কর্মকর্তার ‘ইলিশ’ আনতে চাঁদপুরে স্পেশাল ট্রেন

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইলিশ আনতে একটি স্পেশাল ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর গিয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগ উঠেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) সাদেকুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার তার মোবাইলে ফোন করলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। রেলওয়ের বাণিজ্যিক ও পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রেলমন্ত্রীর নির্দেশে গত ১৩ এপ্রিল বিভিণ্ণ স্টেশনে জরুরি ভিত্তিতে কিছু বেতন ও রেলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ভাতা দিতে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে একটি স্পেশাল ট্রেন ছেড়ে যায়। ট্রেনে থাকা একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় লাকসাম, চাঁদপুরে লকডাউন চলছে। এর মাঝেও বেতন ও পেনশনের টাকা দিতে তারা যান। এর মাঝে ডিআরএমের জন্য ইলিশ মাছ আনতে ট্রেন চাঁদপুর স্টেশনে পাঠানোটা সত্যিই কষ্টের।

ট্রেনে থাকা একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তাসহ জিআরপি, আরএনবিসহ মোট ২৫ জন রেল কর্মকর্তা- কর্মচারী ছিলেন স্পেশাল ট্রেনটিতে। সকালে ট্রেনটি চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে রওনা হয়ে প্রমে ফেনী স্টেশন মাস্টারকে টাকা দেয়। এরপর লাঙ্গলকোট হয়ে লাকসাম গিয়ে লাকসামের স্টেশন মাস্টারকে টাকা দেওয়া হয়। এ সময় লাকসামের স্টেশন মাস্টার ট্রেন আবার উল্টো পথে চাঁদপুর না গিয়ে চাঁদপুরের স্টেশন মাস্টারের টাকাগুলো তাকে দিয়ে যেতে বলেন। তিনি পরদিন টাকাটা চাঁদপুরের স্টেশন মাস্টারের কাছে পৌঁছে দেবেন বলে এই সময় চাঁদপুরের স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সমন্বয় করে নেন। এ সময় ট্রেনে থাকা সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা ওমর ফারুক রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনসার আলীর অনুমতি নিয়ে চাঁদপুরে না গিয়ে চাঁদপুরের টাকাগুলো লাকসামের স্টেশন মাস্টারকে বুঝিয়ে দেন। লাকসাম থেকে কুমিল্লা হয়ে চৌমুহনী-নোয়াখালীর স্টেশন মাস্টারকে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ফের চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন কর্মকর্তারা। এসব শেষ করে ট্রেনটি সন্ধ্যা ৭টায় লাকসাম এলে ডিআরএম সাদেকুর রহমান ট্রেনটি যেকোনোভাবে চাঁদপুর যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখন ট্রেনে থাকা প্রায় সবাই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেননা, চাঁদপুরের বিষয়টি সমন্বয় করার পরও চাঁদপুর যেতে হচ্ছে তাই। এরপরও ডিআরএমের নির্দেশনা মেনে ট্রেনটি চাঁদপুর নিয়ে যান ট্রেনচালক বখতিয়ার। পথে লাকসাম স্টেশন থেকে চাঁদপুরের টাকাগুলোও নেওয়া হয়। ট্রেন চাঁদপুরে পৌঁছার পর স্টেশন মাস্টারকে টাকাগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকে। এ সময় চাঁদপুর স্টেশনের টিটিই মহিউদ্দীন এসে বলেন, ট্রেন এখন যাবে না। এই ট্রেনে করে ডিআরএম স্যারের ইলিশ মাছ যাবে। গাড়ি কিছুক্ষণ থামান। এই বৈশাখী ইলিশ মাছ তোলার জন্য চাঁদপুর স্টেশনে প্রায় ৪০ মিনিট গাড়ি অপেক্ষায় থাকে। পরে ট্রেনের বগিতে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর বুঝতে বাকি থাকে না কেন ট্রেনটির বাধ্য হয়ে চাঁদপুরে আসতে হয়েছে।

জানা যায়, পহেলা বৈশাখে ডিআরএম স্যারকে ইলিশ উপহার দেওয়ার জন্য চাঁদপুর স্টেশনের টিটিই মো. মহিউদ্দিন বারবার ফোন দিচ্ছিলেন। এরপর টিটিই মহিউদ্দিন ২৫ কেজির মতো ইলিশ ইঞ্জিন রুমে তুলে দিলে চাঁদপুর স্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসে ট্রেনটি। তখন রাত সাড়ে ৯টা। পরে পুনরায় লাকসাম হয়ে ট্রেনটি রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রাম পৌঁছে। শুধু পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ খেতে কর্মকর্তার জন্য ইলিশ মাছ আনতে সরকারি তেল অপচয়, ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হয়রানি, সময় অপচয় করায় ট্রেনে থাকা প্রায় সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নাম না প্রকাশের শর্তে জিআরপি ও আরএনবির দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকবিলায় প্রায় সারা দেশে লকডাউন চলছে। কুমিল্লা, লাকসাম, চাঁদপুরেও লকডাউন চলছে। এর মধ্যে সরকারি নির্দেশনায় ডিউটি করতে গেছি। কিন্তু সেখানে সামান্য কিছুর জন্য ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অপ্রয়োজন সত্ত্বেও চাঁদপুর যেতে হয়েছে। যেটা সত্যিই দুঃখজনক। আমাদেরও পরিবার-পরিজন আছে। আমাদের ইচ্ছে আছে। এরূপ কর্মকাণ্ড সত্যি আমাদের ব্যথিত করেছে। এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনসার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেতন ও পেনশনের টাকা দিতে স্পেশাল ট্রেনটি চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ছাড়া হয়েছিল। এই ট্রেনে ইলিশ মাছ আনার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে ফোনে ডিআরএম স্যার আমাকে ট্রেন অবশ্যই যাতে চাঁদপুর যায়, সেই বিষয়ে বলেছিলেন।