বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যায় জড়িত থাকায় মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া আবদুল মাজেদের গ্রেপ্তারের ছবি দেখেই বিস্মিত হয়েছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের বেডফোর্ড লেনের বাসিন্দারা, যাদের কাছে তিনি মাস্টারমশাই হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কলকাতাভিত্তিক ভারতের বাংলা দৈনিক ‘বর্তমান’ গতকাল সোমবার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে। তাদের ধারাবাহিক এ প্রতিবেদনের প্রথম কিস্তির শিরোনাম ‘ঘাতকের ডেরা ১ : বঙ্গবন্ধুর ঘাতক মাস্টারমশাই! বিশ্বাস হচ্ছে না পার্ক স্ট্রিটের সেই মহল্লার’।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে সেনা সদস্যরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, মাজেদ তাদের একজন। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষে ২০০৯ সালের নভেম্বরে সর্বোচ্চ আদালত থেকে ১১ জনের ফাঁসির রায় আসে। তাদের মধ্যে পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি কার্যকর করা হলেও মাজেদসহ ছয়জন পলাতক থাকেন। দুই দশকের মতো ভারতে পালিয়ে থাকার পর গত মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাজেদ। তার দণ্ড কার্যকর করতে বুধবার ঢাকার জজ আদালত মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। মাজেদের প্রাণভিক্ষার আবেদন রাষ্ট্রপতি নাকচ করায় শনিবার মধ্যরাতে ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
কলকাতার দৈনিক বর্তমানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহল্লা তাকে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখেনি। হিংসা-বিবাদ তো দূর অস্ত! লোকটা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন নিয়ম করে। সেই তাদের মাস্টারমশাই নাকি বঙ্গবন্ধুর খুনি! এখনো ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না লকডাউনের পার্ক স্ট্রিট। এই পার্ক স্ট্রিটের বেডফোর্ড লেনের ভাড়া বাড়িতে থাকতেন বঙ্গবন্ধুর ঘাতক আবদুল মাজেদ।
গত ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মিরপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি আবদুল মাজেদ গ্রেপ্তারের পর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে রীতিমতো অবাক পার্ক স্ট্রিটের বেডফোর্ড লেনের বাসিন্দারা!
কিন্তু আবদুল মাজেদ নয়, পার্ক স্ট্রিট তাকে চেনে আলী আহমেদ ওরফে ইংরেজির মাস্টারমশাই হিসেবে। এলাকার লোকে জানত, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে পাস করেছেন মাস্টারমশাই। টিউশনি করে সংসার চালাতেন তিনি। প্রথমে তালতলার ভাড়া বাড়িতে একাই থাকতেন মাজেদ। পরে পার্ক স্ট্রিটে চলে আসেন।
২০১১ সালে তার থেকে ৩২ বছরের ছোট উলুবেড়িয়ার সেলিনা বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের ছয় বছরের এক মেয়ে রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই বছর বাহাত্তরের মাজেদের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে পিজি হাসপাতালে একপ্রস্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হয়।
দিনটা ছিল গত ২২ ফেব্রুয়ারি। পিজি হাসপাতাল থেকে সেই রিপোর্ট আনতে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। সেটাই শেষ। আর বাড়ি ফেরা হয়নি মাজেদের। স্বভাবতই উদ্বিগ্ন স্ত্রী রাতে পার্ক স্ট্রিট থানায় মিসিং ডায়েরি করেন। তদন্তে শুরু করে পার্ক স্ট্রিট থানা। পিজি হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ তন্নতন্ন করে ঘাঁটলেও হদিস মেলে না মাজেদের।
এরপর পুলিশ মাজেদের ভাড়া বাড়ি থেকে একটি ব্যাগ পায়। সেই ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে সিম কার্ড, আধার কার্ড, ভোটার আইডি, ভারতীয় পাসপোর্ট এবং এক মহিলাসহ তিনজন শিশুর ছবি পাওয়া যায়। স্ত্রী সেলিনা পুলিশকে জানান, ব্যাগের মতো তার অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিসে কাউকে হাত দিতে দিতেন না মাজেদ।
মহল্লায় খুব একটা মেলামেশা করতেন না তিনি। টিউশনির পাশাপাশি বড়জোর এলাকার এক চায়ের দোকান, রেশন দোকান এবং এক বিল্ডার্সের দোকানে আড্ডা দিতেন মাজেদ। বাড়ির সদর দরজায় সবসময় তালা লাগানো থাকত। বাইরের কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হতো না। এক-আধ বছর নয়, এভাবেই আঠারো-উনিশ বছর ডেরা বেঁধে কলকাতায় আত্মগোপন করেছিলেন আবদুল মাজেদ।
২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা ৪ মিনিটে বেডফোর্ড লেনের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আবদুল মাজেদের যাত্রাপথের একাংশের সিসিটিভি ফুটেজ হাতে এসেছে পুলিশের। কী আছে সেই ফুটেজে? (ক্রমশ)