমরা একঘণ্টার একটি অনুষ্ঠান গ্রন্থনা করেছি। বাংলাদেশ টেলিভিশন পহেলা বৈশাখ সকাল ৭টায় এটা সম্প্রচার করবে। আমরা আশা করি, এ অনুষ্ঠানটি মানুষের মনে এ আশাবাদ সঞ্চার করবে যে, মানুষ এ অবস্থা থেকে একদিন নিস্তার পাবে। মানবসভ্যতা অজেয় এবং বিজ্ঞানের জয় অবশ্যম্ভাবী।

নববর্ষের এসব অনুষ্ঠানে শুধু সব ধর্মের মানুষই অংশগ্রহণ করে, তাই নয়। বিত্তভেদেও এর অংশগ্রহণ রয়েছে। সেদিন নিম্নবিত্তের মানুষও ভালো কাপড় পরবার চেষ্টা করে, ভালো খাবার গ্রহণের চেষ্টা করে। অর্থাৎ একটি সর্বজনীন উৎসবে নববর্ষ পরিণত হয়। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র। কেননা এটা কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, এখানকার নববর্ষ একেবারেই অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের উৎসব। এটা সর্বসাধারণের উৎসব।